মুসলিম উম্মাহর বিশ্ব সম্মিলন

পবিত্র হজ

প্রকাশ : ১০ আগষ্ট ২০১৯

মুসলিম উম্মাহর বিশ্ব সম্মিলন

  ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

হজ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তম সমাবেশ। এটা খোদায়ী অনুশীলন এবং প্রকৃত মানুষ হওয়ার তালিম গ্রহণের স্থান, মিথ্যা আমিত্ব ও শিরকের পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি খোঁজার স্থান। শয়তান ও অশুভ শক্তির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ, পৌত্তলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ তথা বারাআত ঘোষণা এবং খোদার সঙ্গে মিলনের স্থল। একই সঙ্গে তা পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা 'শয়তানের ইবাদত করো না'- এ প্রতিজ্ঞারও নবায়নস্থল এবং 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) মুশরেকদের ওপর অসন্তুষ্ট'- এ বাণীর প্রতি সাড়া দেওয়ার স্থান। এ স্থান ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহর ঔজ্জ্বল্য তুলে ধরা এবং তাদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক সম্মান তুলে ধরার স্থান। হজ হলো জীবনের যে উদ্দেশ্যহীনতা ঠিক তার বিপরীত। শয়তানি শক্তি মানুষকে যে দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যের দিকে পরিচালিত করে হজ হলো তার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। যে শয়তানি গোলক ধাঁধার আবর্তে মানুষ ঘুরপাক খাচ্ছে- হজব্রত পালনের মাধ্যমে তা থেকে বেরিয়ে আসা যায়। হজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বান্দার কাছে পরিস্কাররূপে ফুটে উঠবে সেই পথ, যে পথের সাহায্যে তিনি চিরন্তন জগতে উত্তীর্ণ হয়ে মহান আল্লাহর সমীপে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন।

হজের ইহরামের মাধ্যমে মানবজীবনের চূড়ান্ত পরিণতি যে এক খণ্ড সাদা কাপড় পরিধান করে আল্লাহপাকের দিকেই প্রত্যাবর্তন- এ সত্যকে জীবন্ত করে তুলে ধরা হয়েছে। হাজরে আসওয়াদ তথা কালো পাথরের স্পর্শ ও এর প্রতি ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাওয়াফ শুরু করার দ্বারা অন্য সবকিছুর আনুগত্য ও গোলামি প্রত্যাখ্যান করে এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে বা মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে এক ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা হতে হবে মুসলিম উম্মাহর সারাজীবনের কর্মপ্রয়াস। সা-ঈ বা দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে সাতবার দৌড়ানোর মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলমানকে নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা ও কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে তার জীবনোপকরণের ব্যবস্থা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাতে গমন, সেখানে সব হাজির দিনের বেলায় অবস্থানের মাধ্যমে মানব সৃষ্টির সূচনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদকে মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণে নিয়োগ করার প্রতি গুরুত্বারোপ, মুজদালিফায় রাতে অবস্থানের দ্বারা (ইবাদত-বন্দেগি) চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে আত্মিক উন্নয়ন ঘটানো, যাতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুফলকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে মানব কল্যাণে নিয়োজিত করা হয়। মানুষের মধ্যকার আমিত্ব ও আত্মকেন্দ্রিকতারূপী শয়তানকে পরাজিত করা ও আল্লাহপ্রেম জাগিয়ে তোলার জন্য ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই মুজদালিফায় সংগৃহীত ৭০টি পাথররূপী বুলেট মিনায় অবস্থিত তিনটি শয়তানি প্রতীকে নিক্ষেপের মাধ্যমে শয়তানের ধোঁকা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সদা সক্রিয় অবস্থানে নিয়োজিত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ পাথর মারাই শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে ইব্রাহিমি পন্থায় বিজয় বা কোরবানি ঈদ উৎসবের মাধ্যমে সেদিনই তা উদযাপিত হয়ে থাকে।

