বাংলাদেশ কেন চুপ, হেতু কী

ভারতের নির্বাচন

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯

বাংলাদেশ কেন চুপ, হেতু কী

  দাউদ হায়দার

কেবল বুদ্ধিজীবী, সমাজবিশ্নেষক, রাজনীতি-বিষয়ক পণ্ডিত কিংবা ঝানু সাংবাদিককুলই নন, সাধারণ মানুষও, বয়স যাদের সত্তর-আশি পেরিয়েছে, বিগত কয়েক দশকে লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, বিভিন্ন দলকে, বলছেন, 'এমন বিশ্রী নির্বাচনী প্রচারণা কখনও দেখিনি, শুনিনি। এবারের নির্বাচনে যা হচ্ছে, কল্পনারও অতীত। একদল আরেক দলকে ভোটযুদ্ধে আক্রমণ করবে সভায়, বক্তৃতায়, স্বাভাবিক। অতীতে আক্রমণ করা হয়েছে যুক্তি দিয়ে, নানা দোষগুণ দেখিয়ে। কখনও মারমুখী হতে পারে কথার মারপ্যাঁচে, কখনও-বা ফিরিস্তিও দিতে পারে, দেয়, রাজনীতিকের (নির্বাচনে যারা লড়াই করছেন, প্রার্থী।) দুর্নীতি বা অনাচার নিয়ে। ভোটারের কাছে প্রার্থীর দুর্বলতা, অপদার্থতার মুখোশ খুলে দেওয়াই যোগ্য নেতার কাজ। কিন্তু ভারতের এবারের নির্বাচনে (লোকসভা) কোনো ভদ্রতা নেই, শালীনতা নেই, শ্রদ্ধাবোধ নেই। একে-অপরের বিরুদ্ধে অশ্নীল কথা, অশ্নীল আক্রমণ, অশ্নীল অঙ্গভঙ্গি। কথায়, বক্তৃতায়, জনসভায়। সবই প্রকাশ্যে। মহাভারতে, কৌরব-পাণ্ডবযুদ্ধে, কুরুক্ষেত্রেও অসভ্য আচরণ, অসভ্যতার সীমারেখা লঙ্ঘন করেনি। কী করে এবারের লোকসভা নির্বাচনে এই ইতরামির কালচার? দায়ী কে, কারা? ভবিষ্যতের নির্বাচন কোন কালচারে পরিণত হচ্ছে?'

এই প্রশ্নই এখন পয়লা। ভোটারদের মগজে চক্কর দিচ্ছে। কূলকিনারা পাচ্ছে না কেউ। তাহলে কী ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন হতাশার? বহুমান্য সমাজবিজ্ঞানী আশিস নন্দী বলছেন, 'ক্ষমতায় যেই আসুক, হতাশা থেকেই ভোটার ভোট দিচ্ছে। ভোটারের মধ্যে হতাশার বীজ রোপিত। ভবিষ্যতে মহিরুহ হতে বাধ্য। এর পেছনে বৈশ্বিক প্রভাবও আছে। রাজনীতির প্রভাব। অর্থনীতির প্রভাব। এমনকি ধর্মীয় প্রভাব। এই সঙ্গে আঞ্চলিকতা এবং বর্ণ-জাতিবিদ্বেষও জড়িয়ে গেছে। শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর নানা দেশে, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকায়। নিঃসন্দেহে ভারতে বেশি। একেবারে প্রত্যক্ষ। ভারতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, বিভিন্ন সংস্কৃতি, বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন ভাষা। সব মিলিয়েই ভারত। ভারতের যে-মাল্টি কালচার, মাল্টি ভাষা, মাল্টি রেস (জাতি), মাল্টি ধর্ম, মাল্টি কালার (বর্ণ) এই নিয়ে যুগে-যুগে কোনো বিরোধ হয়নি, বরং সহাবস্থানই ভারতের মূল আদর্শ। কিন্তু ইদানীং বিশ্রী আবহাওয়া ভারতীয় জনজীবনে, যা খোলা চোখে দৃশ্যত। ভারতীয় ঐক্যে চিড় ধরাচ্ছে।'

