ভারতের নির্বাচন ও লোকরঞ্জনবাদ

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৯

ভারতের নির্বাচন ও লোকরঞ্জনবাদ

নরেন্দ্র মোদি

  আশুতোষ ভার্শনি ও শ্রীকৃষ্ণ আয়াঙ্গার

ভারতে লোকসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে ১১ এপ্রিল থেকে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী এপ্রিল ও মে মাসে মোট সাত ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্বাচনের ভোট গণনা হবে আগামী ২৩ মে। সে দিনই জানা যাবে ভারতের পপুলিস্ট তথা লোকরঞ্জনবাদী নরেন্দ্র মোদি আবারও ক্ষমতায় আসবেন কি-না। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ২৭২ আসন প্রয়োজন হলেও ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বেই বিজেপি ২৮২টি আসনে জিতে নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছিল। সেটিই ছিল প্রথমবারের মতো বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী 'জনপ্রিয়' হিসেবে পরিচিত। একই জনপ্রিয়তার ক্যাটাগরিতে পড়েন তুরস্কের রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান, হাঙ্গেরির ভিক্টর আরবান, ইসরায়েলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ফিলিপাইনের রড্রিগো দুতার্তে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য তাদের সবাই একই রকম তা নয়। তবে সাধারণীকরণ করলে বলা যায়, তারা একই ধরনের।

ভারতে যদিও পপুলিজম তথা লোকরঞ্জনবাদ ব্যবহূত হয় সাধারণ অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকাদের জন্য। যেমন ঋণ কমানো, দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্প ইত্যাদি। কিন্তু এখন এটি রাজনৈতিক পরিভাষা। এদিক বিবেচনায় আমরা আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটি ও লোকনীতি যৌথভাবে একটি জরিপ পরিচালনা করি। যার নাম- রাজনীতি ও সমাজ এবং নির্বাচন। লোকরঞ্জনবাদ যদিও আদর্শ হিসেবে উদারনীতিবাদ, রক্ষণশীলতা কিংবা সমাজতন্ত্রের মতো বিকশিত হয়নি। এটি গণতন্ত্রকে নির্বাচন ও গণভোটের সঙ্গে একাকার করে ফেলে। কারণ তারা জনপ্রিয় মতের প্রতিনিধিত্ব করেন। এ মত অনুযায়ী বিচারালয়, সংবাদমাধ্যম, গোয়েন্দা সংস্থা, সুশীল সমাজ কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নীতির বাইরে জনরায় মানতে হবে।

প্রকৃত পপুলিস্ট একজন নেতা মূলত 'জনগণের ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছা'র প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে থাকেন। কোনো এক শত্রুর বিপক্ষে তিনি নিজেকে জনগণের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থায় প্রোথিত কোনো চিহ্ন, যেমন- 'অভিজাত'দের হটানোর কথা বলেন। এখানে সবার জনপ্রিয়তা একটি ব্যাপার।

অবশ্য জনপ্রিয়তাই যদি সবকিছু হয় তাহলে প্রশ্ন জাগে, জনগণ কারা? লোকরঞ্জনবাদীদের এ প্রশ্নের দুটি জবাব রয়েছে। দরিদ্র তথা পিছিয়ে পড়া মানুষদের 'জনগণ' হিসেবে ধরা হলে খটকা লাগে তাদের আয় বণ্টন ও কল্যাণনীতিতে। অন্যদিকে যদি ধর্ম, বর্ণ বা জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে জনগণ ধরা হয়, তাহলে সেটাও একদিকে হেলে পড়েছে। এই অধিকাংশ জাতীয়তাবাদীদের নেতাদের নামই ওপরে বলা হলো। যেখানে নরেন্দ্র মোদিও রয়েছেন।

প্রশ্ন হলো, ভারতে এই লোকরঞ্জনবাদের কি গণভিত্তি রয়েছে? যে জরিপের কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি, সে জরিপের প্রশ্নে আমরা তা বের করার চেষ্টা করেছি। রাজ্যভিত্তিক, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, উত্তরখণ্ড, দিল্লি, পাঞ্জাব, জম্মু ও কাশ্মীর, তামিলনাড়ূ, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডের নমুনা আমরা সংগ্রহ করেছি। দুই বছর আগে একই গবেষণার প্রশ্নে অবশ্য বাকি ১২টি রাজ্যে লোকরঞ্জনবাদের প্রশ্ন করা হয়নি।

এবার আমরা এ প্রসঙ্গে দু'ধরনের প্রশ্ন রেখেছি। প্রথম ধরনের প্রশ্নগুলো এ রকম- ১. জনসাধারণের অগ্রগতিতে বাধা কারা- অভিজাত শ্রেণি, সংখ্যালঘু, বড় জাত নাকি অভিবাসী? ২. রাজনীতি কি তাহলে ভালোমন্দের মধ্যে লড়াই নাকি ভালোমন্দের সঙ্গে আপস করা। ৩. মানুষের যথার্থ সেবা দেওয়ার জন্য নির্বাচিত নেতার কি আদালতকে অগ্রাহ্য করা উচিত?

