রঙতুলির ক্যানভাসে

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯

রঙতুলির ক্যানভাসে

বিপাশা হায়াত ছবি ::রাজিব পাল

   এমদাদুল হক মিলটন

সৌন্দর্য আর গুণের পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন অনেক আগেই। অভিনয়, ছবি আঁকা, লেখালেখি, আবৃত্তি- সব ক্ষেত্রে তার দ্যুতি ছড়ানো প্রতিভা। সবকিছুকে সাময়িক ছুটি দিয়ে ছবি আঁকা নিয়ে ধ্যানমগ্ন তিনি। বলছি অভিনেত্রী ও চিত্রশিল্পী বিপাশা হায়াতের কথা। যখন যে কাজটি তিনি করেছেন, তাতেই উজাড় করে দিয়েছেন সম্পূর্ণ ধ্যান-জ্ঞান। নিজের ইচ্ছা থেকেই এখন পূর্ণ মনোযোগ স্থাপন করেছেন চিত্রকলায়। ক্যানভাসের রঙের আঁচড়ে তিনি তুলে ধরেন বিচিত্র অনুভব ও অনাবিস্কৃত মানব মনের আখ্যান। তার ক্যানভাসে ফুটে ওঠে আলো-আঁধারের চেনা-অচেনা হাজারো রহস্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ট্রান্সফর্ম গ্যালারিতে শুরু হয়েছে 'সাব কনসাস' শিরোনামে তার একক চিত্রপ্রদর্শনী। বছরব্যাপী ওই প্রদর্শনীতে অংশ নিতে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক অনেক চিত্রকলা প্রদর্শনীতে এর আগেও বেশ কয়েকবার অংশ নিয়েছেন বিপাশা। এবারকার আয়োজনটি কেমন ছিল? 'চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। এটি দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ ছবি দেখার পর অনেকেই অনুভূতি, অভিজ্ঞতার কথা আমাকে জানিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি প্রদর্শনীটি আগামী বছরের বসন্তকাল পর্যন্ত চলবে। বিদেশের মাটিতে প্রতিদিন শিল্পমনা মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি আনন্দ দিয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ ভালো অভিজ্ঞতা নিয়েই ঈদের আগে দেশে ফিরেছি।' বলেন বিপাশা।

১৯৮৩ সালের কথা। বিটিভিতে মামুনুর রশীদ রচিত 'খোলা দুয়ার' নাটকের জন্য ১২-১৩ বছরের মেয়ে খুঁজছিলেন প্রযোজক মোস্তাফিজুর রহমান। আবুল হায়াতের মেয়ের চরিত্র। হাতের কাছে পাওয়া গেল যে মেয়েকে তিনি সত্যিই আবুল হায়াতেরই মেয়ে, বিপাশা হায়াত। ছোটবেলা থেকেই বিপাশার আগ্রহ ছিল সংস্কৃতি জগতের প্রতি। মঞ্চে তার যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৫ সালে, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে। এরই মধ্যে ১৯৮৯ সালে বিটিভিতে অভিনয়শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি। বিপাশা দর্শকদের কাছে পরিচিতি পান হুমায়ূন আহমেদের 'অয়োময়' নাটকে 'লবঙ্গ' চরিত্রে অভিনয় করে। আশির দশকে অভিনয় শুরু করলেও নব্বই দশকে টিভি নাটকে তার উপস্থিতি নাটকের ঐতিহ্যে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। বাংলাদেশের প্রথম প্যাকেজ নাটকের অভিনেত্রী তিনি। তবে বর্তমানে অভিনয় আঙিনা থেকে একেবারে দূরে সরে আছেন এক সময়কার এই দাপুটে অভিনেত্রী। গেল ঈদেও তাকে দেখা যায়নি কোনো নাটকে। কিংবা কোনো নাটকও লেখেননি তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'ইদানীং ছবি আঁকা নিয়ে অনেক ব্যস্ত সময় কাটছে। মিডিয়ার অন্যান্য কাজের দরুন ছবি আঁকায় ছেদ পড়ূক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে সবকিছুই করব আঁকা-আঁকির সময় বাঁচিয়ে। একটা কথা না বললেই নয়। এখনকার নাটকের চিত্র দেখে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ উঠে গেছে। কোনো ভালো স্ট্ক্রিপ্ট পেয়ে যদি অভিনয়ের প্রতি অনুপ্রাণিত হই, তাহলে নিশ্চয়ই আমি অভিনয় করব। শুধু যে অভিনয় থেকে দূরে রয়েছি তা নয়, টেলিভিশনও দেখা হয় না। টেলিভিশন দেখার জন্য যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থাকা দরকার, তা হারিয়ে ফেলেছি। টিভি নাটকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে বেশিরভাগ নাটকই নাটকের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। আমরা এক্সপেরিমেন্ট করব; কিন্তু সেটা নাটক সম্পর্কে পড়াশোনা করে। নাটকের চরিত্রগুলো কেন আসে? কেন নাটকের অবতারণা করেন একজন নাট্যকার? -এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন না বেশিরভাগ নাট্যকার। একজন নির্মাতা কী বানাচ্ছেন তার চেয়ে জরুরি একজন নাট্যকার কেন নাটকটি লিখেছেন। তার উদ্দেশ্যই বা কী। তিনি আসলে কী বলতে চান নাটকের মাধ্যমে। চরিত্রগুলো তিনি কেন এনেছেন। সেই বিষয়গুলো নাটকে অনুপস্থিত। শুধু কিছু পারফরমারকে টিভি পর্দায় আনার অযথা চেষ্টা চলছে।