আশিস নন্দীর খ্যাতি দেশ-বিদেশে সমাজবিজ্ঞানী হিসেবেই নয় শুধু, দার্শনিকও। দিল্লির জেএনইউ (জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়)-এর ডাকসাইটে অধ্যাপক একদা। বহু গ্রন্থের প্রণেতা। ইংরেজি, বাংলা। ঢাকায় গিয়েছেন কয়েকবার, বক্তৃতা উপলক্ষে। তার চিন্তাধারায় বিশ্বের মানুষ, সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র একীভূত।

আশিস কলকাতার। বাংলাদেশে কোনো শিকড় নেই ঠিকই, কিন্তু মনেপ্রাণে বাঙালি। বাংলাদেশ ওর প্রিয়। বাংলাদেশের অনেক অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সমাজকর্মী, অর্থনীতিবিদও ওর আত্মিক বন্ধু।

আশিসের কোনো বোন নেই, ওরা তিন ভাই। ভাইকুলে আশিসই বড়। ছোট দুই ভাইও সাহিত্যিক। নামি। মনীশ নন্দী। প্রীতিশ নন্দী। আমাদের জানা আছে, প্রীতিশ নন্দী বাংলাদেশের 'স্বাধীনতার সম্মানে' পুরস্কারে ভূষিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রীতিশের অবদান স্মরণীয়। প্রীতিশ মূলত কবি। অনুবাদক।

প্রীতিশের প্রথম স্ত্রী বাংলা ভাষার বহুমানিত বুদ্ধিযোগী প্রাবন্ধিক আবু সয়ীদ আইয়ূবের অগ্রজ ওসমান গনির কন্যা রীনা। বিদুষী মহিলা তিনি। প্রীতিশ কবি। রোমান্টিক। বিবাহ বিচ্ছেদের পরে ওর বান্ধবী, ভারত কাঁপানো সুন্দরী, নর্তকী, অভিনেত্রী মল্লিকা সারাভাই। মিলন পোক্ত হয়নি দু'জনের।

মল্লিকাকে নিয়ে আরেকটু বলা দরকার। মল্লিকার বাবা বিক্রম সারাভাই। ভারতের অ্যাটমিক এনার্জির মহাপরিচালক একদা। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত। মল্লিকার ঠাকুরমা মা (দাদি) শান্তিনিকেতনে ছিলেন বহুদিন, বিশ্বভারতীর ছাত্রী। রবীন্দ্র স্নেহধন্য। মল্লিকার মা মৃদুলা সারাভাই, বিশ্বভারতীর ছাত্রী। নাচের। ঠাকুরমা, মা গুজরাটি হলেও বাংলা, রবীন্দ্রনাথকেই ভালোবেসেছেন মনেপ্রাণে। মল্লিকা যেমন প্রীতিশকে। বলছিলেন একবার, 'বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে আমার আত্মিকযোগ।'

আশিসরা খ্রিষ্টধর্মীয়। কিন্তু ওর গোটা পরিবার ধর্মাধর্মের ঊর্ধ্বে, খাঁটি সেকুলার। আশিসের বৌ উমা আরও বেশি। তিনি গুজরাটের। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের। মোদির নাম শুনলে চোখমুখ খিচিয়ে স্পষ্ট বাংলায় বলেন, 'ভগবান, রক্ষা করো। বাঁচতে চাই।'

