ভারতে ভুয়া খবরের জমজমাট বাজার

প্রতিবেশী

প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৯

ভারতে ভুয়া খবরের জমজমাট বাজার

  ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলট

গত মাসে মাইক্রোসফট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়, বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় ভারতে বেশি ভুয়া খবর বের হয়। তা না হলে শত বছর আগের সত্য কীভাবে এখন এসে মিথ্যা হিসেবে প্রচার পায়? অথচ স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী লিখেছেন- সত্যার্থ প্রকাশ। মাহাত্মা গান্ধী লিখেছেন- দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ।

সম্প্রতি দাবি করা হয়, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট বা ইউপিএ জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ আজহারের মুক্তির জন্য দায়ী। প্রকৃত সত্য হলো, তাকে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি সরকার পাকিস্তানের হাতে তুলে দেয়। আবার প্রচারণা চালানো হয় যে, পাকিস্তান যখন ১৯৬৫ সালে ভারত আক্রমণ করে, জওহরলাল নেহরু তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অথচ তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আবার ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির মতে, জওহরলাল নেহরু ইন্দিরা গান্ধীকে কংগ্রেস সভাপতি করে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রথা চালু করেন। আসলে নেহরু বিষয়টি অনেক আগেই পরিস্কার করেন, কংগ্রেস চাইলে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে- কে তার আসনে বসবেন।

এ রকম ভুয়া খবর নিয়ে ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম। সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, গুগল ও টিকটকের মতো ইন্টারনেট অ্যাপিল্গকেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দু'দিনব্যাপী বৈঠক করেন। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুনিল অরোরা বলতে বাধ্য হয়েছেন, 'আমরা চাই যাতে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে একটি নির্দিষ্ট আচরণবিধি রাখা হয়, যাতে করে এই অ্যাপগুলোকে ভুল খবর ছড়াতে ব্যবহার না করা যায়। কেন ভারতে এ রকম ভুয়া খবর প্রচার হচ্ছে? এসব খবর ভারতের জন্যই সম্মানহানিকর।'

গত পাঁচ বছরে অনেক গুজব ছড়ানো হয়। এমনকি ফটোশপে ছবি সম্পাদনা করে দেখানো হয় যে, ১৯৮৮ সালে কাবুলে আবদুল গাফফার খানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় রাজীব গান্ধী ও রাহুল গান্ধী হাজির হন। এটাও বলা হয়, ইন্দিরা গান্ধীকে মুসলিম কায়দায় সমাহিত করা হয়। ফটোশপে আরও দেখানো হয়, বর্তমান রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী আশোক গহলোট পাকিস্তানের পতাকা উড়াচ্ছেন। আরও দেখানো হয়, রোহিঙ্গারা হিন্দুদের হত্যা করে তাদের গোশত খাচ্ছে। এ রকম তালিকা আরও দীর্ঘ।

কথা হলো, এসবের আসল সত্য কোনটি। কখনও কখনও এমনও হয়, সত্যটা পাওয়াই দুস্কর। কারণ তথ্যে ভেজাল মেশানো থাকে কিংবা সত্যকে গোপন রাখা হয়। মনমোহন সিং সরকারের সময় ভারতের প্রবৃদ্ধি নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশেষ করে বেকারত্বের হারের ক্ষেত্রে এটি ঘটেছে। দুই মাস আগে জাতীয় জরিপ অফিসের (এনএসএসও) তরফে সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখানো হয়, বেকারত্বের হার ৬ শতাংশেরও বেশি। যেটি ১৯৭২-৭৩ সাল থেকে সর্বাধিক। ভারতের নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান যদিও এ তথ্যের চ্যালেঞ্জ করেছেন; কিন্তু সেটি অফিসিয়ালি প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি চাকরির তথ্য প্রকাশ না করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের ভারপ্রাপ্ত পরিচালককে পদত্যাগ করতে হয়েছে। বলা প্রয়োজন যে, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর এনএসএসওর কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা থাকলেও ২০১৬ সাল থেকে তা বন্ধ রাখা হয়। এমনকি শ্রমিক অফিসের জরিপের তথ্যও এ সময়ের পর আর নেই। আরও অনেক তথ্যেরও ঘাপলা রয়েছে। যেমন, ধর্ম ও বর্ণের বিষয়টি এখানে পদ্ধতিগতভাবে নেই। অন্যান্য তথ্য সাজানোর ক্ষেত্রেও প্রভাবক বিষয়গুলো রাখা হয়নি। ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভারতের পুলিশ মুসলমানদের সংখ্যাটি প্রকাশ করবে না, যেটি ১৯৯৯ সালে বাজপেয়ি সরকার শুরু করেছিল। একইভাবে ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় অপরাধ রেকর্ডে ধর্ম ও বর্ণের বিষয়টি রাখা হচ্ছে না।

