চকবাজারের মৃত্যুপুরী

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০১৯

চকবাজারের মৃত্যুপুরী

  ড. মো. আফতাব আলী শেখ

পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার আসগর লেন, নবকুমার দত্ত রোড, হায়দার বক্স লেন ও বাচ্চু মিয়ার গলির মিলনস্থল চুড়িহাট্টার জামে মসজিদ এলাকা। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে এই ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় কথিত গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্টেম্ফারণের ফলে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এই গলিপথের এক পাশে ওয়াহেদ ম্যানশন, অন্য পাশে বাচ্চু মিয়ার গলি। ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায় হোটেল ও ওপরতলায় বডি স্প্রেসহ অন্যান্য কসমেটিকসের গোডাউন। প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির জন্য বিদেশ থেকে আমদানিকৃত প্লাস্টিক গ্রেনুলার এ এলাকায় মজুদ রয়েছে। এই ওয়াহেদ ম্যানশনের আশপাশের কয়েকটি দোকানেও বিক্রির জন্য প্লাস্টিক গ্রেনুলার উন্মুক্ত অবস্থায় ছিল। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওয়াহেদ ম্যানশনের আন্ডারগ্রাউন্ডে হাজার হাজার বস্তা-ড্রাম কেমিক্যাল গুদামজাত অবস্থায় ছিল। এলাকার একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িতে রাখা একটি গ্যাস সিলিন্ডার হঠাৎ বিস্টেম্ফারিত হয়ে চারদিকে আগুন লেগে যায়। ওই আগুন বৈদ্যুতিক লাইনের ট্রান্সফরমারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ট্রান্সফারমারও বিস্টেম্ফারিত হয়।

পুরান ঢাকার ১০টি থানায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিপজ্জনক কেমিক্যাল যত্রতত্র মজুদ রাখা আছে। কোথাও কোথাও বাড়ির ভেতরে, ঘরের চারপাশে নানা রকম বিস্টেম্ফারক আর দাহ্য পদার্থের ছড়াছড়ি। কোনো কোনো এলাকায় আছে বিপজ্জনক কেমিক্যাল কারখানা ও আড়ত। শয়নকক্ষের সঙ্গেই যুক্ত আরেক কক্ষে হরদম খুচরা কেমিক্যাল বেচাকেনা চলছে। চকবাজারের চুড়িহাট্টার চারদিকে আছে ঝুঁকিপূর্ণ তিন শতাধিক কারখানা ও কেমিক্যাল গুদাম। এ এলাকায় দেয়ালের সঙ্গে দেয়াল লাগিয়ে নির্মিত হয়েছে বহুতল ভবন। রাস্তাগুলো এতটাই সরু, যা দিয়ে অগ্নিনির্বাপকের একটি গাড়ি সহজে এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না। চারদিকে সরু আঁকাবাঁকা গলি, যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বৈধ-অবৈধ কয়েকশ' কেমিক্যাল কারখানা, গুদামঘর ও দোকানপাট। কোথাও কোথাও রেস্টুরেন্টের বড় বড় চুল্লির কয়েক ফুটের মধ্যেই রয়েছে বেশ বড় আকারের কেমিক্যাল গুদাম। এখানে দেখা যায় ওয়েল্ডিং কারখানার পাশ ঘেঁষেই রয়েছে নানা রকম দাহ্য কেমিক্যাল বিক্রির দোকান। মাঝেমধ্যে সেখানে পরিচালিত ওয়েল্ডিংয়ের বিচ্ছুরিত অগ্নিস্টম্ফুলিঙ্গ উড়ে উড়ে কেমিক্যাল দোকান পর্যন্ত পৌঁছে। সামান্য অসতর্কতায় সেখানেই ঘটতে পারে নিমতলী অথবা চকবাজার ট্র্যাজেডির চেয়েও ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, পাঁচ সহস্রাধিক কারখানা, গুদাম আর দোকানপাট সঙ্গী করেই চলছে পুরান ঢাকাবাসীর জীবনযাপন। চকবাজার, লালবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী ও সূত্রাপুর থানা এলাকায় গজিয়ে ওঠা কারখানাগুলোতে অবাধে বছরের পর বছর চলছে বিস্টেম্ফারক ও কেমিক্যালের যথেচ্ছা ব্যবহার, বিপণন ও সরবরাহ। অনুসন্ধানে জানা যায়, বেশিরভাগ কারখানায় ব্যবহূত হচ্ছে জৈব রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ এবং নানা ধরনের জ্বালানি তেল। ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, চার হাজার অবৈধ কারখানা গড়ে উঠেছে তিন হাজারেরও বেশি আবাসিক ভবনে। আর বাকি কারখানাগুলো চলছে আরও ঘিঞ্জি জনবসতিতে।

