বর্ষার কদম অথবা নীলাঞ্জনা

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯

বর্ষার কদম অথবা নীলাঞ্জনা

  সুমন আহমেদ

আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজে যায় অসহায় বুকের জমিন; বারবার মনে পড়ে যায় হারানো সেই সুখের স্মৃতিগুলো। মনে পড়ে নীলার কথা, আর একসঙ্গে কাটানো সেই সুখময় মুহূর্ত। নীলা হয়তো এখন ভুলেই গেছে আমার কথা, ভুলে গেছে বর্ষার সেসব স্মৃতি। নীলা তোমার মনে আছে- তুমি-আমি একই শ্রেণিতে পড়তাম। তোমার সঙ্গে ছিল আমার স্কুলজীবনের পথচলা।

তুমি বরাবরই পড়াশোনায় ভালো ছিলে আর আমি ততটাই খারাপ। তবুও তোমার-আমার বন্ধুত্বে এতটুকুও দূরত্ব ছিল না। একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, রোজ রোজ টিফিন ভাগ করে খাওয়া আর বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফেরা। তুমি কদম ফুল ভীষণ পছন্দ করতে, সব ফুলের চেয়ে কদম ছিল প্রিয়। বর্ষা এলেই কদম ফুলের বায়না করতে; আর আমি প্রতিদিনই আনমনে তোমাকে গুচ্ছ গুচ্ছ কদম এনে দিতাম। এমনই এক বর্ষার পড়ন্ত বিকেলে তুমি-আমি নৌকা নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে ছিলাম আমাদের বিলে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল- প্রচণ্ড বৃষ্টি...।

সেদিনের পড় থেকে বুকের ভেতর তোমাকে নিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি শুরু হয়ে গেল। তোমাকে নিয়ে আমি যেন দিনদিন ভাবনার শহরে হারিয়ে যাচ্ছি। কিছুদিন পর জানতে পারলাম, তুমিও আমাকে নিয়ে ঠিক একই ভাবনা ভাবছ। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তুমি আমার হাতে একটা ভালোবাসার চিরকুট দিয়েছিলে আর সেদিনের পর থেকে দু'জনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল জীবনের এক নতুন অধ্যায়। তুমি আমাকে চিঠি লিখতে আর আমিও তোমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতাম দু'জন-দু'জনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।

কিন্তু তোমার বাড়ির আশপাশে যাওয়ার সাহস হয়নি আমার। হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম তোমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে অনেক ধনী ছেলের সঙ্গে। সে শহরে অনেক বড় সরকারি চাকরি করে, মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা মাইনে পায় আর আমি দরিদ্র বাবার অসহায় একজন বেকার ছেলে। তাই তোমার বাবা আমার সঙ্গে বিয়ে তো দূরের কথা ওনার বাড়ির কাজের ছেলে হিসেবেও রাখতে রাজি নন।

ছোটবেলা থেকেই অভাবের সংসারে বড় হয়েছি; জন্মের পরপরই মা মারা গেলেন। বাবা আবার দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎ মায়ের সংসারে অত্যাচার আর নির্যাতন ছাড়া কিছুই পাইনি একজীবনে। সৎ মায়ের অত্যাচারের যন্ত্রণায় মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হতো মায়ের কাছে চলে যেতে; মা হয়তো ভালোই আছেন দূর আকাশে রাতের তারা হয়ে। যেদিন থেকে নীলার সঙ্গে পথচলা শুরু হয়, সেদিন থেকেই ভুলে গেছি একজীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা আর মানুষের শত অবহেলা। দেখতে দেখতে প্রিয় মানুষটা পর হয়ে যাওয়ার দিন চলে এলো, পৃথিবীর বৃহত্তম ভূমিকম্প যেন বুকের ভেতরটা এলোমেলো করে দিচ্ছে, আকাশটা ধসে পড়ছে শব্দহীন, পায়ের নিচে থরথর করে কাঁপছে মৃত্তিকা- এক পৃথিবী শূন্যতা আঁকড়ে ধরছে বুকের বাম পাশে। মনে হচ্ছে এখনই যমদূত ছিনিয়ে নিয়ে যাবে বহুদিনের পোষা প্রাণ পাখি। তিনটি শব্দের বন্ধনে জড়িয়ে, অচেনা-অজানা পৃথিবী আপন করে চলে গেল নীলা একটি সুখের গন্তব্যের প্রত্যাশায়। বর্ষা এলেই নীলার কাছে চিঠি লিখি আকাশের ঠিকানায়...

প্রিয় নীলা,

কেমন আছ তুমি? হয়তো ভালোই আছ- পৃথিবীর বৃহত্তম সুখময় সুখের সংসারে স্বামী-সন্তান নিয়ে! আমি কিন্তু ভালো নেই; ভালো নেই আমার পাগলপ্রেমিক মন। তুমিই বল তুমি ছাড়া কি আমি কখনও কী ভালো থাকতে পারি?

না, তুমি ছাড়া আমি কখনোই ভালো থাকতে পারি না। আমার ভালো থাকার তুমি নামের সূর্যটা যে ডুবে গেছে বর্ষার কোনো এক অমাবস্যার কালো আঁধারে। তুমি চলে যাওয়ার পর কত বর্ষা গত হয়ে গেল, আজও অবধি ভেজা হয়নি আষাঢ়ের বৃষ্টিতে, নৌকায় চড়া হয়নি কোনো পড়ন্ত বিকেলে! নীলা আজ তুমি নেই, তবুও তোমাকে খুঁজে পাই শাপলা-শালুকের মিছিলে, কদম কেয়ার অফুরন্ত ভালোবাসায় আর স্কুলজীবনের ফেলে আসা সেই শৈশবে। নীলা, কদম ফুল কি তোমার এখনও প্রিয়? নাকি ভুলে গেছ প্রিয় কদমের কথা? নাকি ভুলে গেছ বর্ষার স্মৃতি?

হয়তো কদম তোমার এখনও প্রিয়; হয়তো বা এখনও আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজ অচেনা হাত ধরে।


মন্তব্য