পরবর্তী ধাপের পথ মসৃণ হোক

এইচএসসির ফল

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯

পরবর্তী ধাপের পথ মসৃণ হোক

  ড. মো. আবদুস সালাম

সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলে সফলকাম শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন আর যারা সফলকাম হতে পারেনি, তাদেরকে পুনরায় সফলকাম হওয়ার প্রত্যাশা রাখি। প্রকাশিত এই ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সন্তুষ্টি প্রকাশেও সহমত পোষণ করি। কিন্তু রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক এবং সন্তানের অভিভাবক হিসেবে এইচএসসির প্রকাশিত ফল আমাকে ত্রিবিধ দিক থেকে অনুরণিত করে। প্রথমত, আমি এই ভেবে আশান্বিত হই যে, একটি রাষ্ট্রের সুষম উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রের মেয়েরা দ্রুতগতিতে ছেলেদের দূরপালল্গায় শরিক হতে পেরেছে। গত পাঁচ বছরে এই পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেয়ে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে ছেলে শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এ বছর প্রকাশিত পরীক্ষার ফলে যেখানে গড় পাসের শতাংশিক হার ৭৩.৯৩, সেখানে মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার ৭৬.৪৪। অথচ ছেলে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার ৭১.৬৭।

ফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালে মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার ছিল ৭০.২৩, তখন ছেলে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার ছিল ৬৯.০৪। পরের বছর মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৭৫.৬০। অথচ ছেলে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার হয় ৭৩.৯৩। ২০১৭ সালে পাসের হার একটু কমলেও মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার যথারীতি ৭০.৪৩ এবং ছেলে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার ৬৭.৬১। আশার কথা হলো, এ বছরও ছেলে শিক্ষার্থীদের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের শতাংশিক হার ৪.৭৭ ভাগ বেশি। তবে ফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ ৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলে শিক্ষার্থীরা মেয়ে শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবুও ভাবাদর্শের একজন মানুষ হিসেবে আমি স্বপ্ন দেখি, শিক্ষাক্ষেত্রে জেন্ডার সমতায়নে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিককভাবে সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষা সুবিধার আওতায় আনা যায়, তাহলে তারা আরও বেশি এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য শুধু বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণ ও বিনা বেতনে অধ্যয়নই যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নারী শিক্ষা বিস্তারে 'পৃথক নারী শিক্ষা ফাউন্ডেশন' গঠন করে মেয়েদের জন্য নিরাপদ 'সেইফ হোম কলেজ' প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তাহলে আমাদের রাষ্ট্রের অনিরাপদ পরীক্ষার হলে নুসরাতের মতো নির্মম হত্যার ভীতি থেকে অন্য মেয়েরা মহাবিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী হবে আর অভিভাবকরাও নিশ্চিন্তে তার মেয়েসন্তানদের সেইফ হোম কলেজে পাঠিয়ে নিরাপদবোধ করবেন।

মেয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে যাওয়া যেমন আমাকে উৎসাহী করে, একই সঙ্গে আমাকে যাতনায় তাড়িত করে নিরপরাধ পরীক্ষার্থীর পবিত্র পরীক্ষার হলে আমার মেয়ের নির্মম হত্যাকাণ্ড। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার চেতনায় শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল রাষ্ট্রের পবিত্রতম তীর্থস্থান। তার নিরাপত্তা বিধানের সাংবিধানিক দায়িত্ব আমার রাষ্ট্রের। আমি স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের আর কোনো নুসরাত পরীক্ষার হলে আয়োজকদের কুপরিকল্পনায় হারিয়ে না যায়। থানা পুলিশ, ওসি আর অধ্যক্ষ কাউকে আমি চিনতে চাই না, আমি রাষ্ট্রের কাছে আমার সব শিক্ষার্থীর নিরাপদ বিচরণের অরণ্য বিদ্যালয় চাই।