হজের মাধ্যমে আসা পরহেজগারির পূর্ণতাই অন্যকে সৎকাজের আদেশ দান এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার সক্রিয় মানুষ করে তোলে। হজের মহাসম্মেলন স্পষ্টত প্রমাণ করে, দীন সব দুনিয়ার জন্য এবং মুসলমানদের মধ্যকার বিভেদ-বিভ্রান্তি ও অনৈক্যের কারণগুলো হজের দর্শনের পরিপন্থি। তাই হজই হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করার একমাত্র সঠিক এবং সামগ্রিক শিক্ষা।



দুনিয়ায় যারাই এক আল্লাহর বন্দেগি করতে চাইবে এবং বাস্তব কর্মজীবনে তার আনুগত্য করে চলবে, তারা যে জাতি আর যে দেশেরই অধিবাসী হোক না কেন, সবাই একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে প্রতি বছর এসে সমবেত হবে, এ জন্য হজ করার পন্থা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, চাকা যেমন নিজ অক্ষের চতুর্দিকে ঘোরে, মুসলমানদের জীবনও তেমনি আপন কেন্দ্রেরই চতুর্দিকে আবর্তিত হয়- এই গূঢ় রহস্যেরই বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে পবিত্র হজ।

পবিত্র হজ পালনের মাধ্যমে মুসলমানরা ইনসাফ এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক সাম্য ও সমতার অনুশীলন করে। এ উপলক্ষে তাদের কিছু সুনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান ও আহকাম পালন করতে হয়। হজের জন্য তাদের সাদা পোশাক পরিধান করতে হয়। মুসলমানদের মাঝে বর্ণ, জাতীয়তা, ভাষা, সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদার দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহর সামনে সবাই সমান। আর যেহেতু তারা সবাই সমান, তাই তাদের কোনো বিশেষ পরিভাষা বা সংজ্ঞায় অভিহিত করা অত্যন্ত কঠিন। এর ফলে মুসলমানরা তাদের মনে শান্তি লাভ করতে পারে এবং লোকদের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। তারা আল্লাহর কাছ থেকেও শান্তি লাভ করে আবার জীবনযাপনকালেও শান্তি ও স্বস্তি ভোগ করে।

হজকে আরও অধিক কল্যাণকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য ইসলাম আধ্যাত্মিক, ভাবগম্ভীর ও পবিত্র পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, যেখানে ঐশী নূরের স্নিগ্ধ পরশে আত্মা হয় তৃপ্ত, হৃদয় হয় সজীব, চিত্ত হয় সুপ্রসন্ন ও সুদৃঢ়। তাই বলা যায়, হজ শরিয়তের একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থা। বস্তুত হজব্রত পালনের মাধ্যমে ইসলামী শরিয়ত আবার ইব্রাহিমি রূপের ঐতিহ্যের দিকে ফিরে আসে। ইসলামী মূল্যবোধ হজের মাধ্যমে হয়ে ওঠে সার্বজনীন। আল্লাহ প্রদত্ত আধ্যাত্মিক বিভায় বিকশিত হয়ে ওঠে হাজিদের মানস ও মন। ইব্রাহিমি চেতনায় তারা আত্মত্যাগী হয় সর্বক্ষেত্রে। তাই বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যের শপথ নেওয়ার অনন্য সুযোগও হচ্ছে এই হজ।

হজের অবধারিত কর্মগুলোর মাঝে 'উকুফে আরাফাহ' তথা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, খুতবা শ্রবণ ও তথাকার অনুষ্ঠানাদি সর্বাপেক্ষা অধিক তাৎপর্যপূর্ণ।