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য কী কারণ হতে পারে, এ নিয়ে অনেকটাই ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং গণমাধ্যম মারফত প্রাপ্ত তথ্য থেকে বোঝা যায়, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের সম্ভাব্য দুটি কারণ হতে পারে :ক. গাড়ির সিলিন্ডার বিস্টেম্ফারিত হয়ে অগ্নিকাণ্ড অথবা খ. বিল্ডিংয়ের ভেতরের গ্যাস জাতীয় পদার্থের রিফিলিং সিলিন্ডার থেকে আগুন। এখানে জেনে রাখা ভালো, দাহ্য পদার্থ ও বিস্টেম্ফারক পদার্থের বৈশিষ্ট্য এক নয়। আবার কখনও কখনও অবিস্টেম্ফারক জাতীয় পদার্থও বিস্টেম্ফারক পদার্থে রূপান্তরিত হতে পারে। যদি অবিস্টেম্ফারক জাতীয় পদার্থের উপস্থিতিতে কোনো দাহ্য পদার্থে আগুন লাগে, তখন তা বিস্টেম্ফারক পদার্থের মতো আচরণ করে। এ ক্ষেত্রে দাহ্য পদার্থে সৃষ্ট আগুনের প্রভাবে সংশ্নিষ্ট পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। ফলে অবিস্টেম্ফারক জাতীয় পদার্থের বিয়োজন ঘটে। এ বিয়োজনের সময় যদি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিবেশের এন্ট্রোপির পরিবর্তন হয়, তবে ওই পদার্থ বিস্টেম্ফারকের মতো আচরণ করে। কেমিক্যাল বিস্টেম্ফারণের সময় দুই ধরনের বিক্রিয়া হতে পারে। যথা বিয়োজন ও সংযোজন বিক্রিয়া। উভয় ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, তাপ বিয়োজন বিক্রিয়া ঘটে ট্রাইনাইট্রোটলুইন বা নাইট্রোগ্লিসারিনের ক্ষেত্রে। উভয় পদার্থে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণু বিদ্যমান। যখন কোনো আগুনের সংস্পর্শে এ পদার্থের তাপ বিয়োজন ঘটে, তখন উৎপাদ হিসেবে উচ্চ তাপসম্পন্ন দাহ্য গ্যাস যেমন-অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড তৈরি হয়। উৎপন্ন গ্যাসের আয়তন অত্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং চারপাশে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এই গ্যাসের আয়তন প্রবল গতিতে বৃদ্ধির ফলে শক-ওয়েভের মতো সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও কিছু হাইড্রোকার্বন যেমন ইথাইনের তাপ বিয়োজনের ফলে বিস্টেম্ফারণের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। সংযোজন বিক্রিয়ার জন্য দুই বা ততোধিক পদার্থের প্রয়োজন হয়, যেখানে পদার্থগুলো বিক্রিয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ উত্তপ্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়। যেমন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এবং ফুয়েল অয়েল; গানপাউডার ইত্যাদি। এএনএফও-এর ক্ষেত্রে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ও লম্বা শিকলযুক্ত হাইড্রোকার্বন বিক্রিয়ার মাধ্যমে নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প তৈরি করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিমাণ মিশ্রণ না হলে মারাত্মক ক্ষতিকারক গ্যাস যেমন কার্বন-মনোক্সাইড ও নাইট্রোজেনের বিভিন্ন অক্সাইড তৈরি হয়।

আবার অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অবিস্টেম্ফারক পদার্থ হলেও তাপের প্রভাবে নিজেই তাপ বিয়োজন ঘটায়, যা বিস্টেম্ফারকের মতো আচরণ করে। উদাহরণস্বরূপ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্টেম্ফারণে টেক্সাস সিটিতে ১৯৪৭ সালে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে যখন কোনো একটি জৈব দ্রাবকে রাখা হয়, যে দ্রাবক দাহ্য যেমন পেট্রোল, এসিটোন, জাইলিন, হ-হেপ্টেন, অ্যালকোহল ইত্যাদি; এর পর যদি ওই দাহ্য পদার্থকে আগুনের সংস্পর্শে আনা হয়, তখন ওই পদার্থ দহনের ফলে উৎপন্ন তাপ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে বিয়োজিত করে অনেক গ্যাসীয় উৎপাদ তৈরি করে, তবে ওই ধরনের ব্যবস্থা বিস্টেম্ফারক হিসেবে কাজ করে।

