স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিকের বিপজ্জনক ব্যবহার

পশু মোটাতাজাকরণ

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৯

স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিকের বিপজ্জনক ব্যবহার

  ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ

সামনে ঈদ। কয়েক দিন আগে ফেসবুকে আপলোড করা এক ভিডিওতে দেখলাম- কোনো এক গ্রামে এক কৃষক কোরবানির জন্য লালিত-পালিত তার ষাঁড়কে মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিচ্ছে। গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের এই প্রযুক্তি মোটামুটি সব কৃষকই রপ্ত করে ফেলেছে। ঈদ এলেই কোরবানির জন্য মোটাতাজা নাদুস-নুদুস গবাদিপশুর চাহিদা বাড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও গবাদিপশু ও পোলট্রি উৎপাদনে নানা ধরনের স্টেরয়েড ব্যবহূত হয়। এসব স্টেরয়েডের মধ্যে রয়েছে- ডেক্সামেথাসন, বিটা মেথাসন, প্রেডনিসোলন, কর্টিসন, ইস্ট্রাডায়ল, টেস্টোস্টেরন, প্রোজেস্টরন, ইস্ট্রোজেন ইত্যাদি। মাংস উৎপাদনে এসব স্টেরয়েডের ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মাংস আমরা খাচ্ছি এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছি। স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে- হূৎস্পন্দন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি ও এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস, ইশকিমিয়া, মাইয়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, হার্ট ফেলিউর, স্ট্রোক, অস্টিওপোরোসিস, প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড ও স্তনের আকার বৃদ্ধি এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস। এসব স্টেরয়েড হরমোন শরীরের প্রাকৃতিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে, ক্যান্সার সৃষ্টি ছাড়াও লিভার ও কিডনি ধ্বংস করে। আর এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও বিশ্বের ভোক্তা সংগঠনগুলো গত ৩০ বছর ধরে মাংস উৎপাদনে স্টেরয়েড ব্যবহার না করার জন্য জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। ভোক্তা সংগঠনগুলোর মতো আমিও মনে করি, মাংস উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করে জনস্বাস্থ্য তথা মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রষুক্তিগত উন্নয়ন আমাদের অনেক সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রষুক্তিগত উন্নয়নের অপব্যবহারের কারণে মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আইন অনুযায়ী সব স্টেরয়েড হরমোন প্রেসক্রিপশন ড্রাগ। তার মানে এসব স্টেরয়েড প্রেসক্রিপশন ছাড়া বেচাকেনা যায় না। অথচ গবাদিপশুর ওপর স্টেরয়েড ড্রাগ প্রয়োগে কোনো আইনগত বাধনিষেধ নেই। আমেরিকা ও কানাডায় ছয় প্রকার অ্যানাবলিক স্টেরয়েড গবাদিপশু ও পোলট্রির ওপর প্রয়োগ করা হয়। এগুলো হলো- ইস্ট্রাডায়ল, টেস্টোস্টেরন, প্রোজেস্টেরন, ইস্ট্রোজেন, অ্যানড্রোজেন ট্রেনবোলন অ্যাসিটেড ও প্রোজেস্টিন মেলেঙ্গেস্টেরল অ্যাসিটেড। এর মানে হলো, কেউ যদি হরমোনসমৃদ্ধ গরু ও মুরগির মাংস খায় এবং দুধ পান করে, তবে এসব ক্ষতিকর হরমোন পরোক্ষভাবে মানুষের শরীরে ঢুকে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। হরমোনসমৃদ্ধ মাংস এবং দুধ খেলে মানুষের শরীরে বাড়তি হরমোন প্রবেশের কারণে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হরমোন মাত্রায় ভীষণ তারতম্যের সৃষ্টি হয়। কারণ শরীর এমনিতেই এসব হরমোন পর্যাপ্ত মাত্রায় প্রস্তুত করে থাকে। এসব বাড়তি হরমোন গ্রহণের কারণে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। শিশুদের দেহ কাঠামো এমনিতেই বয়সের কারণে ছোট থাকে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। বাড়ন্ত শরীরে খাদ্য থেকে প্রাপ্ত সামান্য পরিমাণ হরমোনও শরীরে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন ৮ বছর বয়স্ক শিশু যদি একদিনে স্টেরয়েডসমৃদ্ধ মাংস দ্বারা প্রস্তুত দুটি হ্যামবার্গার খায়, তবে তার শরীরে হরমোনের মাত্রা ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। মনে রাখা দরকার, ছোট শিশুদের শরীরে অত্যন্ত অল্প পরিমাণে প্রাকৃতিক হরমোন থাকে। ক্যান্সার প্রিভেনশন কোয়ালিশন বাবা-মাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মাংসে সামান্য পরিমাণ হরমোনের উপস্থিতি শিশুদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।

