আমাদের কয়েক লাখ 'বলাই' দরকার

পরিবেশ-প্রতিবেশ

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯

আমাদের কয়েক লাখ 'বলাই' দরকার

  জয়া ফারহানা

পরিবেশ মানে কি কেবল ভূগোল? নিশ্চয়ই নয়। প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণের সম্পর্কই পরিবেশ। তবে এই প্রাণ মানে কেবল শ্বেতাঙ্গ দুনিয়ার সাদা রঙের ধনী মানুষের প্রাণ নয়। এই প্রাণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রতিটি শ্রেণির পশুপাখি, বৃক্ষ, শস্য, উদ্ভিদ, তৃণগুল্ম, কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়, শৈবাল, শ্যাওলাসহ সমস্ত জীব এবং উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের প্রাণও। লাখো কোটি বছর ধরে প্রকৃতি স্বপ্রণোদিতভাবে তার সমস্ত প্রাণসম্পদ রক্ষা করে আসছে। রক্ষার সব উপায় কৌশলও প্রকৃতির হাতেই ছিল। কিন্তু যেদিন থেকে শিল্প বিপ্লব শুরু হলো; শুরু হলো নির্বিচারে গাছ কাটা, বন ধ্বংস, নদী হত্যা, পাহাড় কাটা; সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে পরিবেশের এই ছন্নছাড়া লক্ষ্মীছাড়া পরিস্থিতি। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফরেস্ট্রি দিয়ে প্রাকৃতিক বনের অভাব পূরণ হয়? রাস্তার দু'পাশে কিছু মেহগনি গাছ লাগালেই বৃক্ষবৈচিত্র্যের অভাব পূরণ হয়? ফসলি জমিকে হত্যা করে বহুজাতিক কোম্পানির বিপণনজাত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফুড স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়? অতিমাত্রায় জ্বালানিনির্ভর জীবনযাপন করব, মাত্রাতিরিক্ত কার্বন পোড়াব; কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় আলট্রা ভায়োলেটের উপজাত সমস্যা ক্যান্সার মানতে পারব না; তা তো হয় না। নদীতে বাঁধ দেওয়া বন্ধ করতে পারব না; কিন্তু পানিনির্ভর জীববৈচিত্র্য বা প্রাণশৃঙ্খলা অটুট থাকবে; তাও হয় না। নদীর মৃত্যু মানে বাংলাদেশের মৃত্যু। শুধু নদী নয়; বৃক্ষ, বাতাস, বন- সবকিছুর সঙ্গেই আমাদের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। যেভাবে ফসলি জমিতে সড়ক নির্মাণ হচ্ছে, নির্মাণ হচ্ছে অসংখ্য ইটভাটা, করাতকল; তা দেখে মনে হয় না পরিবেশকে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণের সম্পর্ক ভাবছি। পরিবেশের ভারসাম্যের কথা মাথায় না রেখে যত ভালো পরিকল্পনাই নেওয়া হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা খরচার খাতাতেই গণ্য হবে। ইতিমধ্যে কি তা হয়নি?

পরিবেশের অনিবার্য অনুষঙ্গ গাছ। গ্রীষ্ফ্মকালে ছায়া দেয়। পত্রমোচী গাছগুলো পাতা ঝরিয়ে শীতে দরিদ্রজনকে রোদও উপহার দেয়। পথের দু'পাশে পর্যাপ্ত গাছের প্রতুল ছায়া না থাকলে পথিকদের জন্য রাজপথ যে কী ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, তা নিশ্চয় আমরা টের পাচ্ছি এখন। বৈশাখ মাসের গরমও কি এত অসহ্য ছিল? বৈশাখে ভোরের বাতাস চিরদিনই মুগ্ধকর। বিশেষ করে আগের বিকেলে কালবৈশাখী হয়ে গেলে সকালের বাতাস থাকত শান্ত, শীতল। কেননা, ঝড়ের পর বাতাসের বেগ কমে গেলেই বর্ষণে নেমে আসত নিবিড়তা। একটানা নিবিড় বর্ষণের পর ভোরের বাতাস প্রাণজুড়ানো হওয়ারই কথা। গাছপালা, লতাপাতা, মঞ্জরি এবং ফুলের গন্ধে ভর্তি থাকার কথা। আর বৈশাখে প্রায়ই কালবৈশাখী হবে- সেটাই গ্রীষ্ফ্ম ঋতুর সাধারণ প্রবণতা। এখন সে নিয়ম বদলে যাওয়ায় বৈশাখে কালবৈশাখী নেই। দেখা যাবে, কালবৈশাখী হচ্ছে অসময়ে। জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন এভাবে আমাদের সব ঋতুর মাধুর্য নষ্ট করে দিয়েছে। নেই কালবৈশাখীর পর সেই ব্যাঙ-ডাকানিয়া মুষলধারার বৃষ্টি। এখন বৈশাখের ভোরের বাতাস পর্যন্ত কার্বন, মিথেন ও সিএফসি গ্যাসে ভর্তি। আর মধ্যাহ্নে তো কথাই নেই; সিসার বিষে পূর্ণ। 'যাত্রার আরম্ভকালে স্নানচিক্কণ বনশ্রী রৌদ্র উজ্জ্বল হাস্যময় ছিল, অনতিবিলম্বে মেঘ করিয়া বৃষ্টি আরম্ভ হইল।' গল্পগুচ্ছে গ্রীষ্ফ্মকালে এমনতর হঠাৎ বৃষ্টির যে বর্ণনা পাই, তা এখন অবিশ্বাস্য মনে হয়। প্রতিদিন ঈশান কোণে সামান্য মেঘ করে কিন্তু বৃষ্টি আর হয় না। মেঘ করলেই মুষলধারার বৃষ্টি পড়ে- এ কেবল 'গল্পগুচ্ছ'র গল্পেই সম্ভব মনে হয় এখন। কীভাবে হবে? বৃষ্টি হওয়ার কোনো উপায় আমরা রেখেছি? প্রতিদিন কার্বনের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশ পানির দেশ হওয়া সত্ত্বেও অগণিত নদী শুকিয়ে বালুচর, মরুভূমি। নদীগুলোতে ক্রমাগত তলানি পড়ছে। প্রাকৃতিক প্রবাহ রুদ্ধ করে দিয়েছি। নদীর প্রাণ রক্ষার কোনো ব্যবস্থাই রাখিনি। সমুদ্রে টন টন লোহা ও জাহাজ ভাঙার বর্জ্য ফেলে জলীয় উদ্ভিদ শেষ করে দিয়েছি। চিংড়ি চাষ করে সুন্দরবনকে কেটে সাফ করে দিয়েছি। প্রাণবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার কোনো উপায় রাখিনি। কোথায় বৈশাখের নিবিড় বর্ষণ, ঝমঝম বৃষ্টি? সামান্য ঝিরঝিরে বৃষ্টির দেখাও মিলল না এ পর্যন্ত। ৪১ ডিগ্রি তাপমাত্রা থেকে আমাদের বাঁচাবে কে?

