ফ্রান্সে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের নেপথ্যে

ফ্রান্সে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা এএফপি

   সমকাল ডেস্ক

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সে সম্প্রতি যে আন্দোলন হয়েছে, তাকে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে দেশটিতে জ্বালানি তেলের ওপর ২০ শতাংশ কর বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হাজার হাজার নাগরিক রাস্তায় নেমে আসে। একদিকে সহিংস বিক্ষোভ আর তার সঙ্গে নতুন নতুন দাবির সমন্বয়ে ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করে আপাত নিরীহ আন্দোলনটি। এক পর্যায়ে জ্বালানি তেলের কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পাশাপাশি অবসর ভাতা ও ওভারটাইম থেকে কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন। এরপরও রাস্তা ছাড়েনি আন্দোলনকারীরা। এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে যে বিক্ষোভের সূচনা তা রূপান্তরিত হয়েছে সুদীর্ঘকালের অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণের আন্দোলনে। বিত্তশালীদের পক্ষে থাকা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে 'ইয়েলো ভেস্ট' ব্যানারে সংগঠিত ফরাসিরা নতুন ধারার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছে। সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে তারা এমন এক 'জনগণের রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সামনে এনেছেন, যার চরিত্র হবে 'কল্যাণমূলক'।

ফ্রান্সের মোটরযান আইন অনুযায়ী, বেশি আলো প্রতিফলিত করে এমন এক ধরনের বিশেষ নিরাপত্তামূলক জ্যাকেট গাড়িতে রাখতে হয় চালকদের। এর রঙ সবুজাভ হলুদ (ইয়েলো)। আন্দোলনকারীরা এই জ্যাকেট (ভেস্ট) পরে বিক্ষোভের সূচনা করেছিল বলে আন্দোলনটি পরিচিতি পায় 'ইয়েলো ভেস্ট' নামে। এই আন্দোলনের কোনো ঘোষিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। গত নভেম্বরে শুরু হওয়া তাদের কর্মসূচিতে উত্তাল হতে শুরু করে প্যারিসসহ ফ্রান্সের বড় সব শহর। জ্বালানি তেলের ওপর কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে সেসব মানুষ, অর্থনৈতিক চাপে যারা এমনিতেই পর্যুদস্ত।

চলতির বছরের প্রথম মাসের প্রথম সপ্তাহেও কাটেনি আন্দোলনের রেশ। সরকারি ভবন আর বিত্তশালীদের অঞ্চলকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে দেখা যায়। পুলিশের সঙ্গে অনেক শহরে তাদের সরাসরি সংঘর্ষ হয়েছে। এক পর্যায়ে তারা প্যারিসে মন্ত্রণালয় ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। বিত্তশালীদের বসবাস- এমন একটি এলাকায় গিয়েও তারা রাস্তায় থাকা মোটরসাইকেল ও গাড়ি ভাংচুর করেছে। রাস্তায় থাকা ব্যারিকেডে জ্বালিয়েছে আগুন।

আলজাজিরায় প্রকাশিত এক কলামে ফরাসি সাংবাদিক ও লেখক রকহায়া ডিয়ালো মন্তব্য করেছেন, জ্বালানি কর একটি উপলক্ষ্য মাত্র। সাধারণ মানুষের মূল ক্ষোভ রাষ্ট্রের কাছে অচ্ছুৎ হয়ে পড়া নিয়ে। ক্ষোভটি সম্পদের অসম বণ্টন ও বৈষম্য থেকে উদ্ভূত। বিত্তশালীরা যেখানে হ্রাসকৃত করের সুবিধা ভোগ করছে, সাধারণ মানুষ সেখানে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছে।

১৯৮৩ সাল থেকে তৎকালীন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরা সেবা খাতে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে সে ধারাই কমবেশি সব ফরাসি সরকার অনুসরণ করেছে। তারা ক্রমেই ফ্রান্সকে একটি 'কল্যাণ রাষ্ট্রের' ধারা থেকে দূরে নিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্সের মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ। ক্রমেই তারা ডান-বাম উভয় পক্ষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে থাকে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিত্তশালী শ্রেণির পাহারাদার হিসেবে চিনতে থাকে তারা। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে 'নতুন বিশ্ব গড়ার' প্রত্যয় ঘোষণা দিয়ে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটান ইমানুয়েল মাক্রোন। এককালে রথচাইল্ডদের বিনিয়োগ ব্যাংকার ও পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ম্যাপোঁ যখন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হন, তখন ফরাসিদের অনেকেই তাকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। ডানপন্থিদের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকাতে তার বিজয় প্রত্যাশিত ছিল ফ্রান্সের উদারপন্থিদের কাছেও।


মন্তব্য