বিশ্বব্যাপী এগুলোই লোকরঞ্জনবাদের প্রমাণিত প্রশ্ন।

যাহোক, আমাদের নমুনার গড়ে ৪৮ শতাংশ জবাব দিয়েছে অভিজাতরাই আসলে উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা। অথচ মাত্র ২৯ শতাংশ বলেছে, রাজনীতি ভালোমন্দের মধ্যে একটি যুদ্ধ। ২২ শতাংশ বিশ্বাস করে, মানুষের উন্নয়নের প্রশ্নে প্রয়োজনে জনপ্রতিনিধিরা আদালতকে অগ্রাহ্য করতে পারেন।

তবে আমরা তথ্য সন্নিবেশনে উত্তরদাতাদের তিন ভাগে ভাগ করেছি- অতি লোকরঞ্জনবাদী (১০ শতাংশ), মধ্য লোকরঞ্জনবাদী (২৮ শতাংশ) ও লোকরঞ্জনবাদবিরোধী রয়েছে ২০ শতাংশ। অতি ও মধ্য লোকরঞ্জনবাদীরা রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ূ, উত্তরখণ্ড ও জম্মু-কাশ্মীরে। কেরালায় সবচেয়ে বেশি লোকরঞ্জনবিরোধীরা রয়েছে। তবে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে হয়তো উত্তর ভিন্ন হতো।

এর পাশাপাশি অন্যান্য প্রশ্নও রাখা হয়েছিল। যেমন যারা গরুর গোশত খায় তাদের কি শাস্তি হওয়া উচিত? যারা রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ায় তাদের কি শাস্তি হওয়া উচিত কিংবা যারা জনসমক্ষে 'ভারত মাতা'র কথা বলে না তাদের কি শাস্তি হওয়া উচিত? উত্তরপ্রদেশ, উত্তরখণ্ড ও দিল্লির মানুষ এ শাস্তির পক্ষে বেশি অন্যদিকে কেরালা, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের মানুষ এর বিপক্ষে।

আসন্ন নির্বাচনে এসব তথ্য কতটা প্রভাব ফেলবে? এ ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশের অবস্থান লক্ষণীয়। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে বিজেপি ৪০-৪২ শতাংশ ভোট পায়। জরিপে দেখা যায়, উত্তরপ্রদেশে লোকরঞ্জনবাদীরা রয়েছে ৪০-৫০ শতাংশ। এ রাজ্যে বিজেপি স্টাইল রাজনীতি একটি সাধারণ ভিত্তি পেয়েছে। যদিও উত্তরপ্রদেশেই সমান একটি অংশ এসব সমর্থন করে না। ২০১৪ সালে অনুমিতভাবেই এ অংশটিই বহুজন সমাজ পার্টি, সাম্যবাদী পার্টি ও কংগ্রেসে বিভক্ত হয়। সে সময় প্রথম দুটি দলের ভোটের পরিমাণ ছিল বিজেপির ভোটের সমান। অবশ্য ২০১৭ সালে সেটি বেড়েছে। এখন যদি আমরা ধারণা করি, লোকরঞ্জনবাদীরা যদি বিজেপির পক্ষে যায় তার বাইরে সাম্যবাদী দল ও বহুজন সমাজ পার্টির ভোট উত্তরপ্রদেশে সমান হতে পারে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও বেকারত্ব এ চিত্রকেও আরও জটিল করে তুলতে পারে। জরিপটি অবশ্য কাশ্মীরের পুলওয়ামা আক্রমণের আগে করা হয়েছিল। যার প্রভাব এখানে আসেনি। পুলওয়ামা ও বালাকোটের ঘটনা অবশ্যই বিজেপিকে সাহায্য করবে। তবে জরিপে এ তথ্যও পাওয়া গেছে, উত্তরপ্রদেশে বেকারত্ব গুরুতর সমস্যা, এখানে বিজেপি অসহায়।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে ডিরেক্টর, সেন্টার ফর কনটেম্পরারি সাউথ এশিয়া, ব্রাউন ইউনিভার্সিটি এবং সহযোগী অধ্যাপক পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স, আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটি

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক


মন্তব্য যোগ করুণ