শিশুদের মতো বয়স্কদের ক্ষেত্রেও মাংসের মাধ্যমে স্টেরয়েড গ্রহণ বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। বিপদ আরও আছে। গবাদিপশুর মলমূত্রের মাধ্যমে এসব হরমোন আবার প্রতিবেশ-পরিবেশে মিশে যায় এবং তা আবার অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে ব্যবহূত হচ্ছে। মানবদেহে ঢুকে পুনরায় সমস্যা সৃষ্টি করছে। আমেরিকায় বিক্রীত ৮০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহূত হয় গবাদিপশুর মাংস ও পোলট্রি উৎপাদনে। অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক স্বাস্থ্যবান গবাদিপশুর ওপর প্রয়োগ করা হয় তাদের বয়োবৃদ্ধি ঘটানোর জন্য। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক অবশ্য ব্যবহূত হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা গবাদিপশু ও পোলট্রির সংক্রামক রোগ নিরাময়ে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এসব গবাদিপশু ও পোলট্রির ক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত অ্যান্টিবায়োটিক কি এমন সুপারবাগ (জীবাণু, যার বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়) নামের দানব সৃষ্টি করছে, যা মানব সভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? ভোক্তা সংগঠনগুলোর অভিমত- গবাদিপশু ও পোলট্রিতে ব্যাপক মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মহাবিপর্যয়ের কারণ হয়ে পড়েছে। পশুপাখির ওপর প্রয়োগকৃত অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে এমন সব সুপারবাগের উৎপত্তি হচ্ছে, যা প্রথমত মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে এবং দ্বিতীয়ত, পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটাচ্ছে। এসব সুপারবাগ জিন ট্রান্সফার বা মিউটেশনের মাধ্যমে অন্যান্য জীবাণুকে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনে সাহায্য করছে। এ ধরনের মারাত্মক হুমকি ও বিপদের কথা চিন্তা করে আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, আমেরিকান হেলথ অ্যাসোসিয়েশন, ইনফেকশাস ডিজিজ সোসাইটি অব আমেরিকা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঐকমত্য পোষণ করে ঘোষণা দিয়েছে- পশুখাদ্য উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।

২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন ও ওয়ার্ল্ড এনিম্যাল হেলথ অর্গানাইজেশন আয়োজিত এক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন, গবেষকদের হাতে পরিস্কার তথ্য-প্রমাণ রয়েছে- গবাদি পশু ও পোলট্রিতে ব্যবহূত অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে সৃষ্ট রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু জনস্বাস্থ্যের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি সৃষ্টি করে। এসব ক্ষতির মধ্যে রয়েছে মৃত্যুসহ সংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যর্থ হয়ে যাওয়া এবং সংক্রামক রোগের ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়া। ২০১০ সালে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার ও সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্যদানকালে বলছে, মাংস উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এবং মানুষের সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস বা লুপ্ত হওয়ার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সিডিসির পরিচালক ড. থোমাস ফ্রিডেন দৃঢ়ভাবে বলেন, মাংস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পশুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ এবং মানুষের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মধ্যে গভীর সম্পর্কের অকাট্য তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। ২০১২ সালে এফডিএ প্রকাশ করে, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে জীবাণুর বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যার ফলে রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ও বিস্তার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল জীবাণুর চেয়ে অনেক দ্রুত ঘটে থাকে। ফলে এসব রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর কারণে মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা ও ঝুঁকি সংবেদনশীল জীবাণুর চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে যায়। ১৯৯৫ সাল থেকে পোলট্রি উৎপাদনে সিপ্রোফ্লক্সাসিন ব্যবহূত হয়ে আসছে। ১৯৯৯ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত ২০ শতাংশ মুরগির বুকের মাংসে সিপ্রোফ্লক্সাসিন রেজিস্ট্যান্ট সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী ক্যামপ্লোব্যাকটার জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০০৫ সালে এফডিএ মুরগি উৎপাদনে সিপ্রোফ্লক্সাসিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপে সক্ষম হয়। ২০০৫ সালে মুরগির মাংসে প্রায় ৩০ শতাংশ রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর উপস্থিতি প্রমাণিত হয়।

গবাদিপশু ও পোলট্রি উৎপাদনে স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য প্রচণ্ড ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঝুঁকি বিশেষ কোনো অঞ্চল বা দেশের জন্য নয়। এই ঝুঁকি সারাবিশ্বের জন্য। এই বিশ্বায়নের যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিস্তার কোনো সীমানা মানছে না। আমেরিকার মতে, পশ্চিমা দেশগুলো যেমন গবাদিপশু ও পোলট্রি উৎপাদনে স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে, তেমনি বাংলাদেশের মতো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও এই একই ক্ষতিকর ওষুধের মাধ্যমে মাংস উৎপাদন করছে। আর আমরা সেই মাংস প্রতিনিয়ত খাচ্ছি এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছি। মাংস উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে যে সুপারবাগের সৃষ্টি হচ্ছে, তা একসময় মহামারী আকারে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মানব সভ্যতার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এফডিএ ও বিশ্বের ভোক্তা সংগঠনগুলো গত ৩০ বছর ধরে গবাদিপশু ও পোলট্রিতে স্টেরয়েড ও অ্যান্টিবায়োটিক একান্ত প্রয়োজন না হলে ব্যবহার না করার ওপর জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। ভোক্তা খামারি ও চাষিদের মধ্যে ইতিমধ্যে কিছুটা সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রচারমাধ্যমগুলোতে প্রচার করা হলেও ওই ভিডিওটি দেখার পর মনে হয়েছে, বাংলাদেশে এখনও গবাদিপশু ও পোলট্রি উৎপাদনে ব্যাপক হারে নানা ধরনের স্টেরয়েড ব্যবহূত হয়ে আসছে। আমাদের দাবি- গবাদিপশু ও পোলট্রি উৎপাদনে এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং এ ব্যাপারে অনতিবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

drmuniruddin@gmail.com


মন্তব্য