দারুণ অগ্নিবাণে রে

প্রতিবেশ

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৯

দারুণ অগ্নিবাণে রে

  শহিদুল ইসলাম

বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ। সেই সঙ্গে আছে অতি দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি। জাতিসংঘের বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্টে জানা যায়, বর্তমানের ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন মানুষের সংখ্যা আগামী ২০৫০ সালে ৯ দশমিক ৭ বিলিয়নে দাঁড়াতে পারে। ২১০০ সালে তা ১১ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। এতে পৃথিবীর পরিবেশ দ্রুত দূষিত এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হবে। ২২ জুন ভোরের কাগজ জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআরের বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানায়, যুদ্ধ, নিপীড়ন ও সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা গত বছর ৭ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সারা পৃথিবী আগুনে পুড়ছে। ভারতে প্রতিদিন গরমে মানুষ মরছে। মহারাষ্ট্রে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। কাতারের তাপমাত্রা ৬৩ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রে শিশুসহ ৭ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে (সমকাল)। ২৬ জুন সমকাল আরও জানাচ্ছে, স্টিল মিলের ধোঁয়ায় পরিবেশ বিষাক্ত। টঙ্গীতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পোশাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক। বিদেশি ক্রেতাদের অসন্তোষ, বাতিল হচ্ছে রফতানি আদেশ। লাল মসজিদের বস্তির এক লাখ ঘরে ৪-৫ লাখ মানুষ বাস করে। গণতন্ত্র উপলব্ধি সূচক ২০১৮ জানাচ্ছে, 'বিশ্বব্যাপী বিশ্বাস ও আস্থা হারাচ্ছে গণতন্ত্র।' পশ্চিম ইউরোপের মানুষ মনে করে, ব্যাংক ও সোশ্যাল মিডিয়া এর জন্য দায়ী। এ ছাড়া প্লাস্টিক দূষণে জলবায়ু, নদ-নদী, সমুদ্র দূষিত। চারদিকে এমনই সব খারাপ খবর।

দুই. ১৯৭০ সাল থেকে বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা এসব বিষয়ে সতর্ক সংকেত দিয়ে আসছেন। কিন্তু শাসক রাজনীতিবিদ ও অর্থনৈতিক কালাপাহাড়রা তাকে সামান্যই গুরুত্ব দিচ্ছে। অস্ত্র বিপদ মাথার ওপর এসে পড়েছে। তাই ডেনমার্কের মাত্র ১৬ বছরের স্কুলছাত্রী গ্রেটা থানবার্গের একক প্রতিবাদ মুহূর্তে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। আগামী নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তার নাম প্রস্তাবিত হয়েছে। আজ শুধু অসময়ের তাপমাত্রা সম্বন্ধে এটুকু খবর পেয়েছি। তা নিয়ে সামান্য দু'চারটি কথা। মনে রাখতে হবে, আজকের যত সমস্যা, তার জন্য শুধু মানুষই দায়ী। মুম্বাই-এলাহাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫৪ হাজার গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। মহারাষ্ট্রের ৩৬ হেক্টর এলাকাজুড়ে ছিল এই ম্যানগ্রোভ বনভূমি। পুরোটাই ধ্বংস হয়ে যাবে। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে বন্যার জল মুম্বাই শহরে ঢুকবে। সরকার স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষতিপূরণ দেবে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? কারণ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সারাবিশ্বের জলবায়ু। গ্রীষ্ফ্মের শুরুতেই মহারাষ্ট্রে জলের জন্য শুরু হয়েছে হাহাকার। একাধিক শহর শিগগিরই জলশূন্য হয়ে পড়বে। বুলেট ট্রেন মুম্বাই-এলাহাবাদের দূরত্ব কমাবে; জনগণের যাতায়াতের সুবিধা হবে। কিন্তু তার জন্য স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যাবে সারাবিশ্বের জলবায়ুর। জল আনতে রোজ ১৪ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে হয়। মিতা ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন, 'মানুষই যদি জলের অভাবে মারা যায়, তাহলে বুলেট ট্রেন দিয়ে কী হবে?' মানুষ প্রশ্ন তুলছে- এর পরও গাছ কাটা হবে? অল্প্রব্দপ্রদেশের ছোট্ট একটি গ্রাম কালাসমুদ্রাম বর্তমানে একটি জীবন্ত নরক। বেশ কিছুদিন ধরে সেখানকার তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মানুষ আগুনে পুড়ছে। মাটির উপরিভাগের জল শুকিয়ে গেছে। কল দিয়ে জল উঠছে না। খাওয়া ও রান্নাবান্নার জল পর্যন্ত নেই। স্লান করা বা কাপড় ধোয়া সেখানে আজ বিলাসিতা। জলের অভাবে সেখানে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।

