চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৯

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধে বাংলাদেশের সম্ভাবনা

  ফরিদুল আলম

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান বাণিজ্য সংলাপ যতই অগ্রসর হচ্ছে, ততই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। চীনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনমনীয় নীতি এবং এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি করা মেধাসম্পদ চুরি ও বাণিজ্য বৈষম্য রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে চীনের অনীহা কার্যত দুই দেশকেই এখন অনেকটা 'একলা চলো' নীতি অন্বেষণে বাধ্য করছে। আর এই 'একলা চলো' নীতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই আমরা বিশ্ববাণিজ্যের নতুন অর্থনৈতিক রাজনীতি অবলোকন করব, যার এক ধরনের প্রস্তুতি শুরুও হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই বাণিজ্য যুদ্ধের পর থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই তাদের বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেছে। এর ধারাবাহিকতায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যেমন তাদের লাভের নীতিকে একটু 'ঘুরিয়ে খাওয়ার' মতো করে এগোচ্ছে, তেমনি দক্ষিণ, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভাগ্য খুলে যেতে পারে। ইতিমধ্যে দেখা গেছে, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া এর সুফল পেতে শুরু করেছে। গত এক বছর সময়ের মধ্যে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ১২ শতাংশ হ্রাসের বিপরীতে উল্লিখিত দেশগুলো থেকে যথাক্রমে ৩৬, ২৩, ১৪ এবং ১২ শতাংশ পণ্য আমদানি বৃদ্ধি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এই বাণিজ্য সংলাপ চলার মাঝেই সম্প্রতি জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে সাক্ষাৎ ঘটেছে ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের। ওই সাক্ষাতে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে চীনকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে, গত মে মাসে সর্বশেষ ২৫০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্যের ওপর ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ শতাংশ শুল্ক্কহার পুনর্বিন্যাসের পর আরও ৩২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর একই হারে শুল্ক্কহার আরোপের যে চিন্তাভাবনা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা হচ্ছিল; বাণিজ্য সংলাপ সামনে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে তা আপাতত স্থগিত থাকছে। উল্লেখ্য, এমন প্রস্তাব গত জানুয়ারি মাসেই দুই নেতার মধ্যকার অপর এক সাক্ষাতে একই আশ্বাস দেওয়ার কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করারোপের সিদ্ধান্ত নেয়। সে জন্যই শি জিনপিংকে দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এই আশ্বাসের ওপর খুব একটা ভরসা করা চলে না। এর পরিবর্তে বিষয়টিকে এমনভাবে দেখার অবকাশ রয়েছে, দুই নেতাই চলমান সংলাপের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, সেটা আগেভাগেই জেনে নিজেদের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে তৎপর। সে জন্যই এক কথায় অসফল এই আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। এর প্রমাণ কিছুটা আমরা পাচ্ছি বাণিজ্যিক দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু দেশ থেকে আমদানি বাড়িয়ে দেওয়া। একই নীতিতে হাঁটছে চীন। এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হচ্ছে তাদের প্রস্তাবিত 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' কর্মসূচি। আলোচনার আদ্যোপান্ত বিশ্নেষণ করলে যা বোঝা যায় তা হচ্ছে, তারাও ছেড়ে কথা বলবে না। বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক তৎপরতা বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, তারা যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সম্ভাব্য চাপ সামলানোর নীতি থেকেই এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় বাণিজ্যিক দিক দিয়ে একটু বেশি ঝুঁকে পড়েছে। আর আফ্রিকায় তো অনেক দিন ধরেই এক ধরনের ঔপনিবেশিক নীতির মতো তারা তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। সেই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে যে ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপের কথা হচ্ছিল, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ফলে একটি নতুন বাণিজ্যিক বলয় সৃষ্টির তাগিদে পুরো প্রক্রিয়াটি চীনের দখলে চলে যেতে পারে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, এই বাণিজ্যিক যুদ্ধের এক সুদূরপ্রসারী ফলাফল বিশ্ববাসীর জন্য অপেক্ষা করছে। এর মধ্য দিয়ে নতুন কিছু দেশ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় অঘোষিতভাবে এক ধরনের স্বচ্ছতাও ফিরে আসতে পারে।

