ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি কংগ্রেস

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯

ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি কংগ্রেস

  সাজ্জাদ হোসেন

২০১৪ এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের দশা বেহাল। বিশেষ করে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ভূমিধস বিজয়ের পর আরও টালমাটাল হয়ে পড়েছে কংগ্রেস। এর পরের ঘটনাপ্রবাহে দলটির সভাপতি রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন। এরপর বিভিন্ন প্রদেশ থেকে কংগ্রেস নেতাদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। তাতে নির্বাচনে পরাজয়ের বিষয়টি যেমন কাজ করেছে তেমনি তরুণ এবং প্রবীণ নেতাদের দ্বন্দ্বের বিষয়টিও আছে। কর্ণাটকে বহু কষ্টে যে জোট সরকার কংগ্রেস গঠন করেছিল বছরখানেক আগে, তাও এখন ক্ষমতা ছাড়া হওয়ার হুমকিতে। আবার বিজেপির চরম উত্থানের সময়ে যে তিনটি রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার টিকে আছে তাতেও নানামুখী দ্বন্দ্ব রয়েছে। সবমিলিয়ে কংগ্রেস কঠিন সময় পার করছে। প্রশ্ন উঠেছে দলটি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

বিশ্নেষকরা বলছেন, আদতে কংগ্রেস বড় ধরনের তিনটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর প্রথমটি হলো কংগ্রেসকে এখন গান্ধী পরিবারের বাইরে থেকে একজন ব্যক্তিকে দলটির নেতা হিসেবে নির্বাচিত করতে হবে, যিনি দলকে ঐকবধ্য রাখতে পারবেন। কংগ্রেসে গান্ধী পরিবারের একক আধিপত্যের বিষয়টি সূর্যের আলোর মতো সত্য। তবে একটি রাজনৈতিক দলকে যদি স্বাভাবিক পন্থায় নেতা নির্বাচিত করার ক্ষমতা না দেওয়া হয় তাহলে সে দলের দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিষয়টি বুঝতে পেরেই রাহুল পদত্যাগ করেছেন- বলছেন অনেকে। বিশ্নেষকরা বলছেন, পদত্যাগের মধ্য দিয়ে রাহুল আসলে মেনে নিয়েছেন যে ২০১৯ সালে জনগণের রায় ছিল পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আর বিজেপি কংগ্রেসকে যেভাবে পারিবারিক দল বলে আক্রমণ করত সে পথও হয়ত চিরতরে বন্ধ করে দিতে চাইছেন রাহুল। এই কৌশল কাজে দেবে এবং বিজেপি অন্তত একটা জায়গায় কংগ্রেসকে আর আক্রমণ করার জায়গা পাবে না। কিন্তু গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব ছাড়া কংগ্রেস কতদূর এগোতে পারবে? এখানেই আসে দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জের বিষয়টি। সেটি হলো সমস্ত রাজ্যে দলটির সাংগঠনিক কাঠামোকে নতুন করে সাজানো। ওপর থেকে নেতা নিয়োগ না দিয়ে বরং নিচ থেকে নেতা নির্বাচনের পথে হাঁটা উচিত কংগ্রেসের। অথচ দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের নেতৃত্ব গান্ধী পরিবারের হাতের মুঠোয়। যার কারণে উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট বা কর্ণাটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেনি। এর ফল হয়েছে ভয়াবহ। অত্যন্ত গরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশগুলোতে কোনো ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতা এখন আর শতাব্দী প্রাচীন দল কংগ্রেসের নেই। অন্য রাজ্যগুলোর অবস্থাও এর চেয়ে খুব একটা ভালো নয়।

১৯৯৮ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ের পর সোনিয়া গান্ধী একটি কমিটি গঠন করেছিলেন, যার প্রধান ছিলেন পিএ সাংমা। দলকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ করাই ছিল ওই কমিটির কাজ। কমিটি দল পুনর্গঠনে বিভিন্ন সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। একটি সুপারিশও আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। যদিও একই কাজের জন্য পরবর্তীতে আরও দুটি কমিটি করা হয়েছিল। যার সর্ব শেষটি ছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর। কেন্দ্রীয় কমিটি, কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি এবং প্রদেশ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ, সিদ্ধান্ত ওপর থেকে না এসে কর্মীদের থেকে আসা এবং বিশ্বস্ত নেতার জায়গায় দলে আদর্শিক নেতার জায়গা হওয়া উচিত বলে কমিটিগুলো উল্লেখ করেছিল। এসবের একটি সিদ্ধান্তও যে বাস্তবায়ন হয়নি, তার প্রমাণ সপ্তদশ লোকসভায় কংগ্রেসের ভয়াবহ পরাজয় এবং এর ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন প্রদেশের নেতৃত্বে অস্থিরতা। যেমন, ৭ জুলাই কংগ্রেসের ন্যাশনাল জেনারেল সেক্রেটারির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মধ্যপ্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। দলীয় এবং মুখ্যমন্ত্রিত্বের পদ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে তিনি পদত্যাগ করেন। মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জয় পেলে দলটির অনেক নেতাকর্মী তরুণ সিন্ধিয়াকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। যদিও কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেয় গান্ধী পরিবারের আস্থাভাজন ও প্রবীণ নেতা কমলনাথকে। কংগ্রেসের সামনে তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো বিজেপির আদর্শের বিকল্প একটি আদর্শিক বয়ান তৈরি করা। ২০১৯ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস যে ইশতেহার তৈরি করেছিল সেটিকে অনেকে বলেছিলেন 'ড্রয়িং রুমে' বসে তৈরি করা। কারণ ওই ইশতেহারে প্রগতিশীলতা, উদারতাবাদ ইত্যাদি সব কিছু থাকলেও তাতে মাঠের বাস্তবতা কতটুকু ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যে ধর্মনিরপেক্ষতা কংগ্রেসের রাজনীতির মূল হাতিয়ার সেটিও সর্বশেষ নির্বাচনে কোনো কাজেই দেয়নি। বিজেপির ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদ আর উগ্র-জাতীয়তাবাদ রুখতে তাই কংগ্রেসকে নতুন আদর্শিক বয়ান হাজির করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সূত্র :লাইভ মিন্ট, ইকোনমিক টাইমস, এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডে।


মন্তব্য