ফলে কখনও কখনও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সত্য তথ্য পাওয়া যায়; যেমন সিএমআইই বা সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির প্রতিবেদনে দেখানো হয়- বেকার আছে, কাজ করতে চায়, কিন্তু চাকরি খুঁজতে তৎপর নয় এমন সংখ্যা মিলে বেকারত্বের হার ৭.৮৭ শতাংশ।

শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, অধিক শিক্ষিতরা বেশি বেকার। আবার গ্রাম-শহরেও বৈষম্য প্রকট। রয়েছে বয়সের ভেদও। যেমন ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বেকারত্বের হার ৩৮.৩৪ শতাংশ। আবার ২০-২৪ বছর বয়সী বেকারের হার ২৭.২৭ শতাংশ। এমনকি অপেক্ষাকৃত অনেক ধনী রাজ্যগুলোর অবস্থাও খারাপ। যেমন হরিয়ানায় ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৬৭ শতাংশ বেকার কাজ খুঁজছে। অন্যদিকে গুজরাটে মোট বেকারত্বের হার কম (৪.৮ শতাংশ) হলেও ২২ শতাংশ যুবা চাকরি খুঁজছে হন্য হয়ে।

এসব পরিসংখ্যান চাকরির বাজারের খারাপ চিত্রই বর্ণনা করছে। বিশেষত চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীদের সংখ্যা বাড়ছেই। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলো বিনিয়োগের চিত্র দেখা। সিএমআইইর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালের শেষ তিন মাসে বিনিয়োগ কমেছে এবং তা ১৪ বছরের তুলনায় সর্বনিল্ফেম্ন। আবার দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগও থেমে আছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমরা মনে করি, নির্বাচনে প্রচারের এ সময়টিই এসব নীতি ফিরে দেখার যথার্থ সময়। কিন্তু তুলনা করলে দেখা যাবে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রচারের সময় আগের মেয়াদের সরকারের তথ্য ধরে যেভাবে আলোচনা করা গেছে, এখন সেটি হচ্ছে না। যার অন্যতম কারণ তথ্যের অভাব। বিশেষত স্কিল ইন্ডিয়া অ্যান্ড মেক ইন ইন্ডিয়া নীতি আমরা সুন্দরভাবে পর্যালোচনা করতে পারছি না।

পাঁচ বছর আগে একটি জনপ্রিয় কথা ছিল- 'দ্য নেশন ওয়ান্টস টু নো' জাতি জানতে চায়। আর আজ এসে আমাদের মনে হচ্ছে, কেউ জানতে চাইলেও জানতে পারছে না। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে সংবিধিবদ্ধ কমিটিগুলো যোগাযোগের বিকল্প মাধ্যম হয়ে থাকে। বিশেষ করে যখন সংবাদ সম্মেলন কল্পনা করা যায় না। পরিকল্পনা কমিটি ও গণহিসাব কমিটি, যাদের কেবল সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকা উচিত, লোকসভা নির্বাচনের পর তাদের কিছু স্বাধীন মত থাকা উচিত। এ সময় কিছু শিক্ষাবিদ ও কিছু সংবাদমাধ্যম এ রকম আলোচনার চেষ্টা করছে। এখন বিরোধী দলেরও এজেন্ডা যতটা না নীতি, তার চেয়ে রাজনীতি। তারপরও যেখানে তথ্য বিকৃতি ঘটছে, যখন সত্য পদ্ধতিগতভাবে আড়ালে রাখা হচ্ছে, তখন এমন একটা বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হওয়াই প্রয়োজন।

অধ্যাপক, ইন্ডিয়ান পলিটিক্স অ্যান্ড সোসিওলজি, কিংস ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট লন্ডন ও নন-রেসিডেন্ট স্কলার, দি কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক


মন্তব্য যোগ করুণ