মামলাজট কমাতে আরও বিচারক চাই

সাক্ষাৎকার

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯

মামলাজট কমাতে আরও বিচারক চাই

  এএম আমিনউদ্দিন

সমকাল :সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম কাজ কী ছিল?

আমিনউদ্দিন :সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত আইনজীবী হিসেবে আমার পরিচয় হচ্ছে আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক। তাই আইনজীবীদের সমস্যা বুঝি। সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে যখন কাজ শুরু করলাম, প্রথমেই বার ভবনের নষ্ট হয়ে থাকা প্রত্যেক ওয়াশরুম দুর্গন্ধমুক্ত করতে পূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বারের বিভিন্ন সমস্যা অবহিত করি। তিনি যেহেতু বারের সাবেক সম্পাদক, সেহেতু তিনি আমাদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শোনেন এবং বার ভবনে এসে দেখেন। সমস্যাগুলো অনুধাবন করে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অচিরেই আমরা এর ফলাফল পাব। এ জন্য মন্ত্রীকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই।

আর সুপ্রিম কোর্ট বারের মূল সমস্যা হচ্ছে, আইনজীবীদের বসার স্থান নেই। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী ও পূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ হয়েছে। জায়গার সমস্যা রয়েছে, জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়া গেলে আইনজীবীদের বসার সুব্যবস্থা হয়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট বারে বর্তমানে আট হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছেন। আরও ৫-৭টা হলরুম দরকার। নারীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি হলরুম দরকার। আশা করি, এসব বিষয়ে আমরা ফলপ্রসূ হবো। এ ছাড়া আইনজীবীদের পেশা পরিচালনার জন্য বেশ কিছু সমস্যা ছিল। যেমন গত বছরের শেষ দিনে হাইকোর্টের বেঞ্চে নতুন মামলা মোশনের ব্যবস্থা ছিল না। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একাধিকবার দেখা করে বলেছি, তিনি আমাদের কথা রেখেছেন। নিয়মিত বেঞ্চে মোশন দিয়েছেন। এতে করে অনেক নতুন মামলা শুনানি হয়েছে। তাই অবকাশের সময় আদালতে চাপ ছিল না। আইনজীবীরা তাদের জমানো মামলা কমাতে পেরেছেন।

সমকাল :উচ্চ আদালতে মামলাজট নিরসনে সরকার ও প্রধান বিচারপতির কী পদক্ষেপ

নেওয়া উচিত বলে মনে করেন। এ ব্যাপারে আপনার কোনো সুপারিশ আছে?

আমিনউদ্দিন :একজন আইনজীবী হিসেবে বলব, উচ্চ আদালতে মামলাজট কমাতে হলে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগেই দ্রুততার সঙ্গে অধিক সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। তা ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের মামলাগুলো ক্যাটারওয়াইজ করতে হবে। ধরুন, একটি বেঞ্চে একই ধরনের ৪০টি মামলা আছে। আপনি যদি একটির সঙ্গে ৪০টি মামলা নিয়ে আসেন, তাহলে একসঙ্গে সব মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু আদালতে ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, আমার মনে হয় মামলা ক্যাটারওয়াইজ করা হলে আইনজীবীদের জন্য সহজ হবে এবং মামলাজট ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। এ ছাড়া স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে হাইকোর্টে একই ধরনের অনেক মামলা রয়েছে। সব মামলার একই পয়েন্ট। যদি একটা মামলার রায় বা আদেশ দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা হয়, তাহলে দুইশ' থেকে পাঁচশ' মামলা শেষ হয়ে যাবে। এভাবে মামলা ক্যাটারওয়াইজ করা হলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। পাশাপাশি বিচারকের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। আপিল বিভাগে এখন সিপির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। সুতরাং সেখানে বিচারক নিয়োগ দিতে হবে।

সমকাল : দীর্ঘদিনেও উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে নীতিমালা হয়নি, এটা করা কতটুকু জরুরি?

আমিনউদ্দিন : উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। সুপ্রিম কোর্টে কারা বিচারক হবেন, তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা কী হবে, সেটা জনগণের জানার অধিকার আছে। বিচারকদের দশ বছরের যোগ্যতা বলতে কী বোঝানো হয়েছে, এটা কী প্র্যাকটিস নাকি এনরোলমেন্ট (নিয়োগ)। এ বিষয়গুলোর সমাধান একটা নীতিমালার মাধ্যমে হওয়া উচিত। সংবিধানে মূল কথাগুলো লেখা থাকে এবং নীতিমালার মাধ্যমে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো থাকতে হবে।

সমকাল :উচ্চ আদালত থেকে প্রতারক উচ্ছেদ অভিযান চলছে, এরই মধ্যে কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে আর কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন?