আশিস বলছিলেন (ফোনে) : 'জাতপাত, ধর্ম নিয়ে এবারের নির্বাচনে যে ভয়ঙ্কর খেলা চলছে, ভারত কোনদিকে যাচ্ছে, স্পষ্ট। ভারতীয় বলে যে কৌলিন্য ছিল আমাদের, নিশ্চিহ্ন-প্রায়। এবারের নির্বাচনে প্রতিবেশী-দেশকেও ছাড়ছে না। প্রতিবেশী দেশের ধর্মবোধকেও নয়। জড়িয়েছে বাংলাদেশকে। মমতাকে নিয়ে যে ক্যারিকেচার করেছে বিজেপি, ভয়ঙ্কর আপত্তি। বাংলাদেশ সরকারের উচিত তীব্র প্রতিবাদ করা। না করলে বিজেপির কাছে নতজানু। বিজেপির ভিডিও দেখুন।'

দেখলুম। ভাইরাল হয়েছে। রীতিমতন আপত্তিকর। চূড়ান্ত ফাজিল। অসহনীয়। বাংলাদেশ সরকার কি চুপ থাকবে? প্রতিবাদ করবে না? পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই, ভারতেরও অনেকে বলছে, বিজেপির এই ভিডিও, যতই নির্বাচনী প্রচারণা হোক, বাংলাদেশকে অপমান করা হয়েছে এবং অপমান ধর্মের নিরিখে।

অ্যানিমেশন ফিল্মে এই ভিডিও। মুখ্য চরিত্রে মমতা ও মোদি। এও বাহুল্য। গোটা ফিল্মজুড়ে ঝুমুর গান। গানের শুরুতেই : 'ও পিসি তুই চলে যা/চলে যা/চলে যা/বাংলাদেশে চলে যা।/এথায় তোকে মানাইছে না রে/ইক্কেবারে মানাইছে নারে।'//'তুই যে শুধু ওদের দেখিস/হো হো/তোর জন্ম কোন দ্যাশে রে/ও পিসি তুই চলে যা বাংলাদেশে চলে যা। চলে যা।'

কেবল গান নয়, ফিল্মে দেখছি, মমতার মাথায় হিজাব, বোরখা। তার আশপাশে বাংলাদেশের মানুষ, নারী-পুরুষ। প্রত্যেক নারী হিজাব পরিহিত। বোরখায় মুখ ঢাকা। পুরুষের মাথায় টুপি। মুখ দাড়িভর্তি। পরনে যে পোশাক, সব ইসলামী। এদের নিয়ে মমতার 'নৃত্য'।

বিজেপি বাংলাদেশকে ইস্যু করেছে, নির্বাচনী প্রচারণায়, সেকুলার বাংলাদেশের ধর্মকে আঘাত করে। ধর্মীয় বোধকে (বাংলাদেশের) যেভাবে আঘাত করেছে, অতীব আপত্তিকর। শ্নীল-অশ্নীলতার সীমা ছাড়িয়ে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণায় যা প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকার কী আপত্তি করবে না? চুপ থাকবে? বাংলাদেশের ধর্মীয়বোধে, সার্বভৌমে আঘাত নয় কি? ভোটরঙ্গে, ভোটযুদ্ধে অনেক কিছুই হয়, পররাষ্ট্রকে নিয়েও। তাই বলে একটি দেশকে সরাসরি অপমান? একটি দেশের ধর্মবোধ, ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে?

বাংলাদেশে নানা ধর্ম, ধর্মীয় সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক কালচার। জাতিধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকে বাংলাদেশের। আমরা কী বলি : 'ও... চলে যা/ভারতেই চলে যা/ইক্কেবারে মানাইছে রে।'

-বিজেপির এই গানে, অ্যানিমেশন ছবির নানা চরিত্রে যে কথন, যে দৃশ্যাবলি, দেখে মনে হয়, আশিস নন্দীর কথাই ঠিক, 'একটি স্বাধীন দেশকেও বিভাজিত করছে বিজেপি। বাংলাদেশের উচিত তীব্র প্রতিবাদ করা। না করলে দেশের মানুষ ক্ষিপ্ত হবে দিনে দিনে।'

জার্মান প্রবাসী, কবি


মন্তব্য