মানবসভ্যতার ইতিহাসের প্রথম ঘর পবিত্র মক্কার কাবা শরিফ থেকে প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যেই আরাফাতের ময়দান অবস্থিত। মক্কা থেকে দক্ষিণ-পূর্বে তায়েফের পথে 'জাবালে রহমত'-এর পাদদেশে তিনদিক পাহাড় ঘেরা, দৈর্ঘ্য আট কিলোমিটার আর চার কিলোমিটার প্রস্থবিশিষ্ট এই সমতল মরু-ময়দান, যার পাশ দিয়ে প্রবাহিত 'নহরে জোবায়দা', একপাশে আবেদি উপত্যকায় 'উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়', অন্যদিকে 'মসজিদে ইব্রাহিম', আরও আছে 'উরানা' নিম্নভূমি, উত্তরে 'সাদ পাহাড়' আর সেখান থেকে দক্ষিণে 'মসজিদে নামিরা'-এর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দান বিস্তৃত। মহানবী (সা.)-এর সময়ে অনুষ্ঠিত বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণকালে আরাফাতের ময়দানে সোয়া লাখ সাহাবায়ে কেরাম উপস্থিত ছিলেন; সবাই কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা ব্যতিরেকেই রাসূল (সা.)-এর মুখঃনিসৃত অমূল্য বক্তব্য সমভাবে শ্রবণ করেছেন এ এক অত্যাশ্চার্য ঘটনা। হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তি মুজেজা আর আরাফাতের কেরামতি বর্তমান অবধি কালের সাক্ষী হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ 'আরাফাহ দিবস' হিসেবে পালিত হয়। এ দিবসটির ধর্মীয় গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলত রয়েছে। আরাফাহ দিবসে মহান আল্লাহ বান্দাদের অধিকতর নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করতে থাকেন, এই বান্দারা আমার কাছে কী চায়? আর সে কারণেই আরাফাহ দিবসে এত অধিকসংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, যা অন্য কোনো দিবসে হয় না। আরাফাহ দিবসে আল্লাহপাক হাজিদের নিষ্পাপ ঘোষণা করেন। মহানবী (সা.) বলেন, 'আল্লাহপাক আরাফাহ দিবসে ফেরেশতাদের ডেকে বলেন, তোমরা লক্ষ করো, আমার বান্দারা কী প্রকারে বহু দূর-দূরান্ত থেকে এসে আজ আরাফাত ময়দানে ধুলাবালির সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তোমরা সাক্ষী থাক, যারা আমার ঘর (কাবা শরিফ) জিয়ারত করতে এসে এত কষ্ট স্বীকার করছে, নিশ্চয়ই আমি তাদের সব গুনাহ মাফ করে দিলাম। অতঃপর ফেরেশতারা বলবেন, অমুক ব্যক্তি যে বিলম্বে এসেছে? তখন আল্লাহপাক বলবেন, আমি তাকেও মাফ করে দিলাম।' আরাফাহ দিবসে রোজা পালন করার মধ্যে অনেক পুণ্য নিহিত রয়েছে। মহানবী (সা.) এ ব্যাপারে বলেন, 'আরাফাতের দিনের রোজাব্রত পালন সম্পর্কে আমি মনে করি যে, আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের এর বরকতে তাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন।' বস্তুত আরাফাহ দিবসের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ইবাদত-বন্দেগি, হজ পালন, খুতবা শ্রবণ আর মোনাজাতের মধ্য দিয়ে একজন হাজি নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তোলেন।

আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্য পরম সৌভাগ্য হলো, ঐতিহাসিক আরাফাতের সঙ্গে বাংলাদেশেরও কিছু স্মৃতিচিহ্ন জড়িয়ে আছে। আরাফাত ময়দানের সবুজ-শ্যামলিমার দিকে তাকালেই বাংলাদেশের কথা মনে পড়বে। কেননা ময়দানের বিস্তৃত স্থানজুড়ে থাকা নিমগাছগুলো বাংলাদেশ প্রদত্ত। ১৯৭৯ সালে প্রায় ২০ হাজার নিমগাছের চারা আরাফাতের ময়দানের সৌন্দর্যবর্ধন ও ছায়াদানের লক্ষ্যে রোপণ করা হয়; আজও সেগুলোর পরিচর্যায় সৌদি প্রবাসী বাঙালিরাই রয়েছেন। বাংলাদেশি নিমগাছের সুশীতল ছায়াতলে বিশ্বের অজস্র হাজি আজও প্রশান্তি খুঁজে নিচ্ছেন। মহান আল্লাহ আমাদের পবিত্র হজের তাৎপর্য অনুধাবনের তাওফিক দিন এবং আরাফাহ দিবসের প্রতিশ্রুত সব বরকত নসিব করুন (আমিন)।

লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য