'ও চাচা, প্রাইভেট নাকি সরকারি?'

রম্য

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৯

'ও চাচা, প্রাইভেট নাকি সরকারি?'

  ডা. সাইফুল আলম

-ও চাচা, প্রাইভেট নাকি সরকারি?

-কী বলছ বাবা?

-বলছি হাসপাতালের চিকিৎসাটা প্রাইভেটভাবে করাবেন নাকি সরকারি?

-তা সরকারি হাসপাতালে আইছি যখন, তখন তো সরকারিভাবেই করামু।

-তবে তো ভারি মুশকিল।

-ক্যান বাবা, কী মুশকিল?

-দ্যাখতাছেন না আউটডোরে কত রোগী, কত ভিড়।

-তাতে কী হইছে?

-তয় আজ আর হইব না। তা ছাড়া কবে যে সিরিয়াল পাইবেন, কে জানে।

-তয় তো বড়ই মুশকিল। অনেক দূর থ্যান আইছি।

-এক কাম করেন।

-কী কাম?

-আমার লগে চলেন। সামনেই অনেক ডাল ডাল চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। পয়সাও কম আবার হয়রানিও কম।

-কিন্তু ...

-কোনো কিন্তু নয়। আইলে আহেন, নইলে যায়েন গা।

মহানগরীর একটি সরকারি হাসপাতালের আউটডোর বারান্দায় একজন রোগী আর একজন পেশাজীবী দালালের কথোপকথন আমি আর আমার বন্ধু কিসমিস আলী খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে অতি সন্তর্পণে শুনছিলাম। যদিও আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো ছিল; কিন্তু আমাদের দু'জোড়া কানের অভিজ্ঞ ছিদ্রগুলো ওদের পানে রেকি করা ছিল। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আমাদের এক বন্ধুকে সাক্ষাৎ প্রদানের পর নিচে নেমে আসতেই বারান্দায় এই ব্যবসায়িক দৃশ্যটির আকর্ষণে আমরা থমকে দাঁড়ালাম। তবে ওখানে বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে আমি কিসমিসের পাটখড়ি মার্কা একটা হাত ধরে সামনের ওয়েটিং স্পেসের একটা বেঞ্চে পাশাপাশি বসে পড়লাম। লক্ষ্য করলাম, আশপাশে নানা বয়সী রোগীদের ঠেলাঠেলি আর হৈ-হুল্লোড়। চিকিৎসা বাসনার চেয়ে রোগ যাতনাই যেন বেশি। কিছুক্ষণ নীরবতার সঙ্গে মিতালি করে কিসমিস বলল, 'দোস্ত, শুধু সরকারি হাসপাতালেই নয়, দালালি ব্যবসাটা এখন সমাজের নানা স্তরে যেন সুয়ো পোকার মতো হুল ফোটাছে।'

-'হুম, তুমি সত্যটাকেই খোঁচা মেরেছ দোস্ত।' আমি একটি দীর্ঘশ্বাস আমার বুকের খাঁচা থেকে যেন সিজারিয়ান ডেলিভারি করে উত্তরটাকে প্রসব করালাম। কিসমিস বলল, সময়ের ক্রমবর্তমানে এ পেশাটি যেন ক্রমবর্ধমান হয়ে সমাজের অধিকাংশ ক্ষেত্রে জায়গা করে নিয়েছে। আমি এবার অতীতের নস্টালজিয়ায় খানিকটা গা ভিজিয়ে বললাম, 'দোস্ত, ছোটবেলায় শুধু গরু-ছাগল বেচাকেনার হাটবাজারে এ পেশার কিছু লোকের তৎপরতা দেখা যেত।'

-তা যথার্থই বলেছ দোস্ত। কিন্তু আজকাল সমাজের সর্বত্র যেমন, বিদেশে আদম পাচারে, চাকরির যোগদানপত্র পাওয়াতে, স্কুল-কলেজে ভর্তির ব্যাপারে, চাকরির পদোন্নতিতে, জমি-জায়গা ক্রয়-বিক্রয়ে, এমনকি বাস, ট্রেন বা লঞ্চের অগ্রিম টিকিট খরিদের ক্ষেত্রেও দালালদের দৌরাত্ম্য যেন ক্যান্সারের রূপ ধারণ করেছে। আমি বললাম, এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পণ্যটিকে নানা লোভনীয় রঙ্গে রঞ্জিত করে মক্কেলকে সম্মোহনী করাই এ পেশার মূলমন্ত্র। এ যেন হান্ড্রেড পার্সেন্ট বিনা পুঁজির ব্যবসা।

-দোস্ত, লক্ষ্য করলে দেখবে, এ পেশাটি আজকাল নিম্নস্তর থেকে অনেক উচ্চস্তর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। আমরা ইংরেজিতে এজেন্ট বলতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, বাংলায় দালাল শব্দটি বলতে যেন ততটাই দ্বিধাবোধ করি। হেঃ হেঃ হেঃ, কিসমিস একটা তেজপাতা মার্কা শুকনো হাসি দিয়ে তার মন্তব্যটি শেষ করল। আমি কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে পা চালাতে কিসমিসও আমাকে অনুসরণ করল। আমরা হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কোলাহলময় রাজপথে পা রাখলাম। নীরবে কিছুদূর হাঁটার পর আমি কিসমিসকে শুধালাম, কী দোস্ত, এ বিষয় সংক্রান্ত কোনো কলকাঠি কি তোমার মগজে সুড়সুড়ি দিচ্ছে নাকি।

