নিউক্লিয়াস এবং যুব সমাজে স্বাধীনতার স্বপ্ন

রাজনীতি

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৯

নিউক্লিয়াস এবং যুব সমাজে স্বাধীনতার স্বপ্ন

  শরীফ নুরুল আম্বিয়া

সিরাজ ভাইয়ের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা বই 'আমি সিরাজুল আলম খান' পড়েছি। আপত্তি করার মতো কিছু দেখিনি। তবে বইটি সময় নিয়ে দিন-তারিখগুলোর সঠিকতা ও তথ্যের যথাযথ যাচাই করে সম্পাদনা করা দরকার ছিল। কেননা এই বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহূত হবে।

আমু ভাই-তোফায়েল আহমেদরা ১৯৬২ সালে গঠিত 'নিউক্লিয়াস'-এর অস্তিত্ব মানতে নারাজ। সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে শামসুদ্দিন পেয়ারা লিখিত, 'আমি সিরাজুল আলম খান' নিয়ে আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের মতো জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি নিয়ে এমন একপেশে কথাবার্তা বলবেন, তা আগে কখনও ভাবিনি।

বাস্তবতা হচ্ছে, নিউক্লিয়াস ছিল গোপন সংগঠন। স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রথম পর্যায়ে ছাত্র অঙ্গনে ছাত্রলীগের মাধ্যমে ও পরে শ্রমিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিউক্লিয়াসের নেতারা সম্ভবত আমু ভাই, তোফায়েল ভাই, শেখ ফজলুল হক মনি ভাইকে আস্থায় নেননি, তাই তারা জানেন না। নিউক্লিয়াস কোনো কল্পকাহিনী নয়, এর অস্তিত্ব বাস্তব সত্য এবং তৎকালীন প্রতাপশালী ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ এই নিউক্লিয়াস গঠন করেছিলেন। স্বাধীনতার লক্ষ্যে গঠিত এই নিউক্লিয়াস নিয়ে মরহুম আবদুর রাজ্জাক ও মরহুম কাজী আরেফের অনেক মিডিয়া ইন্টারভিউ রয়েছে। আরেফ ভাইয়ের একটা বইও রয়েছে। কাজী আরেফের একাধিক স্মৃতিসভায় নিউক্লিয়াসের স্বীকৃতি দিয়ে তোফায়েল আহমেদের বক্তৃতাও আমি শুনেছি। তিনি বলেছেন, '৬৯-এর আন্দোলনের সময় সিরাজ ভাই তাকে সবসময় গাইড করেছেন। এখন কেন বিস্তৃত হয়েছেন, তা নিয়ে আমি বিস্মিত।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমার বয়স ছিল ২৩। আমার সিনিয়রদের কারও বয়সই ৩০-এর ওপর ছিল না। নিউক্লিয়াসের মতো বিপ্লবী ও গোপন সংগঠন করতে নামজাদা নেতা না হলেও চলে, স্বাধীনতার লক্ষ্যে অবিচল আস্থাই বড় কথা। প্রাসঙ্গিকভাবে এই আলোচনায় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী নিউক্লিয়াসকে অস্বীকার করেছেন। তার কথা অসঙ্গত বলা যায় না, গণতন্ত্রী হলেও তিনি কখনও সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন ছিলেন না বলে এই শিবিরের অন্তর্ভুক্ত হননি।

