নান্দনিক বঙ্গবন্ধু

প্রকাশ : ১৫ আগষ্ট ২০১৯

নান্দনিক বঙ্গবন্ধু

  ড. আতিউর রহমান

ছিলেন তিনি 'দিঘল পুরুষ'। তাঁর চোখে সর্বদাই ধরা পড়ত 'রূপসী বাংলার স্নিগ্ধ মুখশ্রী'। অনায়াসেই ধরে ফেলতেন বাংলার নীল আকাশ। তিনি বলতেন, 'আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।' 'স্বপ্ন তাঁর বুকভরে ছিলো/পিতার হৃদয় ছিল, স্নেহে-আর্দ্র চোখ'। ছিলেন তিনি 'বাংলা অক্ষর', 'চর্যাপদের গান', 'বাংলাদেশের হৃদয়'। আপাদমস্তক এই বাঙালিই আমাদের প্রাণপ্রিয় বঙ্গবন্ধু। বিশাল হৃদয়, চলা, বলা, লেখা ও নীতিমালা মিলেই তাঁর অনুপম ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বের দ্যুতিই তাঁকে করে তুলেছে এক বিরাট শিল্পী। এই নান্দনিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমরা খুব কমই লিখেছি। বলেছি আরও কম।

মহান দার্শনিক সক্রেটিস জীবনের সৌন্দর্যকে চিহ্নিত করেছিলেন 'ন্যায়'-এর মধ্য দিয়ে। যেখানে ন্যায় নেই, সেখানে সৌন্দর্য থাকতে পারে না। সত্য ও সুন্দরকে একমাত্র ন্যায়ের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করা যায়। আর ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য চাই ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এ জন্যই গুরু সক্রেটিসের শিষ্য আরেক মহান দার্শনিক প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন ন্যায়কে। আমরা যদি আমাদের জাতির পিতার জীবন ও তাঁর সংগ্রামের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব তাঁর পুরো জীবনটাকেই তিনি উৎসর্গ করে গেছেন সত্য ও ন্যায়ের সৌন্দর্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। নিজ দেশের মানুষের প্রতি বহিরাগত অপশাসকদের অত্যাচার তাঁর কাছে অসুন্দর ঠেকেছে। কিন্তু মানুষের ভেতরকার স্বাভাবিক সৌন্দর্যবোধ বা ন্যায়বোধের প্রতি তিনি আস্থা হারাননি। তাই ওই বয়সেই চেষ্টা করেছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক অন্যায় প্রতিহত করে একটি 'সুন্দর' সমাজ গড়ার। শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল তাঁর সহজাত পক্ষপাতিত্ব। তাই তিনি 'ভাষা আন্দোলন', রবীন্দ্রসঙ্গীত রক্ষা আন্দোলনে অনায়াসে যুক্ত হতে পেরেছিলেন।

