কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না

প্রকাশ : ১৫ আগষ্ট ২০১৯

কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না

  ফরিদুর রেজা সাগর

আমার এক বন্ধু কিছুদিন আগে 'সচিব' পদ থেকে অবসরে গেলেন। কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন, তার বাবা পাকিস্তান আমলে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। বাঙালি হয়ে সচিব হবেন- এটা ছিল দুরাশা। তিনি যখন চাকরি পান, তখন দশ গ্রামের লোক তাকে দেখতে এসেছিল। কারণ তিনি সরকারি চাকরি পেয়েছেন।

আমার সচিব বন্ধু হাসতে হাসতে বললেন, সচিব হয়ে অবসর নিলাম। কিন্তু কেউ আমাকে সামান্য সংবর্ধনাও দিল না। গ্রামের মানুষ আমাকে দেখতে এলো না। কারণ স্বাধীন দেশে এখন অনেক সচিব।

আমি আরও যোগ করলাম। আমাদের ছেলেবেলার বন্ধুদের দিকে দ্যাখো। অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে। অনেকে ডাক্তারি পড়েছে, কেউ ব্যবসা করে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সফলতা রয়েছে।

বন্ধু বললেন, আরও বড় বড় সফলতা এখন বাংলাদেশজুড়ে। ভেবে দেখলাম, আমাদের অনেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হয়ে অবসর গ্রহণ করেছেন।

ক্রিকেটে আমাদের সাফল্য বর্ণনার অতীত। সাকিব আল হাসান বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার। ৫০ বছর আগে এসব কি ভাবা যেত? সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের এক বন্ধু গার্মেন্টস শিল্পে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য কোরিয়া গিয়েছিলেন। এক সদ্য প্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টসের পক্ষ থেকে তিনি কোরিয়া। ফিরে এসে তিনি নিজের উদ্যোগে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তার ফ্যাক্টরি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অভাবনীয় তার সাফল্য।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ এখন নানামুখী শিল্পসাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে। আমাদের উৎপাদিত প্রোডাক্ট সারা দুনিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের মালিকরা ব্যবসা সম্প্রসারিত করছেন দেশে-বিদেশে। আমাদের ওষুধ সামগ্রী, ফুড প্রোডাক্ট পাওয়া যায় সারাবিশ্বে। অভাবনীয় এই সাফল্য।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল একটি দেশ। যাতায়াত ব্যবস্থায় আমরা অনেক উন্নয়ন সাধন করেছি। বাংলাদেশ বিমান উড়ে যায় দেশ-দেশান্তরে। আমাদের দক্ষ পাইলটরা চাকরি করেন বিদেশি এয়ারলাইন্সে।

যখনই বিদেশে যাই তখন দেখা যায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাঙালি ভাইদের সঙ্গে। কত ধরনের পেশায় তারা নিয়োজিত আছেন, ভাবলে অবাক হতে হয়! চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী ছাড়াও অন্যান্য পেশা। আমরা অনেক দক্ষ। অনেক কুশলী। দুনিয়াব্যাপী আমরা ছড়িয়ে পড়েছি বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে।

বাংলা ভাষা এখন পৃথিবীতে স্বীকৃত অন্যতম মাতৃভাষা। আমাদের সংগ্রামী একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পুরো পৃথিবীতে পালিত হয়।

আমাদের বন্ধুরা হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড কিংবা ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন বিষয় কিংবা উচ্চতর গবেষণা করছেন। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করছেন। পরাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন নিয়ন্ত্রিত একটি মাত্র টেলিভিশন ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে এখন ২৫টির অধিক টেলিভিশন চ্যানেল। রেডিও আছে অনেক। স্বাধীন মত ও আদর্শে বিশ্বাসী অনেক দৈনিক পত্রিকা আছে।

আমাদের নিজস্ব চলচ্চিত্র আছে। আমরা নিজের পরিচয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিই। অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করি। জাতিসংঘে আমরা শক্ত প্রতিনিধি।

আমরাই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করি। আমাদের বন্ধুস্থানীয় অগ্রজ ও অনুরক্তরা দেশের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। পেছনে তাকালে কত স্মৃতিই না মনে ভেসে ওঠে! আমাদের পূর্বপুরুষরা কেমন জীবন কাটিয়েছেন! আমরা কেমন কাটাচ্ছি? পরাধীনতা আর স্বাধীনতার পার্থক্য সহজেই বোঝা যায়। আমার এক বন্ধু চিকিৎসক। তিনি বললেন, বিদেশে যখন তিনি উচ্চতর পড়াশোনা করতেন তখন অনেক সম্মান দিত সবাই তাকে। সেই বন্ধু দেশসেবার জন্য পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরলেন। এখানকার হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এখন তিনি বিশাল হাসপাতাল স্থাপন করেছেন। শত শত রোগী তার চিকিৎসায় সুস্থ ও নীরোগ জীবনযাপন করছেন।

আমার আরেক বন্ধু মতিঝিলে ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে জীবন শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি বিশাল ভূসম্পত্তি ও কল-কারখানার মালিক। এ রকম অসংখ্য সাফল্যের গল্প উল্লেখ করা যায়।

বাঙালিরা সমুদ্র জয় করেছে। মহাকাশ জয় করছে। একটা স্বাধীন দেশ আমাদের। একটা নিজস্ব পতাকা আমাদের। আর তৈরি হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে সাফল্যের গল্প।

আর এসবই সম্ভব হয়েছে এক মহান বাঙালি নেতার জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে। তিনি আপসহীন, স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালির চিরকালের নেতা বঙ্গবন্ধু।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেছিলেন- সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।

এই ঐতিহাসিক বক্তৃতা আমাদের সবচেয়ে অনুপ্রেরণা। আজ উপলব্ধি করি, আসলেই আমাদের কেউ শত চেষ্টা করেও দাবিয়ে রাখতে পারেনি।

পৃথিবীর বুকে জন্ম নিল নতুন একটি দেশ- বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায় আমাদের যাত্রা শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের সড়কপথে এগিয়ে চলেছে। আর নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
 
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য