অগ্নিঝরা মার্চ

নজিরবিহীন অসহযোগ

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৯

নজিরবিহীন অসহযোগ

  তোফায়েল আহমেদ

রক্তঝরা উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের আজ ছিল দ্বিতীয় পর্যায়ের পঞ্চম দিবস। ১৯৭১-এর ১২ মার্চ ছিল শুক্রবার। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ জাতির পিতার নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র সংগ্রামী জনতা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে থাকে। এমন সর্বাত্মক অসহযোগ ইতিহাসে নজিরবিহীন। এমনকি মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগকেও তা ছাপিয়ে যায়। এদিনে আমরা আমাদের যুবসমাজ ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করি। প্রতিদিন সকাল-বিকেল আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আমাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট করি এবং তার নির্দেশ নিই। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন, ওরা কালক্ষেপণ করছে। ওদের সময় দরকার; আমারও সময় দরকার। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রতিদিন সৈন্য, অস্ত্র আনছে ঢাকায়। তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও। আমার এখনও মনে পড়ে ১৯৭১-এর ১৭ ফেব্রুয়ারির কথা। বঙ্গবন্ধু আমাদের ডেকেছেন তার বাসভবনে। আমরা চারজন- শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক এবং আমি। সেখানে আরও ছিলেন জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান। আমাদের কাছে বসিয়ে চারজনকে উদ্দেশ করে বললেন, 'আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। তোমরা কলকাতার এই ঠিকানাটা মুখস্থ কর।' তখন একটি কাগজ-কলম নিয়ে তাতে একটা ঠিকানা লিখে আমাদের বললেন, 'এই ঠিকানাটা তোমরা মুখস্থ কর।' আমার মনে আছে, '২১নং রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা' এবং বললেন, 'এটা হবে তোমাদের ঠিকানা। আমি জানি, ওরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। আমাদের সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে।' অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বঙ্গবন্ধু আমাদের সহকর্মী জাতীয় পরিষদ সদস্য ডা. আবু হেনাকে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন এই ঠিকানায় সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখার জন্য। তিনি যে পথে সে সময় কলকাতাস্থ এ ঠিকানায় গিয়েছিলেন, পরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঠিক সে পথেই আবু হেনা সাহেব আমাদের উপরোক্ত ঠিকানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষারত ছিলেন শ্রী চিত্তরঞ্জন সুতার। তিনি জাতীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে আগেই সেখানে পাঠিয়েছিলেন। অর্থাৎ আগে থেকেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য বঙ্গবন্ধুর সার্বিক প্রস্তুতি ছিল। রক্তাক্ত এদিনেও অসহযোগ পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নির্দেশে বাংলার মানুষ আসন্ন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সেই যুদ্ধের প্রস্তুতিই নিচ্ছিল। প্রতিটি নিরস্ত্র মানুষ সেদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে সশস্ত্র হয়ে উঠছিল।

এদিকে পাকিস্তানের উভয়াংশের জাতীয় নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে বঙ্গবন্ধুর শর্তগুলো মেনে নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি জোর দাবি জানান। ঢাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে ইশতেকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান টানা তৃতীয় দিনের মতো আজও লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন- 'পশ্চিমাঞ্চলের কিছু লোক বলছে, পূর্ব পাকিস্তান যখন যাবেই তখন যত দ্রুত যায় ততই মঙ্গল।' তিনি এসব কায়েমি স্বার্থান্বেষীকে উদ্দেশ করে বলেন, 'তারা ভেবে দেখেছেন কি, এ পন্থায় তারা রোগীর মৃত্যুকাল উপস্থিত ভেবে তাকে গলাটিপে হত্যা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। দেশকে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষাকল্পে এ পরিস্থিতিতে অনতিবিলম্বে প্রথম ফ্লাইটেই প্রেসিডেন্টের উচিত ঢাকায় গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুজিব প্রদত্ত সব শর্ত মেনে নেওয়া। আমি শেখ সাহেবের ঐতিহাসিক বক্তৃতার পর ঢাকা গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকার পরিস্থিতি দেখে এসেছি।'

পাকিস্তানের গত ১০ বছরের রাজনীতির বিস্তারিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দু'বার নিজেই নিজের বিধান লঙ্ঘন করেছেন। এক্ষণে সংকট যেভাবে ঘনীভূত হয়েছে তাতে শেখ মুজিব ব্যতীত অন্য কেউই এ সংকট থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে পারবে না।' পরিশেষে তিনি তার বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর কথার প্রতিধ্বনি করে বলেন, 'দোষ করল লাহোর আর গুলি চলল ঢাকায়।' অপরদিকে ন্যাপ (পিকিংপন্থি) সেক্রেটারি জেনারেল সিআর আসলাম সংবাদপত্রে প্রেরিত এক বিবৃতিতে বলেন, 'কোনো দেশপ্রেমিকই শেখ মুজিব প্রদত্ত শর্তের বিরোধিতা করতে পারে না।' রাজনৈতিক সংকটের জন্য তিনি ভুট্টোকে দায়ী করে বলেন, 'দেশের সংকটের জন্য একচেটিয়া পুঁজিপতি ও আমরাই দায়ী। ভুট্টো ৩ মার্চের অধিবেশনে যোগদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করার কারণেই এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।' জাতীয় লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খান আজ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বৈঠকে মিলিত হন। ময়মনসিংহে এক জনসভায় মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী এদিনও বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, 'পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের মুখে লাথি মেরে শেখ মুজিবুর রহমান যদি বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনে সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হন, তবে ইতিহাসে তিনি কালজয়ী বীররূপে, নেতারূপে অমর হয়ে থাকবেন।' এদিন বিবিসির সংবাদে বলা হয়, 'প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আগামী শনিবার রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে আলাপ-আলোচনার জন্য ঢাকা আসছেন।'

এদিকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মিছিল সহকারে ধানমণ্ডির বাসভবনে আসতে থাকে। সারাদিন এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত সংগ্রামী জনতা বিভিন্ন স্লোগান ধ্বনিতে চারদিক প্রকম্পিত করতে থাকে। এদিন অন্তত দেড় শতাধিক মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে আসে এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। নেতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকারি-আধা সরকারি কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে অফিস-আদালত বর্জন করেন। জনসাধারণ খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দিয়ে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের ক্ষেত্রে নবতর অধ্যায়ের সূচনা করে। যথারীতি আজও সারা ঢাকা শহর স্বাধিকার আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে কালো পতাকার শহরে পরিণত ছিল। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই সরকার প্রদত্ত খেতাব বর্জন শুরু করেন। জাতীয় পরিষদ সদস্য জহিরউদ্দীন তার 'তমঘায়ে হেলাল কায়েদে আজম' খেতাব বর্জনের ঘোষণা দেন। বিশিষ্ট সংবাদ পাঠক সরকার কবীরউদ্দীন রেডিও পাকিস্তান বর্জনের ঘোষণা দেন। এক কথায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশবাসী যে যার অবস্থানে থেকে তাদের অংশগ্রহণ চালিয়ে যেতে থাকে। এক ঘোষণায় স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা কালোবাজারি, মজুদদারি ইত্যাদি অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, 'যারা এসব কার্যকলাপ চালাচ্ছে, তারা স্বাধীনতাবিরোধী গণশত্রু। ধরা পড়লে এদের বিরুদ্ধে কঠিন এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।' এ ছাড়াও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কাছে কোনো প্রকার তেল-জ্বালানি দ্রব্য বিক্রি না করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি ছাত্রনেতারা আহ্বান জানান। এদিন শহীদদের স্মৃতিতে শোক পালনরত দেশবাসীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে দেশের ১৯টি প্রেক্ষাগৃহের মালিক তাদের সিনেমা হলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং বঙ্গবন্ধু ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাহায্য তহবিলে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা দান করেন। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত পেশাজীবীরা, সাংবাদিক সমাজ, চারু ও কারুশিল্পীরা সবাই মিছিল সহকারে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। এদিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, সিএসপি ও ইপিসিএস কর্মকর্তাদের সংগঠন পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম শ্রেণির প্রশাসকরা এক সভায় মিলিত হয়ে বলেন, 'এখন থেকে আমরা জননেতা শেখ মুজিবের সকল নির্দেশ মেনে চলব' এবং এ মর্মে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। গত কয়েক দিনের মতো এদিনও বগুড়ার কারাগার ভেঙে ২৭ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। পুলিশের গুলিবর্ষণে এদিনও একজন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়।

অসহযোগের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধীরা যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে না পারে, সে জন্য গত রাত থেকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যে তৎপরতা শুরু করে, তা সর্বমহলের প্রশংসা অর্জন করে। এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন জায়গায় লুটতরাজ শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সে জন্য রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পথঘাট ও বিপণিকেন্দ্রগুলোর সামনে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কার্যত পুরো দেশে তখন আমাদেরই কর্তৃত্ব বহাল হয়। তখন মানুষ আমাদের প্রতি এত ভালোবাসা, দরদ আর সহানুভূতিসম্পন্ন মনোভাব প্রকাশ করেছে, যা ভাষায় বর্ণনাতীত। আমাদের কর্মসূচি পালনকালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশানুযায়ী আমরা যেমন নিজেদের উজাড় করে দিয়েছি, তেমনি সর্বস্তরের মানুষও আমাদের প্রতি সশ্রদ্ধ মনোভাব প্রকাশ করেছে এবং সব কাজে আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ সাহায্য করেছে। বঙ্গবন্ধু যেমন আমাদের সবাইকে আস্থায় নিয়েছিলেন, আমরাও তেমনি সংগ্রামী জনতার সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশে গিয়েছিলাম। জনসাধারণও আমাদের আপন করে নিয়েছিল। সেদিনকার প্রতিটি দিনই ছিল বৈপ্লবিক। আর এ বিপ্লবের প্রধান সমন্বয়ক তথা সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অসীম ধৈর্যশক্তি আর সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার অপার দক্ষতা তার কাজে পরিপূর্ণতা এনে দিয়েছিল। এ আন্দোলন সংগঠিত করতে তিনি আশপাশের সব দক্ষ ব্যক্তিকেই সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগিয়েছেন। প্রত্যেকের পরামর্শকেই গুরুত্ব ও মনোযোগ সহকারে শুনে, এর পর নিজে বুঝে যাচাই করে নিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি ছিল যৌথতার ভিত্তিতে নেওয়া যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব, তার রাজনৈতিক জীবনে কোনো ভুল ছিল না। আর তাই তো তিনি এই অসহযোগ চলাকালেই জনপ্রিয়তার চরম শিখরে উন্নীত হয়েছিলেন; আসীন হয়েছিলেন বাঙালি জাতির হৃদয়ের মণিকোঠায়।


মন্তব্য