শুধু তাই নয়, এই জলকষ্ট সামাজিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে। তামিলনাড়ূতে এবার ৪১ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং গত কয়েক দশকে চেন্নাইয়ের ৩৩ শতাংশ কৃষিজমি হজম করেছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প। এক কলসি জলের জন্য চেন্নাইয়ের নারীরা রাস্তা ধরে মাইলের পর মাইল লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিউনিসিপ্যালিটির জলের গাড়ির জন্য। সেই সঙ্গে জল নিয়ে ব্যবসায়ে নেমেছে এক শ্রেণির নীতি-নৈতিকতাহীন ব্যবসায়ী। তারা জলকে প্রাইভেটাইজেশন করেছে। জলের মূল্য প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করেছে। স্যানিটেশন, স্নান ও কাপড় কাচা সেখানে বিলাসিতা। লেখক এই সিদ্ধান্তে আসেন, শেষ পর্যন্ত এর পেছনে আছে ধনিক শ্রেণির লোভ-লালসা আর রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্প। অর্থনীতিই আজ পরিবেশ দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। কয়েক দিন আগে নিউইয়র্ক টাইমসে কাই স্কুলট্‌জ ও হরিকুমার লিখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশ-ভারতের সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। ২০১৯ সালের বন্য-প্রাণ-ফান্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, যদি সমুদ্রের জল ১১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায় তাহলে ৯৬ শতাংশ বাঘ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। গ্রীষ্ফ্মকালের শুরুতেই গ্রিনল্যান্ডের বরফ পাঁচ গুণ গতিতে গলতে শুরু করেছে, যা এই সময়ে হওয়ার কথা নয়; অতীতেও এমন হয়নি। জুলাইয়ের শেষে ও আগস্ট মাসে কী হবে- এই দুশ্চিন্তায় পরিবেশবিদরা। হিমালয়ের বরফও শুরুতে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে গলতে শুরু করেছে। এর ফলে বাংলাদেশসহ ভারতের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তিন. জলবায়ু ক্রমশ পৃথিবীবিদ্বেষী হয়ে উঠছে। সেখানে ধনীরা নিজেদের বাঁচানো নিশ্চিত করবে, কিন্তু তার সম্পূর্ণ ভার বহন করবে দরিদ্র শ্রেণি। গত ২৫ জুন জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এ মন্তব্য করে, 'অতি দরিদ্র' বিষয়ক কর্মকর্তা ফিলিপ আলস্টোন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বড় ভূমিকা পালন করে। তার ওপর ভরসা রাখা যায় না। কারণ অর্থনীতি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে কিছু করবে না। তিনি বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈষম্যে ধনিক শ্রেণি উচ্চ তাপমাত্রা, ক্ষুধা ও বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু সারা পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হবে।' এ বক্তব্যের সমর্থনে তিনি ২০১২ সালের নিউইয়র্কের হারিকেন স্যান্ডির উদাহরণ দেন। সে সময় গরিবরা খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। কিন্তু 'গোল্ডম্যান সাম্প'-এর প্রধান কার্যালয় রক্ষার্থে হাজার হাজার বালুর বস্তা ও নিজস্ব জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছিল। রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যদি প্রাইভেট সেক্টরের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, তখন মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে।

রিপোর্টে সরকারগুলোর সমালোচনা করা হয়েছে এই বলে, তারা আন্তর্জাতিক সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে প্রতিনিধি প্রেরণ করা ছাড়া আর কিছু করে না। তারা সেখানে গিয়ে গতানুগতিক 'ভালো ভালো' কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে তাদের কর্তব্য শেষ করেন। অথচ বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা ১৯৭০ সাল থেকে বিপদ সংকেত দিয়ে আসছেন- 'গত ৩০ বছরে এসব সেমিনারে সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে। এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, টরন্টো থেকে নরডিক থেকে রিও থেকে কিয়োটো থেকে প্যারিস- সবখানে প্রায় একই ভাষায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারগুলো শূন্য টিনের মতো সেগুলো রাস্তায় ফেলে দিতে দ্বিধা করে না।' আলস্টোন বলছেন, প্রতিটি বৈজ্ঞানিক হুঁশিয়ারিকে টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। তবে কিছু ধনাত্মক কাজও হচ্ছে। পুনরুদ্ধারযোগ্য জ্বালানির মূল্য হ্রাস পাচ্ছে, কয়লার জন্য প্রতিযোগিতা কমছে, ৪৯টি দেশে কার্বন নিঃসরণ কমছে; সাত হাজার শহর, ২৪৫টি এলাকা এবং ছয় হাজার কোম্পানি পরিবেশ রক্ষার্থে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। কিন্তু চীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ তৈরি যন্ত্রপাতি রফতানি বন্ধ করেনি। ব্রাজিলের 'বোল সোনারো' প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। এতে বিপুল পরিমাণ রেইনফরেস্ট নষ্ট হবে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি কার্বনডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ। অথচ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্ব সংস্থার সিদ্ধান্তগুলো মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

চার. পিটিআই গত ২৭ জুন জানিয়েছে, তামিলনাড়ূতে সোনার চেয়ে জলের মূল্য বেশি। আসলে এমন অবস্থায় না পড়লে বাস্তবতা বোঝা যায় না। আমরা বুঝতে পারি না চেন্নাই ও তামিলনাড়ূতে এক কলসি জলের মূল্য এক গ্রাম সোনার মূল্য থেকে বেশি। ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ নামি-দামি জিনিসপত্রের বিনিময়ে এক কেজি চালের জন্য হন্যে হয়ে উঠেছিল। আজ সেখানে জলের জন্য মানুষ পাগল হয়ে উঠেছে। সম্পদের পেছনে মানুষ আজ হন্যে হয়ে ছুটছে। কিন্তু আসলেই সোনা-দানার যে কোনো মূল্য নেই- সময় হলে মানুষ বুঝবে। গুনার মিরডালের তত্ত্বই আজ প্রমাণিত হয়ে চলেছে। তিনি বলেছিলেন, 'উন্নয়নের অর্থ অনুন্নয়নের উন্নয়ন।'

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

1940islam@gmail.com


মন্তব্য