স্বদেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসাই তাকে প্রাণ জুগিয়েছে। কারও প্রতি ঘৃণা বা প্রতিহিংসা কখনও তাঁকে চালিত করেনি। তাই তো তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে তিনি হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যদের সম্বোধন করেছেন 'তোমরা আমার ভাই' বলে। আর একই সঙ্গে দৃঢ়কণ্ঠে তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা করলে তাদের প্রতিহত করা হবে। মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি প্রতিহিংসা দ্বারা পরিচালিত হননি। কিন্তু এই ভালোবাসা তাঁকে ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন হতে শিখিয়েছে। আপসহীনতা প্রসঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সক্রেটিসের একটি তুলনা করা যায়। সক্রেটিসকে তাঁর জীবন দিয়ে ন্যায়ের সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। আপস করলে তাঁকে হেমলক বিষপান করে মৃত্যুবরণ করতে হতো না। কিন্তু তিনি জীবনের সৌন্দর্যের পূজারি ছিলেন। তাই ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করেননি। বঙ্গবন্ধুকেও ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে কারাবরণ করতে হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে আর যারা আন্দোলন করেছিলেন, তারা সবাই মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বলেছিলেন- 'মুচলেকা দেব কেন? মুচলেকা দিলে তো দোষ স্বীকার করা হয়। ন্যায্য দাবির প্রতি সক্রিয় সমর্থন জানানো কোনো অবস্থাতেই অপরাধ হতে পারে না।' ফলে বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত হয়েছিলেন। এখানেই বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় সৌন্দর্যবোধের সন্ধান মেলে। সেদিন ওই মুচলেকা দিলে তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির কি আদৌ কোনো ক্ষতি হতো? মনে হয় না। বরং প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে আইন নিয়ে পড়ালেখা শেষ করতে পারলে কুলীন রাজনীতিকদের মাঝে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা হয়তো একটু বাড়ত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ন্যায়ের প্রশ্নে এই ক্ষুুদ্র আপসটুকুও করেননি। এই আপসহীনতাই তাঁকে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। সাধারণের বিবেচনায় যে ঘটনাটি তুচ্ছ, সেটির দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব অনুভব করতে পারতেন বঙ্গবন্ধু। বিশাল প্রেক্ষাপটের যে অংশটুকু 'বিশেষ' তা বুঝতে পারা এবং সেই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়াটাকেই 'আর্ট' বলে চিহ্নিত করে গেছেন আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মহাকবির এই কথাগুলোকে যদি নন্দনতত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন বড় মাপের শিল্পী। তাঁর সময়ের সমাজের কথাগুলো, তাঁর আশপাশের মানুষের বঞ্চনা ও দাবিগুলো একজন সুনিপুণ কথকের মতো তিনি বলে গেছেন। নানা মতের, নানা পথের মানুষকে এক ছাতার তলে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। সবাইকে সংগঠিত করতে সবাইকে ধারণ করতে হয়। তিনি সেটা পেরেছিলেন বলেই অন্য অনেক মুক্তিকামী নেতার তুলনায় তিনি বিশেষ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। পুরো স্বদেশকে তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর কথায়, চিন্তায়, কর্মে পুরো দেশের বাস্তবতার প্রতিফলন দেখেছিল এ দেশের মানুষ। ফরিদপুরের দিনমজুর 'দাওয়ালদের' আন্দোলনে যেমন তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি এ দেশের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার জন্য ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনেও তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে দৃঢ় প্রত্যয়ে শিল্পী-সাহিত্যিকদের বলতে পেরেছিলেন, 'জনগণের জন্যই সাহিত্য। এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের লেখনীর মধ্যে নির্ভয়ে এগিয়ে আসুন, দুঃখী মানুষের সংগ্রাম নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করুন।' (দৈনিক ইত্তেফাক, পাকিস্তান, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১)। এই যে সর্বব্যাপী উপস্থিতি এর জন্য প্রয়োজন সবার সমস্যা ও সবার স্বপ্নগুলোকে বোঝা এবং এই সংকটের প্রেক্ষাপটে স্বপ্ন বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করে সে পথে এগিয়ে যাওয়া। নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু এ ক্ষেত্রে সফল। হায়াৎ মামুদ লিখেছেন- '...তাঁর অসামান্যতা ছিল তাঁর আত্মপরিচয়ের অহংকারে :তিনি যে কৃষকের সন্তান তা নিজে কখনো ভোলেননি এবং কাউকে ভুলতে দেননি তো বটেই- এমনকি কৃষককে ভোলা চলবে না বাংলার মানুষেরও, এই দাবি ও স্বীকৃতি আদায়ে অনড় ছিলেন।' (হায়াৎ মামুদ, 'ভূমিকা', আতিউর রহমান, 'শেখ মুজিব :বাংলাদেশের আরেক নাম')

শিল্প সম্ভাবনার পক্ষে থাকে। থাকে গোঁড়ামির বিপক্ষে। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনায় বেড়ে ওঠা শিল্পবোধও তেমনটিই ছিল। তিনি সম্ভাবনার সব দরজা খোলা রাখার পক্ষে ছিলেন। তাই তাঁর নামেই অনায়াসে 'ইতিহাসের দরজা' খুলে যায়। তাঁর তৈরি সংবিধানের দিকে তাকালে দেখতে পাই মূলনীতি হিসেবে আছে- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ। রাষ্ট্রনীতিতে এই উদারতার পক্ষের যুক্তিও তিনি দিয়ে গেছেন। নির্মল গ্রামে বেড়ে ওঠা মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রকৃতিপ্রেমী হবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতিকে, নির্মলতাকে কেবল ভালোবেসেছেন তাই নয়, বরং শিল্পীর মতোই এই নির্মলতাকে ধারণ করতে চেয়েছেন নিজের জীবনে ও রাজনীতিতে। তাই তো কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- '...যেই আসে আমার বাগানের দিকে একবার না তাকিয়ে যেতে পারে না। বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলি না তুললে আসল গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ- যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে, এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়। আমি লেগেই থাকি।'

এহেন সৌন্দর্যবোধ যে মানুষের তিনি বাঙালি সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হবেন এবং দেশের কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করতেন। তাঁদের অসংখ্য কবিতা তিনি মুখস্থ জানতেন। দেশ স্বাধীন হলে রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা' জাতীয় সঙ্গীত করবেন, এ স্বপ্নও তিনি বহুকাল আগে থেকে দেখতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই অসুস্থ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে গেছেন বাংলাদেশে। তাঁকে দিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা। এ ছাড়া সে সময়ের অসংখ্য গুণী কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে তার প্রীতির ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ভালোবাসতেন আব্বাসউদ্দিনের গান। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণগুলো কেবল তাঁর সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার অসামান্য দলিলই নয়, এসবে তিনি একজন মহান সাহিত্যিকের মতোই মানুষের জীবন, মানুষের আকাঙ্ক্ষা, মানুষের সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। তাই আজও আমরা অনুপ্রাণিত হই, আলোকিত হই তাঁর ভাষণ পড়ে ও শুনে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এই রূপরেখা অর্থনীতির কঠোর ভাষায় নয়, প্রকাশ করেছেন কবির মতোই ছন্দ ও আবেগ দিয়ে:'আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে খাক।/ আমি কী চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক।/ আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক।/ আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসে খেলে বেড়াক।/ আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণ ভরে হাসুক।'

- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৯ মে ১৯৭২।
 
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংক
dratiur@gmail.com


মন্তব্য