ষাটের দশকে বাংলাদেশের মানুষের মনে স্বাধীনতার যে সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল, তাতে এ রকম গোপন সংগঠন বা গ্রুপ গড়ে ওঠা ছিল স্বাভাবিক। মহিউদ্দিন আহমদের গবেষণায় তার কিছু প্রতিফলন দেখা যায়। লক্ষ্যে অবিচল আস্থা ও সাংগঠনিক দক্ষতার ওপর সব সংগঠনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। নিউক্লিয়াস সফল হয়েছিল তাদের নেতৃত্বগুণে এবং কিছুটা ভাগ্যগুণেও বটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা কর্মসূচি নিউক্লিয়াসের লক্ষ্য অর্জনের পথ খুলে দেয়। ৬ দফা কর্মসূচি না এলে নিউক্লিয়াস হয়তো অগ্নিযুগের অনুশীলন বা যুগান্তরের মতো একটা সংগঠনে পরিণত হতো। তবে নিউক্লিয়াসের নেতারা কঠিন পরিস্থিতি জয় করে কাজ করেছেন। দু'জন চাকরি করে সঞ্চয় থেকে সিরাজুল আলম খানকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন কাজের জন্য। সিরাজ ও রাজ্জাক জেলে যাওয়ার পরও আরেফ কাজ চালিয়ে গিয়েছেন তার সাধ্যমতো। রাজ্জাক ও আরেফ ইতিপূর্বে নিউক্লিয়াস নিয়ে যা বলেছেন, সিরাজ তার পুনরাবৃত্তি করেছেন মাত্র তার বইতে। ছাত্রলীগ নিউক্লিয়াসের কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যখন আমি ছাত্রলীগে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত, আমি নিজে তাদের তৎপরতা প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলনে সব কর্মীর নজরে পড়েছে সিরাজুল আলম খানের উপস্থিতি। এটা ছিল ওপেন সিক্রেট যে, সিরাজুল আলম খান '৬৯-এর আন্দোলনের নেপথ্য নেতা। শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে নিঃশর্তে মুক্ত করে আনা এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মঞ্চে তাকে সংবর্ধনা দিয়ে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে এক পৃথক উচ্চতা অর্জন সামগ্রিকভাবেই আমাদের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে অনেক দূর অগ্রসর করেছে।

১৯৬৮-৬৯, ১৯৬৯-৭০, ১৯৭০-৭২-এর ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদ ছিল পুরোপুরি নিউক্লিয়াসপন্থিদের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৬৯ সালের ১১ দফার ছাত্র আন্দোলনে খালেদ মোহাম্মদ আলীকে দেখেছি তার বক্তৃতায় স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামের বিষয় উসকে দিতে। এসব বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে বা চেপে ধরলে বলতেন, সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলো। সব কর্মীর জন্যই অনুরূপ প্রক্রিয়া চালু ছিল। আগ্রহী ও আন্দোলনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত কর্মীরা কাজী আরেফ ও মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মণি) আলোচনা ও নানাবিধ শৃঙ্খলায় সম্মতিসাপেক্ষে নিউক্লিয়াস পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সদস্য হতো। এই প্রক্রিয়ায় ওই সময় ছাত্রলীগের হাজার হাজার কর্মী সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল।

আজ আমু ভাই-তোফায়েল ভাইয়েরা যা-ই বলেন না কেন, নিউক্লিয়াসকে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে পারবেন না। আমি নিজে দেখেছি ১৯৬৮-৭১ সাল পর্যন্ত খুব কাছে থেকেই ওই সময়ের ছাত্রনেতৃত্বকে, বিশেষ করে তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজকে এবং তারা কীভাবে সিরাজুল আলম খানের সান্নিধ্যে থাকতেন। প্রত্যক্ষ করেছি কীভাবে কাজী আরেফ আহমেদ ও মনিরুল ইসলাম ছাত্রলীগ পরিচালনা করেছেন স্বাধীনতার লক্ষ্যে। আমি ১৯৭০-৭২ সালে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি থাকার সুবাদে যতটুকু জানতাম, তার চেয়ে বেশি জানতাম নিউক্লিয়াস বা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদে আমার সংশ্নিষ্টতার কারণে। হাল আমলের মতো ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছিল না। ছাত্রলীগ স্বাতন্ত্র্য বজায় চলত। ছাত্র আন্দোলন-সংগঠনের সংস্কৃতি এমনই ছিল তখন। এ অবস্থা নিউক্লিয়াস নেতৃত্বকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। তবে ইস্যুর গুরুত্ব বিবেচনায় নেতৃত্ব উচ্চমহলের সঙ্গে সমন্বয় করে নিতেন।

