সারা বাংলাদেশই ছিল এই 'মৃত্তিকাপুত্র'র শ্রেণিকক্ষ

শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৯

সারা বাংলাদেশই ছিল এই 'মৃত্তিকাপুত্র'র শ্রেণিকক্ষ

  ড. আতিউর রহমান

পরিণত বয়সেই মমতাজ স্যার চলে গেলেন। অনেক দিন ধরেই অসুস্থ। কয়েক মাস আগেও হাসপাতালে গিয়েছিলেন। অনেকটা লড়াই করেই যমের হাত থেকে ফিরে এসেছিলেন। ভেবেছিলাম আরও কিছুটা সময় থাকবেন তিনি তাঁর প্রিয় বাংলাদেশে। তিন দিন আগে তাঁর ভাগ্নে প্রিন্স জানাল, স্যারের শারীরিক অবস্থার দারুণ অবনতি ঘটেছে। তবে 'ভেন্টিলেশনে'র ব্যবস্থা তিনি গ্রহণ করবেন না, সে কথাটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই মনে মনে আমরা প্রস্তুত ছিলাম দুঃসংবাদটার জন্য। আর সেটা এলো ২ জুন বিকেলে।

হঠাৎ মনে হলো, একটি প্রজন্মের শেষ কয়েকজন প্রতিনিধির আরেকজন পুরোধা চলে গেলেন। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও নাটকের অন্যতম প্রধান পুরুষ এবং সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা নিঃসংকোচে তুলে ধরার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মমতাজ স্যার চলে গেলেন আমাদের নান্দনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রকে শূন্য করে দিয়ে। তিনি শুধু গুটি কয়েক শিক্ষালয়ের শিক্ষক ছিলেন না। তাঁর শ্রেণিকক্ষ ছিল সম্পূর্ণ বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ।

আমি তাঁর ক্লাস করিনি। আমার মতো এমন অসংখ্য আছেন, যারা তাঁকে শিক্ষক হিসেবেই মানেন। জানেন। ভক্তিভরে শ্রদ্ধা করেন। তিনি নিজে সাহসী ছিলেন। সেই সাহস তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন সবার মাঝে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন। আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির দুর্যোগে দঃসময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অনন্য অভিভাবক। সাহসের প্রতীক। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি রেখে গেছেন তাঁর লেখায়, শিক্ষকতায়, অভিনয়ে এবং সংস্কৃতি অঙ্গনে। শুধু লিখেই শেষ করেননি তিনি তাঁর দায়িত্ব। অভিনয় করে, বক্তৃতা করে তিনি আমাদের সচেতন করে গড়ে তোলার বিরাট দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি 'অধ্যাপক' পরিচয়টিকেই স্বজ্ঞানে বেছে নিয়েছিলেন। এতে করে, 'নাট্যকর্মী, মঞ্চ-টিভির জনপ্রিয় নাট্যরচয়িতা ও অভিনেতা, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক কোনো পরিচয়ই ম্লান হয় না।' (মাহবুবুল হক, 'মৃত্তিকাপুত্র মমতাজউদদীন আহমদ', 'অগ্রবীজ', জুলাই ২০১৮, পৃ. ২৭৮)। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে বেড়ে ওঠা এক অকুতোভয় ধারাভাষ্যকার। কখনও কখনও আবার শব্দসৈনিক। ভাষা আন্দোলনে 'বাতাসে প্রতিবাদের গন্ধ পাওয়া তরুণ তিনি, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করার জন্য ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন তিনি, যা তাঁরই ছাত্র আবুল কাশেম সন্দ্বীপ পড়েছিলেন।' (মাহবুবুল হক, ঐ পৃ. ২৭৮)। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন। সর্বত্রই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। বাংলা ও বাঙালির পক্ষের এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন।

সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের প্রত্যক্ষ শিকার মমতাজ স্যার দেশভাগের দুঃসহ যন্ত্রণা বুকে নিয়ে সীমান্তের এপারে এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেন। সেই যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখায়। শুরুতে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের আকর্ষণে স্বভূমি ছাড়লেও অন্য দশজন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলমান তরুণের মতোই খুব শিগগিরই সাম্প্রদায়িকতার ধূম্রজাল ভেদ করে সম্পূর্ণ বাঙালি হওয়ার নয়া চেতনায় নিজেকে রূপান্তরিত করে ফেলেন। তাঁর নিজের কথায় 'এই তো আমি' আত্মজীবনীতে তাই লিখতে পেরেছেন এই রূপান্তরের কাহিনী। তিনি লিখেছেন, 'সাম্প্রদায়িকতার জন্য আমি যে বিদ্বেষ ও ক্রোধ বহন করে চলছিলাম, তা এক এক করে দূর হয়ে গেল। আমি বাংলার, বাঙালির চেতনার। সর্বোপরি সবার ওপরে মানুষ সত্য এমন দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে গেলাম।' আর এই আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটেই মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে একজন মমতাজউদদীন আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় 'মমতাজ স্যার' হয়ে গেলেন।

মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক, শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক এবং জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যে কর্মমুখর জীবনযাপন করেছেন তাতে বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধ বরাবরই তাঁর মানসতটের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। আর সে কারণেই এই 'মৃত্তিকাপুত্র' দাবি করতে পারেন 'মৃত্তিকাই তো আমার শেষ পরিচয়'।

স্যারের উচ্চারণের শিহরণ আমারও প্রাণে বাজে। আমিও মাটির খুব কাছাকাছি চলে যাওয়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাই। তিনি ব্যঙ্গাত্মক 'কলাম' লিখতেন গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। সে কী ভাষা। সে কী রসবোধ। আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন এই 'মৃত্তিকাপুত্র' আজীবন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে বুকে ধারণ করে চলেছেন। আর তাই তিনি তরুণদের কাছে হতে পেরেছিলেন এক অনাবিল অনুপ্রেরণার উৎস।

আমার সঙ্গে স্যারের সংযোগ এই আদর্শের জগতেই। যখনই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো সমাবেশে, জনতার মঞ্চে কিংবা বাংলা একাডেমিতে দেখা হয়েছে, স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমার লেখালেখি ও বলা তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করতেন। তাই পছন্দের কোনো লেখা পড়লেই ফোন করতেন। আমার স্ত্রী সাহানাও তাঁর খুব পছন্দের। তার সঙ্গেও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির সংস্কৃতি নিয়েই স্যারের কথা হতো বেশি। আমার লেখা 'শেখ মুজিব :বাংলাদেশের আরেক নাম' বইটির মোড়ক উন্মোচনে স্যার এসেছিলেন। সেদিন তিনি প্রাণভরে বঙ্গবন্ধুকে ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিষয়ে কথা বলেছিলেন। স্যারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সুযোগ হয়েছিল নিউইয়র্কে। তখন তিনি আমাদের জাতিসংঘের প্রতিনিধি অফিসে সাংস্কৃতিক কূটনীতি করছেন। বিদেশ বিভুঁইয়ে আমাকে পেয়ে কী যে তাঁর আনন্দ! স্যারের স্বাস্থ্যটা তখনও ভালো যাচ্ছিল না। তবুও দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম আমরা। অবধারিতভাবেই আমাদের আলাপের বিষয় ছিল স্বদেশ, বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুকন্যা এবং আমাদের পরিবার।

স্যার দেশে ফেরার পর মাঝেমধ্যে কথা হলেও দেখা করার সময় করে উঠতে পারিনি। এর মধ্যেই তাঁর ভাগ্নে প্রিন্সের টেলিফোন পেলাম। স্যার অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি। আমাকে খবরটা দিতে বলেছেন। চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। তবে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছিলেন স্যার। আবার প্রিন্সের টেলিফোন। তাঁর ৮৫তম জন্মদিনে স্যার চাইছেন যে, আমি যেন উপস্থিত থাকি। আর তাঁর ওপর একটি লেখারও অনুরোধ করলও প্রিন্স। আমি সাগ্রহে রাজি হয়ে গেলাম। স্যারের জন্য এটুকু করতে পেরে নিজেকে খুব ভাগ্যবানই মনে হয়েছিল। স্যার সুস্থ থাকুন এবং দীর্ঘজীবী হোন সেই প্রার্থনা সর্বদাই করেছি। কিন্তু আমাদের সবার প্রার্থনা সত্ত্বেও তিনি না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। আমাদের উদারনৈতিক অস্তিত্বের অন্যতম স্তম্ভ মমতাজ স্যার কতভাবেই না আমাদের ঋণী করে রেখে গেলেন। জানি না কী করে এই জাতি তাঁর সেই ঋণ শোধ করবে।

