চম্পকনগর গ্রামে হামলা দেড়শ' বাড়িঘর ভাংচুর

আড়াইহাজারে প্রতিপক্ষের তাণ্ডব

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

চম্পকনগর গ্রামে হামলা দেড়শ' বাড়িঘর ভাংচুর

   আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

আড়াইহাজারে একটি বিদ্যালয়ে দুই স্কুলছাত্রের ঝগড়াকে কেন্দ্র করে একপক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা চালিয়ে নারীসহ ১৮ জনকে আহত করেছে। হামলাকারীরা চম্পকনগর গ্রামের দোকানপাটসহ অন্তত দেড়শ' বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট করে। এ সময় তারা ওই গ্রামের ঘরে ও ঘরের বাইরে রক্ষিত মূল্যবান জিনিসপত্র নষ্ট করে। শুক্রবার উপজেলার খাগকান্দা ইউনিয়রে চম্পকনগর গ্রামে এ হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এলাকায় উত্তেজনা কমাতে ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গত বুধবার উপজেলা তেঁতুইতলার কবি নজরুল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র চম্পকনগরের শিহাব ও দশম শ্রেণির স্কুলছাত্র কাকাইলমোড়ার রাজনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে স্কুলছাত্র রাজন ও তার অনুসারীরা শিহাবকে পিটিয়ে আহত করে।

বিষয়টির মীমাংসার জন্য গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চম্পকনগরের পক্ষে ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম মেম্বার এবং কাকাইলমোড়ার পক্ষে খাগকান্দা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার লোকমান হোসেন ও আওয়ামী লীগ নেতা তোফাজ্জল হোসেন তার লোকজন নিয়ে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনার একপর্যায়ে মারামারি হলে মীমাংসা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এ খবর লোকমান মেম্বারের গ্রামে পৌঁছলে কাকাইলমোড়া, বাহেরচরসহ আশপাশের কয়েকশ' গ্রামবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চম্পকনগর গ্রামে হামলা চালায়। এ সময় আতঙ্কে ওই গ্রামের নারী-পুরুষ ঘর থেকে বেরিয়ে নদী সাঁতরিয়ে পাশের গ্রাম জাঙ্গালিয়ায় আশ্রয় নেয়। হামলাকারীরা অন্তত দেড়শ' বাড়িঘর ভাংচুর করে। ইট দিয়ে ঢিল ছুড়ে বিল্ডিংরে গ্লাস ভেঙে দেয়। টিনের ঘরের টিন কেটে ফেলে এবং ঘরে প্রবেশ করে লুটপাট চালায়। হামলায় আহত হয় নারীসহ ১৮ জন। তাদের মধ্যে মাকসুদা বেগমের হাত ভেঙে যায়। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

চম্পকনগরের বিলকিছ বেগম জানান, শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে তিনি পরিবারের লোকজনের কাপড় পরিস্কার করছিলেন। এ সময় ৫০-৬০ জন লোক দা, টেঁটা, বল্লম নিয়ে বাড়িতে হামলা চালিয়ে বিল্ডিংয়ের বারান্দা ও জানালার কাচ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলে। উঠানে রাখা স্বামীর নিউ মডেলের ১৫০ সিসি বেনিলি মোটরসাইকেলটি লোহার রড দিয়ে ভাংচুর করে। এ সময় বাধা দিতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। পরে ঘরে ঢুকে তার আসবাবপত্র নষ্ট করে আলমারি ভেঙে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে হামলাকারীরা।

একই গ্রামের আ. মোতালিব জানান, তার ঘরের সব আসবাপত্র ভাংচুর করা হয়। তার ঘর থেকে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে তাকে নিস্ব করে দিয়েছে হামলাকারীরা।

এ ছাড়া আমেনা বেগম জানান, অতর্কিতভাবে ২৫-৩০ জন ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে রক্ষিত নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার লুট করে পরিবারের নারীদের মারধর করে তারা। বাইরেও ৫০-৬০ জন অস্ত্রধারী তার বিল্ডিংয়ের বারান্দা ও জানালার কাচ ভেঙে ফেলে। টিনের ঘরগুলোর টিন কেটে দেয়।

এ ছাড়া জজ মিয়া, মঞ্জুর হোসেন, মামুন, জাহাঙ্গীর, আনোয়ার হোসেন, আ. রব, নাসির আ. সাত্তার, নয়নতারা, জাকির হোসেন, নবী হোসেন, পারভেজ, জসিমউদ্দিন, শাওন, বাবুল, রমজান, সাদিক, সাব্বিরসহ চম্পকনগরের গ্রামবাসী তাদের বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট ও মারধরের অভিযোগ করেন। তারা বলেন, পাঁচ থেকে ছয়শ' লোক সংঘবব্ধ হয়ে টেঁটা বল্লম নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে তাদের গ্রামে তাণ্ডব চালিয়েছে। নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করেই হামলাকারীরা ক্ষান্ত হয়নি, গ্রামের বেকার যুবকদের ফার্মের মুরগি এবং ফ্রিজ ভেঙে মাছ-মাংস পর্যন্ত তারা লুট করে নিয়ে গেছে। গ্রামবাসী এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে শুক্রবার বিকেলে মিছিল করে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিলে এলাকায় ফের উত্তেজনা দেখা দেয়। খবর পেয়ে থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের বিচারের আশ্বাস দিলে গ্রামবাসী শান্ত হন। তবে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ঘটনাস্থল ও এর আশপাশ গ্রামে এখনও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

চম্পকনগরের পক্ষে ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম মেম্বার বলেন, তিন গ্রামের শত শত লোক দেশি ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়ে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চম্পকনগর গ্রামে তাণ্ডব চালিয়েছে। হামলাকারীরা তার ঘর থেকে চার লাখ টাকা ও আট ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় তার বসতঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করা হয়েছে। ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য লোকমান হোসেন ও আওয়ামী লীগ নেতা তোফাজ্জল হোসেন হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

খাগকান্দা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার কাকাইলমোড়ার লোকমান হোসেন হামলার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, শুক্রবার সকালে বিচারের নাম করে চম্পকনগর বাজারে তাদের লোকজনকে মোছলেম মেম্বারের লোকজন পিটিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা তোফাজ্জাল হোসেন বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

খাগকান্দা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম জানান, আড়াইহাজারে এর আগে এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেনি। একটি গ্রামের রাস্তার পাশের সব বাড়িঘর এবং বাজারের দোকানপাটসহ সবকিছু ভাংচুর করা হয়েছে।

থানার ওসি আকতার হোসেন জানান, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত চম্পকনগর গ্রাম পুলিশ পরিদর্শন করেছে। এখনও ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ব্যাপারে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।


মন্তব্য