'৭০-এ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে ছাত্রলীগ থেকে বিদায় নেওয়ার পর তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থাকতেন এবং তার নির্দেশে কাজ করতেন। '৬৯-এর আন্দোলনের পর নিউক্লিয়াসের কর্মকাণ্ডের রিপোর্ট শোনার পর স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত নিতে বঙ্গবন্ধুর জন্য সহজ হয়েছিল। যদি ইয়াহিয়া খান নির্বাচন না দিতেন বা কোনো কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ সম্ভব না হতো, তবে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণের কথা আমাদের জানানো হয়েছিল। তাই লন্ডনে মিসেস গান্ধীর বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছিল, তা থেকে নিউক্লিয়াস বিচ্ছিন্ন ছিল না। এ বিষয়ে আমরা প্রস্তুতির প্রয়োজনেই অবহিত ছিলাম। কিন্তু সে পথে যেতে হয়নি এ জন্য যে, বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। নির্বাচনে বিপুল বিজয় ও ৬ দফা বাস্তবায়নের ম্যান্ডেট পাওয়ার পর আমাদের মুক্তিসংগ্রামের পথ আরও উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ভবিষ্যৎ আন্দোলনের পথে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখার স্বার্থে সিরাজ-রাজ্জাকদের সঙ্গে শেখ মনি-তোফায়েলকে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এভাবেই বিএলএফের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আমার ধারণা। কাজী আরেফ পরে বিএলএফের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন ব্যারাকপুরে বসে।

তখন ছাত্রলীগে দুই ধারা বিদ্যমান ছিল। একধারার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান, সংক্ষেপে সিরাজ গ্রুপ; অন্যটি শেখ মনি গ্রুপ।

আবার ফিরে আসি নিউক্লিয়াসের কথায়। সেখানে অনেক রকম শৃঙ্খলা ছিল, পরিশ্রমী হতে হতো, ধ্যান-জ্ঞান স্বাধীনতার জন্য। সিরাজুল আলম খান ধ্যান-জ্ঞানে স্বাধীনতার পক্ষে কর্মীদের অনুপ্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিউক্লিয়াসের নেতাদের মধ্যে কাজী আরেফ ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ। আমার বিবেচনায়, সিরাজুল আলম খানের তত্ত্বাবধানে তোফায়েল আহমেদই ছিলেন উন্মুক্ত আন্দোলনে খুব কার্যকরী। স্বাধীনতার আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কর্মকাণ্ডে আমু ভাইকে দেখিনি; তবে ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনীতিতে তার উপস্থিতি ও গুরুত্ব অনুভব করেছি। এটা ঠিক, নিউক্লিয়াস থেকে বিএলএফ রূপান্তরকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কিছুটা অগোছালো ছিল। পরিস্থিতিও খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। আমাদের মনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিষয়ে ভিয়েতনাম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কলাকৌশল কাজ করত। সম্ভাব্য হামলা মোকাবেলায় নানা ক্ষুদ্র ডিভাইস তৈরি করতে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব ব্যবহার করা হতো। এ সবকিছু সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অবহিত ছিলেন।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পর ২ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মঞ্চ থেকে আ স ম আবদুর রবের স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, যা ছিল অনানুষ্ঠানিক। ৩ মার্চ পল্টনে ইশতেহার উত্থাপন স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে গৌরব দান করেছে। সব কাজের উদ্যোগ ছিল নিউক্লিয়াস নেতৃবৃন্দের; তবে সবকিছু করার সম্মতি সিরাজ-রাজ্জাক আগেই নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসকে প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে সারাদেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। বাস্তবে ২৩ তারিখেই পাকিস্তানের কফিনে এ দেশের যুবসমাজ শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। ওই দিন নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত মোতাবেক জয়বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ প্রদর্শন ও বঙ্গবন্ধু ভবনে গমন দেশবাসীকে আলোড়িত করেছিল। এসব বিষয়ে কাজী আরেফ ও আবদুর রাজ্জাক বিস্তারিত বলেছেন। সিরাজ ভাই নতুন কিছু বলেননি। সিরাজ ভাই তার বইতে বঙ্গবন্ধুকে সামান্যতম খাটো করেননি। আমার বিবেচনায় সিরাজুল আলম খান ছিলেন স্বাধীনতা-পূর্ব বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সিরাজুল আলম খানকে আক্রমণ করে জাসদের বিরুদ্ধে আমু ভাই ও তোফায়েল ভাই যা বলেছেন তা আওয়ামী লীগের নানাজন আগেও বলেছেন। এই সময়ে কার কী ভুল হয়েছে, তার বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা হতেই পারে। কোনো মানুষ ত্রুটিমুক্ত নয়। বঙ্গবন্ধু এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান; কিন্তু ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। জাসদ নেতৃত্বও ত্রুটিমুক্ত নয়। দেশের স্বার্থে, মুজিব বর্ষ পালনের আগে, আক্রমণাত্মক প্রচার-প্রচারণা নয়, বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা এ দেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষ স্বাগত জানাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

সভাপতি, বাংলাদেশ জাসদ


মন্তব্য