স্যারের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান এ জাতি কোনো দিন ভুলতে পারবে না। শিক্ষকতা বাদেও সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর যে বিচরণ, তা এক কথায় অসাধারণ। 'এই তো জীবন' ছাড়াও তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন 'রক্ত যখন দিয়েছি'। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তার নাট্য রচনার মধ্যে রয়েছে- 'এবারের সংগ্রাম', 'স্বাধীনতার সংগ্রাম', 'স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা', 'বর্ণচোরা, কী চাহ শঙ্খচিল', 'বিবাহ', 'এখন মধু মাস', 'এই সেই কণ্ঠস্বর'। তাছাড়া বিশেষ আরও কয়েকটি নাটকের মধ্যে রয়েছে- 'দুই বোন', 'রাক্ষুসী', 'জমীদার দর্পণ', 'ক্ষতবিক্ষত', 'ওহে তঞ্চক', 'খামকাখামকা', 'বাদশাহী বণ্টননামা', 'অর্ণবের মাতাপিতা', 'লাবণি আর তার ছেলে' এবং 'সাতঘাটের কানাকড়ি'। এর অনেকগুলোতে স্যার দুর্দান্ত অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয় জয় করেছিলেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য অসংখ্য পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন মমতাজ স্যার। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- 'বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার', 'দেওয়ান গোলাম মর্তুজা সাহিত্য পুরস্কার', 'জেবুন্নেসা মাহবুবউল্লাহ পুরস্কার', 'শিশু একাডেমি অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার', 'চট্টগ্রাম ত্রিতরঙ্গ সাহিত্য পুরস্কার', 'ফরিদপুর আলাউল সাহিত্য পুরস্কার', 'কলকাতা সমলয় সম্মাননা', 'মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা', 'শেলটেক সম্মাননা', 'বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পুরস্কার', 'বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক আজীবন নাট্যকর্মের জন্য সম্মাননা', প্রয়াত আনিসুল হকের উদ্যোগে ৮০তম জন্মদিনে নাগরিক সংবর্ধনা ও সম্মাননা এবং রাষ্ট্রীয় 'একুশে পদক'।

মমতাজ স্যার যা বলতেন স্পষ্ট করেই বলতেন। তাঁর ভাগ্নে প্রিন্সের কাছ থেকেই জানলাম যে, তার আজীবনের সাধনা ছিল বাংলাদেশ চিরজীবী থাকবে আর অবিনশ্বর গৌরবে ক্রমাগত উজ্জ্বল হবেন বঙ্গবন্ধু। আরেকটি আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর- বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও ত্যাগ নিয়ে একটি লোকনাট্য রচনা করা, যা দেশের সর্বত্র অভিনীত হবে এবং জনগণকে জাগিয়ে রাখবে। প্রিন্স তাঁর দুটি অন্তিম ইচ্ছার কথাও আমাকে জানিয়েছে। মৃত্যুর পরে তিনি ঢাকা নয়, গ্রামেই সমাহিত হতে চেয়েছিলেন। আর তাঁর জানাজায় জামায়তের কেউ যেন অংশগ্রহণ না করতে পারে। স্যারের এ দুটি আকাঙ্ক্ষাই পূরণ হয়েছে দেখে আমরা সন্তুষ্ট। হাসপাতালে বসেই স্যার প্রিন্সকে বলে গেছেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর সর্বশেষ বইটির যেন পর্যালোচনা আমি লিখি। তাঁর এই প্রত্যাশা যে, আমার জন্য কত বড় আশীর্বাদ তা পাঠককে বোঝাতে পারব না। চিরদিন বেঁচে থাকবেন মমতাজ স্যার আমাদের ভরসার বাতিঘর হিসেবে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমার একান্ত আহ্বান থাকবে এই বলে যে, স্যারের বইগুলো পড়ো, তাঁর নাটক দেখো এবং তাঁর মতো আপসহীন বাঙালি হও। স্যারের বিদেহী আত্মার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
dratiur@gmail.com


মন্তব্য