গত বছরের ফলের সঙ্গে এ বছরের ফলের তুলনা করলে গড় পাসের শতাংশিক হার বেড়েছে ৭.২৯। নিঃসন্দেহে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা প্রশংসার দাবি রাখেন যে, আগে যে ফল প্রকাশ হতে দীর্ঘ সময় লাগত, তা এবার প্রকাশিত হয়েছে মাত্র ৫৫ দিনে। ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন আর পরিসংখ্যানিক বিপল্গব অর্থনীতিতে উন্নয়নের সূচক গণনায় অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করলেও শিক্ষাক্ষেত্রে পরিমাণগত উন্নয়নের সঙ্গে গুণগত উন্নয়ন সাধন করা শিক্ষার প্রাণ। শতাংশিক হার বাড়লেই যে শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে, তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না যে, উচ্চ মাধ্যমিকের ফলে এত সফলকাম শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কেন ইংরেজিতে নূ্যনতম নম্বর পেয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে মাত্র একজন? আমার বিদ্যায়তনের মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। তাই বলে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর এত দৈন্য কেন? উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানের এই দৈনা কবে দূর হবে? আমি আরও যাতনায় তাড়িত হই এই ভেবে যে, একটি আসনের বিপরীতে প্রায় একশ' শিক্ষার্থীর মেধাযুদ্ধ বন্ধ হবে কবে? রাষ্ট্র থেকে একটি আদর্শ যাচাই প্রক্রিয়া উচ্চ মাধ্যমিকে প্রয়োগ করা কি যায় না, যার ওপর ভিত্তি করে আমি নির্দি্বধায় উচ্চ মাধ্যমিকের ফলের ভিত্তিতে নির্বিঘ্নে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান ও প্রত্যাশা অনুযায়ী পাঠ্য বিষয় নির্বাচন করতে পারি। যাতে করে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ফল প্রকাশের পূর্ব থেকেই তার সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অনিশ্চয়তায় নির্ঘুম রাত কাটাতে না হয়। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার উন্মত্ত হোলি খেলা আমাকে বিচলিত করে এই ভেবে যে, আমার দিনমজুরের জিপিএ ৫ প্রাপ্ত সন্তান কত জায়গায় ভর্তির আবেদনপত্র ক্রয় করবে? কত টাকা খরচ করে কত জায়গায় যাবে সে? কোথায় থাকবে আর কীভাবে খাবে? শিক্ষামন্ত্রীর গুচ্ছ ভর্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে আন্তর্জাতিক মানের আদর্শ যাচাই কৌশল প্রবর্তন করা গেলে শিক্ষার্থীর গুণগত মান নিয়ে কোনো উপাচার্যই ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ পেতেন না। আমার মতে, যে করেই হোক বাংলাদেশে 'উচ্চশিক্ষা একাডেমি' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের জটিল ভর্তি প্রক্রিয়াকে অতি সহজেই ডিসিপিল্গন ও প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী শিক্ষার্থীর মেধা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে উচ্চশিক্ষা নির্বাচন পদ্ধতি চালু করা সম্ভব।

প্রত্যাশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের প্রজ্ঞাসম্পন্ন নেতৃত্বের মাধ্যমে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারক সবাই মিলে দেশের উচ্চ মাধ্যমিকের দৈন্য দূর করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মেধা, যোগ্যতা সামর্থ্যের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নির্ধারণে ডিসিপিল্গন ও প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী একমুখী মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তিত হবে। উচ্চশিক্ষার গুণগত মান অর্জনের মাধ্যমে আজকের উচ্চ মাধ্যমিকের সফলকাম শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জয়জয়কার সুপ্রতিষ্ঠিত করবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখি, আমাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থী প্রজন্ম নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে বিচরণ করবে সৃষ্টিশীল চেতনায়, নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে। পরবর্তী ধাপের শিক্ষা অর্জনের পথ মসৃণ হোক। শিক্ষা সুযোগ নয়, সবার অধিকার-এ কথার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে।

অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
abdussalam@du.ac.bd


মন্তব্য

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