অনেকেই যাদের শিল্পী হিসেবে অবহিত করেন। আমি তা বলতে নারাজ। এন্টারটেইনিং নাটক বলতে কিন্তু বেদনাদায়ক নাটকও হতে পারে। কমেডি কিংবা ট্র্যাজেডি এর আওতাভুক্ত। মূল্যবোধসম্পন্ন দর্শনপূর্ণ নাটকও হতে পারে। এখনকার নাটকের সংলাপগুলো অন্তঃসারশূন্য, দর্শনশূন্য। দর্শন সঠিক না হলে যে কোনো সাহিত্য, গান, চিত্রকর্ম বা অভিনয় যা-ই হোক না কেন, তা শিল্প হয়ে ওঠে না। নাটক নির্মাণ এত সহজ নয়। ভাঁড়ামির পাশাপাশি নাটকে ঢালাওভাবে প্রেম দেখানো হচ্ছে। প্রেম এত সহজলভ্য বিষয় নয়। প্রেমকেও অনেক শৈল্পিক উপায়ে উপস্থাপন করা উচিত বলে আমি মনে করি। যে প্রেম আমাদের টিভি নাটকে দেখানো হয় তার অন্তঃসারশূন্য প্রেম। প্রেম অনেক সুন্দর, পবিত্র। প্রেমকে আরও গভীরভাবে দেখানো যেতে পারে। এখন নাটক এজেন্সিনির্ভর হয়েছে। কার কত ফলোয়ার শিল্পী মূল্যায়নের প্রশ্নে এটাই তারা দেখছেন।' নাটকের এ দুরবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, 'প্রথিতযশা এবং দক্ষ অভিনেতারা এখন অনেকটা বেকারই বলা যায়। নিজেদের যারা তৈরি করেছেন অভিনয়ের জন্য। যারা অভিনয়কে সত্যিকার ভালোবেসেছেন তাদের দেখি না। তাদের মূল্যায়ন নেই। কিংবা প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। চিত্রনাট্যকাররা যে ভালো আছেন সেটাও বলা যাবে না। গুণী পরিচালকদেরও উপেক্ষা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, এই মেধাবী মানুষগুলো কাজ করতে পারছে না বলেই ভালো নাটক হচ্ছে না।

ব্যক্তিজীবনে সফল মানুষ বিপাশা হায়াত। স্বামী তৌকীর আহমেদ ও দুই সন্তান নিয়ে তাদের স্বপ্নের সংসার। দিনের বেশিরভাগ সময় শিল্পচর্চা ও পড়াশোনায় মগ্ন থাকেন তিনি।


মন্তব্য