বিদ্যমান বাস্তবতায় যেভাবে বাংলাদেশসহ কিছু দেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে, বিষয়টি আসলে এতটা সরলভাবে বিশ্নেষণ করার উপায় নেই। উপরোক্ত দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশই তাদের আর্থিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে বিদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাণিজ্য যুদ্ধজনিত ক্ষতি যতটুকু পুষিয়ে নেওয়া যায়, সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চীন সম্প্রতি এক ধাপ এগিয়ে তারা তাদের মুদ্রা ইউয়ানের মূল্যমান হ্রাস করেছে, যা একাধারে আমদানিকারক ও রফতানিকারক উভয়কেই তাদের সঙ্গে বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা দেবে এবং সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। এর বাইরে চীনের কাছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১ দশমিক ১৭ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের ট্রেজারি বন্ড রয়েছে। প্রতি বছর এর থেকে ভালো অঙ্কের সুদ পায় চীন সরকার। পরিস্থিতি খারাপ দেখলে তারা যদি এই বন্ড বাজারে ছেড়ে দিয়ে অর্থ নগদায়ন করে ফেলে, তবে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারও চীনকে এই বাণিজ্য সংলাপের নামে খুব একটা ঘাঁটাবে বলে মনে হয় না; বরং সংলাপের নামে কালক্ষেপণের মাধ্যমে দুই দেশই তাদের অর্থনৈতিক নীতিকে একটু ঝালিয়ে দেখতে চাইছে, যা পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের জন্য কতটুকু সহায়ক হয়, সেটা বোঝার জন্য। এখন বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করছে সেসব সম্ভাবনাময় দেশের ওপর, যারা তাদের জন্য বয়ে আসা সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে পরিবর্তিত এক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। ইতিমধ্যে এই দৌড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্র ভিয়েতনাম অনেকটাই এগিয়ে এসেছে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বিষয়টিকে একজন ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে অধিক মাত্রায় ব্যক্তিগত লাভালাভের দৃষ্টিতে দেখছেন, শি জিনপিং তথা চৈনিক নীতিনির্ধারকরা অনেক বেশি রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব দিয়ে তা দেখছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদান্তে বর্তমান মার্কিন বাণিজ্যনীতি যে একইভাবে বহাল থাকবে, সেটা বলার সুযোগ নেই। তবে এটা নিশ্চয় বলা যায়, এর মধ্য দিয়ে যে এক পরিবর্তিত অর্থনৈতিক রাজনীতির সৃষ্টি হতে যাচ্ছে চীনের জন্য, তা বর্তমানে ধাক্কা হলেও অচিরেই এই ধাক্কা সামাল দিয়ে এক পোক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা হতে পারে অনেকটা রেস থেকে ছিটকে পড়ার মতো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো চীনে অধিক পরিমাণে বিনিয়োগ করে এবং এই বিনিয়োগের ফলে চীন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের ব্যবসায়ীদের ওপর অধিক করারোপের মাধ্যমে চীন থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে আনতে বাধ্য করে অনেকটা চীনকে শাস্তি দিচ্ছে এবং এক ধরনের কোণঠাসা করে ফেলছে বলে ভাবলেও পরিস্থিতি কিন্তু আসলে সে রকম নয়। চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক উত্থান এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান দেখলে যে কোনো বিনিয়োগকারীর এটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, চীনে বিনিয়োগ এখন আর আগের মতো লাভজনক নয়। অব্যাহতভাবে শ্রমিকের মজুরি বাড়তে থাকা কেবল চীনদেশের বিদেশি কোম্পানি নয়; চীনা কোম্পানিগুলোর জন্যও পণ্যের মূল্যের লাগাম টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে। সে জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য চীনা কোম্পানিগুলোকেও তুলনামূলক সস্তা শ্রমের খোঁজে অন্যত্র বিনিয়োগে মনোনিবেশ করতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য, এ ধারায় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চীনা  কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ শুরু করেছে এবং এর কোনো কোনোটি উৎপাদনেও গেছে।

বাংলাদেশ সরকার ৭০০ একর জায়গা নিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে যে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করেছে, সেটা খুবই সময়োপযোগী বলে মনে করি। এই সুযোগে বর্তমান সময়ের চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধকে পুঁজি করে আমাদের সরকার এই দুই দেশের নতুন বাজার খুঁজতে থাকা বিনিয়োগকারীদের এ দেশে আনার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এদিকে মার্কিন চেম্বার অব কমার্সের এক জরিপে দেখা যায়, গত এক বছর সময়ের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ মার্কিন কোম্পানি চীন ছেড়েছে এবং এদের বেশিরভাগই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের ব্যবসা গেড়েছে, মাত্র ৬ শতাংশ নিজ দেশে বিনিয়োগ করেছে। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের এই বিনিয়োগ ধরতে হলে নিঃসন্দেহে আমাদের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। আমদানি শুল্ক্ক বাড়ানোয় বেসবল ক্যাপ, ব্যাগ, মোটরসাইকেলের মতো চীনা পণ্য আমেরিকানদের জন্য ব্যয়বহুল হয়েছে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা নিঃসন্দেহে এগুলোর জন্য বিকল্প সস্তা বাজার অন্বেষণ করছে। সেই সঙ্গে স্মার্টফোন, খেলনা, ফুটওয়্যার ও মাছের মতো পণ্যের ক্ষেত্রেও আমদানি শুল্ক্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। এই হুমকি কার্যকর হলে নতুন কিছু ক্ষেত্রেও মার্কিন বিনিয়োগের সমাবেশ ঘটতে পারে আমাদের দেশে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন আমাদের সক্ষমতা বাড়ানো। আমাদের এও মনে রাখতে হবে, শুধু সস্তা শ্রমের জন্য এ দেশে বিনিয়োগকারীরা আসবে না। উৎপাদন ব্যবস্থায় আমরা কতটুকু সক্ষম এবং বৈশ্বিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি, সেটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখন এসব বিষয়কে বিবেচনায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশের বিনিয়োগকারীদের আমাদের দিকে টানার একটা উজ্জ্বল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজন শুধু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নিবিড় সমন্বয়।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য