আমিনউদ্দিন :দায়িত্ব গ্রহণের পর বারের কিছু তরুণ আইনজীবী প্রতারকদের উৎপাতের বিষয়টি আমাকে জানায়। বারের কার্যনির্বাহী কমিটির বাইরেও কিছু তরুণ সদস্যকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের প্রচেষ্টায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করে থানায় পাঠানো হয়েছে। ফলে প্রতারক অনেক কমে গেছে। এ অভিযান সারা বছর অব্যাহত থাকবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের কারণে আইনজীবীরা জেলে যাচ্ছেন। আইনজীবীদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, প্রতারকদের কাছ থেকে আপনারা মামলা নেবেন না। মক্কেলের কাছ থেকে সরাসরি মামলা নেন। এই প্রতারকরা শুধু বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা নষ্ট করছে না, জনগণকেও ধোঁকা দিচ্ছে।

সমকাল :উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সেকশনে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়, এগুলো বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

আমিনউদ্দিন :উচ্চ আদালতে বিভিন্ন সেকশনে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ এলে প্রধান বিচারপতি ও রেজিস্ট্রার জেনারেলের নজরে আনা হবে। দুর্নীতি বন্ধে কতগুলো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন- যেসব মামলা আদালতে দাখিল করা হচ্ছে, সেগুলো যদি সিরিয়াল মোতাবেক শুনানি হয়, তাহলেই দুর্নীতি কমে যাবে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে মামলা শুনানি আদেশ দেওয়ার পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। পয়সা দিয়ে পেছনের মামলা ওপরে না তোলা হলেই দুর্নীতি কমে যাবে। এ ছাড়া রায় বা আদেশ তৈরি করা, আদেশ টাইপ করা যদি সিরিয়াল মোতাবেক হয়, তাহলেও দুর্নীতি কমে যাবে।

সমকাল :সুপ্রিম কোর্টে কজলিস্ট ছাপা বন্ধ রয়েছে, এ ছাড়া আইনজীবীদের উপস্থিতিতে হলফনামা দেওয়ার সময় জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে, এ বিষয়ে আপনাদের পদক্ষেপ কী।

আমিনউদ্দিন :কজলিস্ট ছাপা বন্ধ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, যেভাবে কজলিস্টের ফর্মা ছাপানো হয়, তার অভাব পড়ে গেছে। এরই মধ্যে সেটা কাভারেজ হয়ে গেছে। এখন আবার ছাপা শুরু হবে। আমি ও সম্পাদক দু'জনই প্রধান বিচারপতিকে বলেছি, একটা কোর্টে ৮শ'-৯শ' মোশন মামলা আছে; কিন্তু শুনানি হচ্ছে না। এই কজলিস্ট কিছু ছোট করতে হবে। হ্যান্ডলিফ করতে হবে। এফিডেভিট নিয়ে একটা সমস্যা হয়েছিল, আইনজীবীরা এফিডেভিটের জন্য সেকশনে যাবেন, এতে করে আইনজীবীরা অনেকটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলেন, আমরা কমিটির সবাইকে নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে যাই, তিনি বিষয়টি সমাধান করে দিয়েছেন। এখন আর আইনজীবীদের সেকশনে যেতে হবে না। তাদের ক্লার্করা যাবেন এবং তাদের পরিচয়পত্র থাকতে হবে।

সমকাল :সভাপতি হওয়ার পর বার ও বেঞ্চের মধ্যে সম্পর্ক কেমন চলছে।

আমিনউদ্দিন :বেঞ্চের সঙ্গে বারের বর্তমান সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। আইনজীবীদের কোনো সমস্যা নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে যাওয়ার পর, তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কথাগুলো শোনেন এবং সমস্যার সমাধান করে দেন। বেঞ্চের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই আদালত এবং আইন অঙ্গনের উন্নয়নের জন্য আইনজীবীদের ভূমিকা রাখতে হবে। বিচারালয় যেমন আইনজীবীদের নিয়ে কাজ করবেন এবং আইনজীবীরাও বেঞ্চকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন। সম্মিলিতভাবে বার ও বেঞ্চকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সমকাল :সুপ্রিম কোর্ট বারকে নিয়ে আপনার পরিকল্পনা জানতে চাই।

আমিনউদ্দিন :সুপ্রিম কোর্ট বারে সুষ্ঠু একটি পেশাদারিত্বের পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই। বার ভবনে ঢুকলে মানুষ যেন মনে করে, ভালো একটা কাজের জায়গায় এলাম। আইনজীবীদের কল্যাণে ওয়ার্কশপ (প্রশিক্ষণ) করতে চাই। এরই মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন বিচারকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তারা সম্মতি দিয়েছেন, আসবেন। সেখানে সিনিয়র আইনজীবীরাও থাকবেন। তরুণ আইনজীবী যারা রয়েছেন তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মামলার পিটিশন কীভাবে লিখতে হয়, গ্রাউন্ড কীভাবে ফরমুলেট করতে হয়- এগুলো শেখাতে হবে। তরুণ আইনজীবীদের মামলা পরিচালনার জন্য একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এতে করে বিচার বিভাগ আরও সমৃদ্ধ হবে।

সমকাল :সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ভিন্ন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের, সে ক্ষেত্রে সভাপতি-সম্পাদকের মধ্যে কাজের কোনো সমস্যা হচ্ছে কি-না।

আমিনউদ্দিন :আমাদের দু'জনেরই কাজ হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন করা, আইনজীবীদের কল্যাণে কাজ করা। এটি মতাদর্শের কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। যে কোনো বিষয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। কাজের ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।

সমকাল :আপনাকে ধন্যবাদ।

আমিনউদ্দিন :সমকালের পাঠকদেরও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ :ওয়াকিল আহমেদ হিরন


মন্তব্য