উল্লাপাড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ৬০ হাজার তাঁত

উৎপাদন খরচ বাড়লেও কমেছে বিক্রি

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮

উল্লাপাড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ৬০ হাজার তাঁত

   উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

দফায় দফায় রঙ, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে ভারতীয় শাড়ির সহজলভ্যতার কারণে উল্লাপাড়ায় সংকটের মুখে পড়েছে তাঁতশিল্প। দেশি শাড়ির যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় ইতিমধ্যে অনেক তাঁত মালিক তাদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। অনেকে ঋণের দায়ে জর্জড়িত হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৬০ হাজারের বেশি তাঁত। বেকার হয়ে পড়া তাঁত শ্রমিকদের কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাজ নিয়েছেন। কাজ না পেয়ে অনেকে বেকার হয়ে পড়েছেন।

উল্লাপাড়া উপজেলার ইসলামপুর, বালসাবাড়ি, দাঁদপুর, পাইকপাড়া, নতুন বাবলাপাড়া, মধুপুর, পাঁচিলা, গোপিনাথপুর, কোনাবাড়ি, নতুন চাঁদপুর, নতুন দাঁদপুর ও মরিচা গ্রামে ২ লক্ষাধিক তাঁত রয়েছে। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্তত ৩ লাখ পরিবার। কিন্তু তাতশিল্পে ধস নামায় এসব পরিবারে নেমে এসেছে দুর্দিন।

উল্লাপাড়ার বালসাবাড়ি গ্রামের তাঁত মালিক ফজলুল হক জানান, কয়েক পুরুষ ধরে তারা তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বারবার রঙ, সুতা ও কাপড় তৈরির অন্যান্য সরঞ্জামের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ভারতীয় শাড়িতে সয়লাব হয়ে পড়েছে কাপড়ের বাজার। ফলে ন্যায্যমূল্যে তাদের উৎপাদিত কাপড় বিক্রি হচ্ছে না। এতে অনেক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। সরকারি সহায়তাও পাচ্ছেন না তাঁত মালিকরা। এসব কারণে তিনি তার ৩০টি তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন। একই কথা জানালেন নতুন দাঁদপুর গ্রামের বদর উদ্দিন, আলাউদ্দিন, নতুন বাবলাপাড়ার তোফাজ্জাল হোসেন, মনিরুল ইসলাম, দাঁদপুরের শান্তাপ আলীসহ অনেক তাঁত মালিক।

এদিকে বাজারে নিজেদের তাঁতে উৎপাদিত কাপড় উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি না হওয়ায় ঋণের দায়ে ইসলামপুর এলাকার আহম্মদ আলী, আব্দুর রাজ্জাক, ঠাণ্ডু মিয়া, জামাল মিয়া ও মোশারফ হোসেনসহ অনেক তাঁত মালিক তাদের কারখানা বন্ধ করে দিয়ে ঘরবাড়ি ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন বলে জানান স্থানীয়রা। এ অবস্থায় বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার তাঁত শ্রমিক।

তাঁত কারখানায় সুতা কেটে সরবরাহকারী নতুন বাবলাপাড়ার মদিনা বেগম জানান, ববিনে সুতা তুলে তাঁতের কারখানায় সরবরাহ করে সংসার চালাতেন তিনি। এখন অনেক তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার ববিনে তোলা সুতা আর তেমন সরবরাহ করতে পারছেন না। ফলে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে তার সংসার।

তাঁত বোর্ড উল্লাপাড়া উপজেলা অফিসের ভারপ্রাপ্ত লিয়াজোঁ অফিসার মো. খালেকুজ্জামান জানান, বাজারে তাঁতিদের তৈরি কাপড়ের কদর কমে গেছে। ফলে উৎপাদিত কাপড় বিক্রি করতে পারছেন না তাঁত মালিকরা। উপজেলার তাঁতপল্লীতে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁতিদের সরকারি সুবিধা না পাওয়ার প্রসঙ্গে লিয়াজোঁ অফিসার বলেন, প্রকৃতপক্ষে এ কথাটি সত্য নয়। তাঁত বোর্ড তাঁত মালিকদের ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। কিন্তু ঋণ নিয়ে মালিকরা সময়মতো তা শোধ না করায় বিপদে পড়ছে তাঁত বোর্ড। উল্লাপাড়ার বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৫০০ তাঁতির কাছ থেকে তাঁত বোর্ড ৮০ লাখ টাকারও বেশি পাবে। মানবিক কারণে কর্তৃপক্ষ এসব ঋণখেলাপি তাঁত মালিকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলাও দিতে পারছে না। আদায় না হওয়া এই টাকা আদৌ আদায় করা সম্ভব হবে কি-না এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে তাদের বলে উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা।


মন্তব্য যোগ করুণ