এখন আসা যাক চকবাজার অগ্নিকাণ্ডের প্রথম সম্ভাব্য কারণ- গাড়ির সিলিন্ডার বিস্টেম্ফারণের ফলে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। এলাকাবাসীর ভাষ্য এবং কিছু গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গাড়ির সিলিন্ডার বিস্টেম্ফারিত হয়ে ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমার ও হোটেলে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারে আগুন লেগে যায়, যা পার্শ্ববর্তী রাসায়নিক দোকানে থাকা দাহ্য কেমিক্যালে আগুন ধরে। সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে দেখা গেল, গাড়ির বিভিন্ন অংশ পুড়লেও তার স্টিলের কাঠামো এবং গাড়িতে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার অক্ষত অবস্থায় আছে। অথচ সিলিন্ডার বিস্টেম্ফারণে আগুনের সূত্রপাত হলে গাড়ির স্টিলের কাঠামো ছিন্নভিন্ন হওয়ার কথা। রাস্তায় রাখা গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্টেম্ফারণের আগুন রাসায়নিক পদার্থভর্তি দোকানে বিস্তৃতির ঘটনাটি অত্যন্ত দুর্বল যুক্তিসম্পন্ন। যদি বাইরের আগুন দোকানে প্রবেশ করত, তাহলে ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনের দেয়ালগুলো বাইরের দিকে পতিত হতো না বরং ভেতরের দিকেই হেলে পড়ত।

অন্য সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে ওয়াহেদ ম্যানশনের কোনো গুদাম-রুমে রাসায়নিক দ্রব্য যত্রতত্র রাখা ছিল। এতে অসাবধানতাবশত দাহ্য জাতীয় পদার্থে আগুন লেগে যায়, যা ওই রুমে থাকা অন্য কেমিক্যালেও আগুন বিস্তৃতিতে সহায়তা করে। পাশাপাশি অবস্থিত দোকানে থাকা দাহ্য পদার্থও আগুনকে দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। অন্যদিকে নাইট্রোগ্লিসারিন বা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের মতো পদার্থ যা কিনা উচ্চ তাপমাত্রায় বিয়োজিত হয়ে বদ্ধ রুমে প্রবল এন্ট্রোপির পরিবর্তন ঘটায়। এ ধরনের উচ্চ এন্ট্রোপি পরিবর্তনের জন্য রাসায়নিক গুদামে রাখা পদার্থগুলো বিস্টেম্ফারকের মতো আচরণ করে। রাসায়নিক দোকানে দাহ্য, বিস্টেম্ফারক ও অবিস্টেম্ফারক নানা রকম রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এককভাবে কোনো একটি পদার্থ বিস্টেম্ফারক জাতীয় পদার্থ নাও হতে পারে; কিন্তু দুই বা ততোধিক পদার্থের মিশ্রণে বিস্টেম্ফারক পদার্থের জম্ম হয়। যেমন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ও ফুয়েল অয়েলের মিশ্রণ বিস্টেম্ফারিত হতে পারে। আবার এসিটোন দাহ্য পদার্থ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত; অন্যদিকে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড অদাহ্য পদার্থ। কিন্তু এদের মিশ্রণে বিস্টেম্ফারক জাতীয় পদার্থ তৈরি হতে পারে। এদের মিশ্রণকে টিএটিপি বলে, যা বিস্টেম্ফারক তৈরি করে বিধায় ১৯৯০ সালের পর থেকে প্লেনে তরল জাতীয় পদার্থ বহন করা নিষিদ্ধ।

অন্যদিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার ক্যান পারফিউম-অ্যারোসলের বোতল পড়ে আছে। দেখে মনে হয়, কোনোটি পারফিউম ভর্তি ছিল, কোনোটি রিফিল করার জন্য খালি অবস্থায় ছিল। এত বিপুলসংখ্যক বোতল এক স্থানে বদ্ধ ঘরে রাখলে বোতলগুলো সম্পূর্ণ ছিদ্রমুক্ত রাখা যায় না। যার ফলে বদ্ধ ঘরটি গ্যাসে পরিপূর্ণ থাকাই স্বাভাবিক। যে কোনোভাবে আগুনের সূত্রপাত হলে মুক্ত গ্যাসের কারণে এর গতিবেগ দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া অন্যান্য দাহ্য পদার্থ থাকায় তা থেকে আগুনের তাপমাত্রা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, যা একটি অগ্নি-ওয়েভ আকার ধারণ করে। যার ফলে এ রকম ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়। এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে ৭১টি তাজা প্রাণ ঝরে যায়। পুরান ঢাকা যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কেমিক্যাল সোসাইটি


মন্তব্য যোগ করুণ