পরিবেশের আক্ষরিক অনুবাদ করতে শিখেছি আমরা; কিন্তু আত্মস্থ করতে পারিনি। কয়েক দশক আগেও দেশের প্রধান নগরগুলোতে কালবৈশাখী ঝড়ের হাওয়ায় উড়ে আসত বাঁশপাতা, কাঁঠালপাতা, নানা গাছের লতাপাতা, গাছের ডাল-কুটা, বাঁশের খোলা, খড়। অজস্র না হলেও কিশোর মনের তৃপ্তির জন্য প্রতিবেশীর আমগাছের তলায় কিছু আম কি কুড়োনোর জন্য থাকেনি? থেকেছে নিশ্চয়। এখন ঝড়ের বাতাসে উড়ে আসে কিছু বিস্কিট, চিপসের প্যাকেট, কোমল পানীয়ের ক্যান, পলিথিন আর পলিথিন। কালবৈশাখীর শুরুটাও ছিল দেখার মতো। বিকেলের দিকে চারদিক অন্ধকার করে মেঘ, তারপর বড় বড় গাছ ঝড়ো বাতাসের বেগে এপাশ থেকে ওপাশে হেলে পড়া, মটমট করে ডাল ভাঙা, এমনকি ঝড়ের আগে মগডালের একটি পাতা ঝরার শব্দও শোনা গেছে। এখন এই শব্দদূষণের নগরে পাতা ঝরার শব্দ শোনার আশা এক ইউটোপিয়া। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল মন্থন করা যে মহাপ্রলয় ঝড়, ঝড়ের উচ্ছ্বসিত শব্দের রাগিণী এই নগরে তাও শোনার উপায় নেই। এখানে ঝড় মানে গোড়ার আলগা মাটি দুর্বল হয়ে অযত্ন-অবহেলায় থাকা বৃক্ষের পতন, মানুষের মৃত্যু। নগর কর্তৃপক্ষ একটু সজাগ থাকলে গাছগুলো বেঁচে যেত; মানুষও।

দুই

পরিবেশ মানে প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণের সম্পর্ক; ঠিক আছে। কিন্তু পরিবেশের সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের। গাছের একটি পোকাকে ধ্বংস করতে গিয়ে আমরা সব উপকারী পোকাকে মেরে ফেলে মাটির শক্তি ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছি। মাটির প্রাণ ধ্বংস করে দিয়েছি। বিশ্বজুড়ে যারা পেস্টিসাইডের ব্যবসা করছে, সেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের মাটির সর্বনাশ করেছে। পরিবেশ রাজনীতির জটিল চক্রে পড়ে পরিবেশ আমাদের হাত থেকে ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। নৃসিংহ মুরারির কবিতার কথা মনে পড়ে।

'আপনার বাড়িতে ফ্রিজ আছে,

বিদেশী রঙিন টিভি আছে

এবং এন্তার ভিডিও ক্যাসেট আছে।

আপনার অনেক লকার আছে, ভল্ট আছে

আপনার এয়ার কন্ডিশনড গাড়ি আছে-

উলেন কার্পেট এবং জাজিম আছে

আপনার পাঁচটা বিলিতি কুকুর আছে

বাথরুমে ইলেক্ট্রিক শাওয়ার আছে,

আচ্ছা বেশতো!

কিন্তু আপনি কোথায় আছেন, আপনার বাড়িতে?'

আমরা কি নির্লোভ বলাই হতে পেরেছি? এই কবিতার মতোই সবকিছু পেতে গিয়ে আমরা কি পরিবেশের সঙ্গে আমাদের নৈতিক বন্ধনটুকু ছিন্ন করে ফেলছি না?

কলাম লেখক


মন্তব্য