-হুম। দোস্ত, আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে ছেলেমেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে এক শ্রেণির মধ্যস্থতাকারীর বেশ তৎপরতা দেখা যায়, যা কালক্রমে একটি লাভজনক পেশা হিসেবেও অনেকে গ্রহণ করেছেন। 'কিসমিসের মন্তব্যটিতে কোন শ্রেণিটিকে ইঙ্গিত করতে চাইছে, তা বেশ বুঝতে পেরে আমি বললাম, এ বিষয়ে একটি বহুল প্রচারিত প্রাচীন কৌতুক আমার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে।

-তা উঁকি-ঝাঁকিমারা কৌতুকটি পরিবেশন করেই ফেল না দোস্ত। কিসমিসের উৎসাহে আমি অতি উৎসাহী হয়ে শুরু করলাম- এক গ্রামে এ ধরনের এক মধ্যস্থতাকারী একবার পাত্রীর অভিভাবকদের বলল, পাত্র আপনাদের মেয়েকে বিয়ে করার জন্য এক পায়ে খাড়া। তারপর পাত্রের অভিভাবকদের বলল, পাত্রীর মুখে কোনো কথা নেই। একেবারে মা লক্ষ্মী। উভয় পক্ষের অভিভাবকবৃন্দ সেই মধ্যস্থতাকারীর কথায় বিশ্বাস করে কোনো খোঁজখবর না নিয়েই বিয়ের ব্যবস্থা পাকাপাকি করে ফেলল। কিন্তু বিয়ের আসরে দেখা গেল পাত্রের এক পা নেই অর্থাৎ এক পায়ে খাড়া আর পাত্রী বোবা অর্থাৎ মুখে কোনো কথা নেই। আমার কৌতুকটি কিসমিস আলতোভাবে কোলে তুলে নিয়ে বলল, দোস্ত, অনেক নিরীহ মানুষকে দালালদের ঘোর প্যাঁচে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যেতেও দেখা যায়।

-তা যায়। তবে অনেক সময় আবার অনেক দালাল ফাঁদে পড়ে জেলহাজতের ভাতও পাকস্থলীতে চালান দেয়। শুধু তাই নয়, এ ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রাণহানির আশঙ্কাও থাকে। আমি যেন আমার সারগর্ভ মন্তব্যটি দৃঢ়তার সঙ্গে নিক্ষেপ করলাম। কিসমিস এবার তার চলার গতিটাকে ছটাকখানেক মন্থর করে বলল, 'দোস্ত, আজকাল অনেক হাইব্রিড রাজনৈতিক টাউটরা নানা ছলাকৌশলে এ পেশায় বেশ টু পাইস কামিয়ে নিচ্ছে। হেঃ হেঃ হেঃ।' কিসমিস যেন তার মন্তব্যটির লেজে কিছুটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসির উপটান লেপে দিল। আমি বললাম, আবার অনেক সময় ব্যবসায় মোটা অঙ্কের লাভের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক দালালচক্রকে বিনিয়োগকারীর তলপেটে প্যানাল্টি শট মেরে গা ঢাকা দিতেও শোনা যায়।

-তুমি দেখছি এ সংক্রান্ত খবরাখবর বেশ সযতনে রপ্ত করে রেখেছ দোস্ত, বক্তব্যটি ক্ষেপণ করে কিসমিস যেন একটি মোলায়েম বক্র দৃষ্টি মেলে আমার পানে তাকাল। আমিও কিঞ্চিৎ দৃষ্টি-দৃষ্টি বিনিময় উদযাপন করে ওকে নিয়ে সামনের দিকে কিছুটা এগোতেই লক্ষ্য করলাম, একটা রিকশা ভ্যানে কয়েকটা ছোট-বড় প্যাকেটের শিশি বোতল সাজিয়ে একজন বিক্রেতা একটা অখ্যাত কোম্পানির সর্বরোগ নিরাময়কারী ওষুধের মার্কেটিং করছে। ওর বচনভঙ্গি আর বড়ি ল্যাঙ্গুয়েজ বেশ কিছু পথচারীকে আকৃষ্ট করায় তারা তার পাশে ভিড় জমাচ্ছে। দৃশ্যটি অবলোকন করে কিসমিস বলল, 'দোস্ত, এসব ব্যবসা প্রধানত কমিশনভিত্তিক দালালি-সংক্রান্ত। বিক্রীত পণ্যের লভ্যাংশের একটি অংশ বিক্রেতার ভাগ্যে জোটে। আমি বললাম, কিন্তু অনেকেই তো এসব করে জীবন চালাচ্ছে। যদিও ওর প্রতিটি বাক্যই মিথ্যার শব্দে ভরা।

-হুম। দোস্ত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দালালি আর প্রতারণার সহবাসে নানা দুর্ঘটনার জন্ম হয়। কিসমিসের গবেষণামূলক মন্তব্যটি আমি কোলে তুলে নিয়ে বললাম, 'তা মন্দ বলনি।' আমরা আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে যেতে কিসিমস বলল, নানা ধরনের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দালালচক্রের নানা অপরাধে জড়িত থাকার সংবাদ প্রায়ই পাওয়া যায়। যেমন- হাসপাতালে নবজাতক চুরি, বিদেশে নারী পাচার, মাদকদ্রব্য পাচার ইত্যাদি ভয়ানক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমি এবার আমাদের আলোচ্য বিষয়টি আর টানাটানি না করে কিসমিসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির দিকে পা চালালাম।

ডেন্টাল সার্জন


মন্তব্য