বাংলাদেশ গড়ায় বঙ্গবন্ধুর ব্রত

প্রকাশ : ১৫ আগষ্ট ২০১৯

বাংলাদেশ গড়ায় বঙ্গবন্ধুর ব্রত

  মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

শোকের এই দিনে ইতিহাসের প্রবাদপুরুষ, স্বাধীনতার মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'ঐ মহামানব আসে।' আমাদের জাতীয় জীবনে মহামানব হিসেবে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি এসে আমাদের উপহার দিয়েছিলেন স্বাধীন দেশ ও অর্থনৈতিক মুক্তি। আমার সৌভাগ্য যে, একান্ত সচিব হিসেবে এই মহানায়ককে আমি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তিনি কীভাবে দেশ গঠনে দিনরাত কাজ করেছেন, ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বিজয়ের ২৫ দিন পর বঙ্গবন্ধু তার প্রিয় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। গোটা জাতি তার আগমনের ক্ষণগণনা করে কাটিয়েছে। নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে, তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানত না। কারণ স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ছয় দফার অন্তর্নিহিত অর্থ যদি কেউ অনুধাবন করতে পারে, তাহলে বুঝতে পারবে- এর মধ্যেই নিহিত ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি।

বঙ্গবন্ধু যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন গুদামে খাদ্য নেই, মাঠে ফসল নেই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ নেই। বস্তুত ব্যাংকগুলোই কার্যকর নেই। সড়ক ও রেলপথ বিচ্ছিন্ন, নৌ ও সমুদ্রবন্দরগুলো বিধ্বস্ত। স্কুল-কলেজগুলো ছিল পরিত্যক্ত সেনাছাউনি। পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে সম্ভাব্য সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এই ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার সুকঠিন ব্রত নিয়েছিলেন।

দেশ গড়ার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু দর্শনের মূল কথা ছিল মানুষের মর্যাদা। আরও ভেঙে বললে, গরিব, দুঃখী, কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমি যেদিন তার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পাই, প্রথম সাক্ষাতেই তিনি বলে দিয়েছিলেন- 'লুঙ্গি পরা, খেটে খাওয়া মানুষগুলো আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে আটকাবি না। সুট-কোট পরা আমলারা তাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।'

যুদ্ধের পর একজন মানুষও যাতে না খেয়ে মারা না যায়, সে জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। চীন, রাশিয়া, আলজেরিয়ার মতো দেশে যুদ্ধের পর অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তার প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে বাংলাদেশে এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেননি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সফর করেছি। দেখেছি, তিনি গিয়েই প্রথমে জিজ্ঞেস করতেন, সাধারণ মানুষ কেমন আছে। কোথাও খাদ্য সংকট আছে কি-না।

স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষকের ওপর বাড়তি কোনো চাপ দিতে চাননি বঙ্গবন্ধু। দেশে ফিরেই প্রথমে তিনি কয়েক লাখ সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করেছিলেন। খাদ্য উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিয়েছিলেন। কৃষক যাতে বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক পায়, সে জন্য নিজে তদারকি করতেন। প্রথম সুযোগেই তিনি গভীর ও অগভীর নলকূপ আমদানি করেছিলেন কৃষকের সেচ সুবিধার জন্য। এখনও যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কৃষকের জন্য ভর্তুকিতে জোর দিতে দেখি, এটা আসলে বঙ্গবন্ধুরই উত্তরাধিকার।

বঙ্গবন্ধু জানতেন, যে কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কালোবাজারি বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায়। সে জন্য প্রথমেই গঠন করেছিলেন টিসিবি। এর মাধ্যমে চাল থেকে কেরোসিন পর্যন্ত আমদানি করা হতো। কালোবাজারির সুযোগ যাতে না থাকে। উপরন্তু তিনি গঠন করেছিলেন 'কসকো' বা কনজ্যুমার সারপ্লাস করপোরেশন। এখন হয়তো অনেকে এর নামও জানেন না। টিসিবি আমদানি করত আর কসকো সারা বাংলাদেশে ঘরে ঘরে ন্যায্য দামে বিক্রির ব্যবস্থা করত। কেবল সাধারণ রেশনিং নয়, মডিফায়েড রেশনিংও চালু করেছিলেন।

বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা পায়, তখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল। চার ডলার ব্যারেল তেলের মূল্য ওই সময় ১২ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। এর মধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্রত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি নিজে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম দিয়েছিলেন 'বাংলাদেশ ব্যাংক'। চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও দুটি বেসরকারি খাতের ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত করে নিজেই নাম দিয়েছিলেন- সোনালী, রূপালী, পূবালী, জনতা, অগ্রণী ও উত্তরা।

বঙ্গবন্ধুর গুডউইল এতটা বেশি ছিল যে, গোটা বিশ্ব সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আক্ষরিক অর্থেই এক পয়সা রিজার্ভ ছিল না। সুইডেন ও কানাডা বিনা শর্তে নগদ ডলার দিয়েছিল প্রথম রিজার্ভ হিসেবে। খাদ্যের প্রথম চালান এসেছিল ভারত ও ইরাক থেকে। আমরা ভুলে যাই, ইরাক ওই সময় বড় ধরনের খাদ্য সহায়তা দিয়েছিল। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সব নদী ও সমুদ্রবন্দর মাইনমুক্ত করে দিয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব জার্মানি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় উদার সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। নেদারল্যান্ডসের দেওয়া ডাকোটা প্লেন দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। সুইডেন সহায়তা করেছিল পেপার মিল স্থাপনে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে খুব বেশি সময় নেয়নি।

আমরা দেখেছি, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেই বঙ্গবন্ধু এক নম্বর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন 'দারিদ্র্য বিমোচন'। সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যার দেশে তখন সাড়ে ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। তিনি আরেকটি বিষয় বারংবার জোর দিতেন। তা হচ্ছে, ধনী-গরিব বৈষম্য কমাতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনে বঙ্গবন্ধু দেশের সেরা অর্থনীতিবিদদের সমাহার ঘটিয়েছিলেন। তাদের বলতেন, এমন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে করে দরিদ্র মানুষের আয় দ্রুত বাড়ে। আবার উচ্চবিত্তদের ওপর বেশি কর আরোপ করতে বলতেন। ওই কর দরিদ্রদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবাক্ষেত্রে কাজে লাগাতে বলতেন।

আরেকটি বিষয়ে বঙ্গবন্ধু খুবই জোর দিতেন। তা হচ্ছে, সমবায়। বলতেন, ইউরোপের দেশগুলো উন্নত হয়েছে সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে। বাংলাদেশকেও পারতে হবে। যে কারণে আমাদের সংবিধানে তিনি সমবায়ের কথা সন্নিবেশ করেছিলেন। সংবিধানমতে বাংলাদেশে সম্পত্তি তিন ধরনের- রাষ্ট্রায়ত্ত, ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সমবায়ের আওতাধীন। বিশ্বে তখন দুই ধরনের অর্থনীতি ছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সবই রাষ্ট্রায়ত্ত। আর পুঁজিবাদী দেশগুলোতে সবই ব্যক্তিমালিকানাধীন। বঙ্গবন্ধু এই দুইয়ের মিশ্রণ কেবল ঘটানটি, সমবায়ের মাধ্যমে তৃতীয় একটি ধারাও চালু করতে চেয়েছিলেন। তিনি কুটির শিল্প ও পল্লী বিদ্যুতায়নে খুব জোর দিতেন। বলতেন, এর মাধ্যমে বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান হবে।

বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উন্নয়নের অন্তরায়। তাই তখনই পরিবার পরিকল্পনায় জোর দিয়েছিলেন। দেশের ১২টি থানায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পাইলটিং শুরু করেছিলেন তিনি। আমরা এখন সাত শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলি। অথচ বঙ্গবন্ধুর সময়ই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। তিনি তখনই বলতেন, বাংলাদেশ চিরদিন অনুন্নত থাকতে পারে না। অচিরেই উন্নত দেশের কাতারে যাবে।

আমাদের দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি যে ধারা চালু করেছিলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর তা উল্টোপথে চলা শুরু করে এবং বাংলাদেশ পিছিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা আবার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছি। এ ক্ষেত্রে একটি মনস্তাপ আমার রয়েছে। বঙ্গবন্ধু যেভাবে ধনী-গরিব বৈষম্য দূর করতে চাইতেন, আমরা সেভাবে পারছি না। বরং দিন দিন ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে।
 
অর্থনীতিবিদ; সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক বঙ্গবন্ধুর প্রাক্তন একান্ত সচিব


মন্তব্য