দিল্লিতে ক্ষমতার খেলা ও বাংলাদেশ

ভারতের লোকসভা নির্বাচন

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯

দিল্লিতে ক্ষমতার খেলা ও বাংলাদেশ

  ড. আকমল হোসেন

কয়েক পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভারতে লোকসভা নির্বাচন। কেন্দ্রীয় সরকার গড়ার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচন সঙ্গত কারণে ভারতের বাইরে তার বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে গুরুত্ব বহন করবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় তার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা তার আগের ক্ষমতার কালে দেখা যায়নি। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির বেলায় পূর্বসূরি কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে তার কোনো পার্থক্য নেই। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখা, প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি বা চিরবৈরী পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হতে কংগ্রেস-বিজেপি নির্বিশেষে একই ধারা ধরে রাখে। বাংলাদেশের বেলায়ও ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে কংগ্রেস ও বিজেপির শাসনে ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে।

সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ যে কোনো পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্ব বহন করে। দিল্লির ক্ষমতায় পরিবর্তন বাংলাদেশকে স্পর্শ করবে, কোনো সন্দেহ নেই। দলের পরিবর্তন বা একই দলের নতুন সরকার হলেও এতে কোনো উনিশ-বিশ হয় না বলা চলে। তবে নতুন সরকার হলে তার চিন্তাধারা কীভাবে তৈরি হবে, সে নিয়ে এক ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। কেননা, পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের আদর্শিক মিলের কারণে ভারত-বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে যে ধরনের সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা বিজেপির সময়েও থাকবে কি-না- এ প্রশ্ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে তখন আলোচনায় ছিল। অটল বিহারি বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ভারত এবং বিএনপির শাসনাধীন বাংলাদেশের সম্পর্ক পারস্পরিক অভিযোগ, প্রত্যাভিযোগ দ্বারা পূর্ণ ছিল। কিন্তু পরে কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগ, দু'দেশে ক্ষমতায় ফিরে এলে সম্পর্কের পরিবর্তন হতে দেখা গেছে। তবে ২০১৪ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এবং সাম্প্রদায়িক 'হিন্দুত্ব' মতাদর্শে চালিত নতুন সরকার প্রতিবেশীর প্রতি কী নীতি গ্রহণ করে, তা দেখার বিষয় ছিল। সে সময় বিজেপি সরকার তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে তার প্রথম বিদেশ সফরে ঢাকায় পাঠিয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।

গত পাঁচ বছর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক 'গুণগত' মানে পরিবর্তন হয়েছে বলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিশ্নেষকদের কেউ কেউ মনে করেন। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রতি পূর্বের বিএনপি সরকারের অনুসৃত নীতির পরিবর্তন অবদান রেখেছে বলা হয়। ভারতের 'নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটি'র মতো দুটি স্বার্থকে আওয়ামী সরকার ভারতের চাহিদামতো পূরণ করায় বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছিল। বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থানকারী আসামের বিদ্রোহী উলফা গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে বাংলাদেশ ভারতের হুমকি দূর করেছে। দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ সুবিধা তথা ট্রানজিট এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে সুবিধা দেওয়ার বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি ভারতের জন্য স্বস্তিকর হয়েছে। এসব ইস্যুতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে কার্যকর পদক্ষেপও নিয়েছে। এদিকে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে অবকাঠামো নির্মাণে বড় অঙ্কের ঋণের প্রতিশ্রুতি এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করার চুক্তি করা হয়েছে। ভারতীয় বিশ্নেষকদের মতে, বিজেপি সরকারের 'নেবারহুড ফার্স্ট পলিসি' অনুযায়ী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।

তবে শুধু আবেগের রঙিন চশমা দিয়ে এসব বিষয় না দেখে বাংলাদেশের সুবিধার নিরিখে এ সময়ে দু'দেশের সম্পর্ক মূল্যায়ন করা উচিত। ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশের চাহিদাগুলো স্মরণ করা যেতে পারে। আদতে চাহিদাগুলো নতুন করে তৈরি হয়নি বরং আগের ধারাবাহিকতা বলা যায়। অভিন্ন নদী তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদেই (২০১৪-১৮) একটি চুক্তি হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সে চুক্তি হয়নি। আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছে। এমনকি এ বিষয়ে দু'পক্ষের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সংলাপের কোনো হালনাগাদ তথ্যও নেই। দু'দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ ও অর্থনীতি বিশ্নেষকদের অভিযোগ আছে। যদিও পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে দু'দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আগের বছরের সময়কালের ৮ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন হয়েছে; কিন্তু কোটামুক্ত ও শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা পেয়েও বাংলাদেশের পণ্য অশুল্ক্ক বাধার কারণে প্রত্যাশিত হারে ভারতে বাজার সুবিধা পায়নি।

গত পাঁচ বছরে বিজেপি দলটির সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থহানিকর পদক্ষেপে ফুটে উঠেছে। এ বিষয়ে যে ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ তা হচ্ছে, গত বছরের মাঝামাঝি আসামে ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজ্য সরকারের করা এনআরসি নামে 'প্রকৃত ভারতীয়' তালিকা। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে ভিত্তি ধরে তৈরি করা তালিকার বাইরে ৪০ লাখ মানুষকে অনুপ্রবেশকারী আখ্যায়িত করা হচ্ছে, যাদের মুসলিম বাংলাদেশি বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এসব মানুষকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়েছে, যার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সরকারি অবস্থানের তথ্য না থাকলেও দু'দেশের সম্পর্কের বেলায় এ রকম ঘোষণা হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। নরেন্দ্র মোদি তার সাম্প্রতিক নির্বাচনী সফরে পশ্চিমবঙ্গে এসে 'অনুপ্রবেশকারী' শব্দটি এ রাজ্যের বেলায়ও উচ্চারণ করেছেন, যা পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের নিরিখে উদ্বেগজনক।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অত্যাচার-নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ায় যে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়াটি উল্লেখ করা দরকার। নাম উল্লেখ না করেও তখন মিয়ানমার সফরে এসে তিনি সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, যার সঙ্গে সে দেশের শাসকগোষ্ঠীর রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে চিন্তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ভারত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক ত্রাণ দিতে এগিয়ে এলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভোটদানে বিরত থেকে বাংলাদেশের প্রতি কোনো মিত্রসুলভ আচরণ করেনি। এ বিষয়ে ভারতের নেওয়া অবস্থান মিয়ানমারে তার স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।

দেখা যাচ্ছে, বিজেপির শাসনে বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য ইস্যুতে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং কোনো কোনো বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি করা হয়েছে। আগামীতে তারা আবারও ক্ষমতায় এলে সে রকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে এ মুহূর্তে অতীত দেখে মনে করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। সম্পর্ক উন্নয়নে অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। দু'দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলেও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি আমলাতান্ত্রিক বাধার কারণে বাংলাদেশের রফতানির বেলায় অশুল্ক্ক বাধা তৈরি করায়। তিস্তা নদী নিয়েও শুধু প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দেওয়া কোনো বন্ধুসুলভ আচরণ নয়। বিজেপির পরিবর্তে অন্য কোনো সরকার দিল্লিতে ক্ষমতাসীন হলে তাদের বিবেচনায় এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তৈরির পথ প্রশস্ত হবে কি-না, তা এক কথায় বলা সম্ভব নয়। তবে দেওয়া-নেওয়ার নীতি মনে রেখে তা করাই হবে যুক্তিযুক্ত।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