প্রশাসন চলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে

অগ্নিঝরা মার্চ

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৯

প্রশাসন চলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে

  তোফায়েল আহমেদ

১৯৭১-এর রক্তঝরা মার্চের উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আজ চতুর্থ দিবস। সারাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে শান্তিপূর্ণভাবে সর্বাত্মক অসহযোগ পালন করে। গত কয়েক দিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র 'সংগ্রাম পরিষদ' গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে। আমরা নিজেদের উজাড় করে দিয়ে উদয়াস্ত এ কাজেই নিয়োজিত থাকি। কোনো গণশত্রু বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন কোথাও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য আমাদের দলের স্বেচ্ছাসেবকরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজধানীতে নৈশকালীন টহল কার্যক্রম শুরু করে। এতে শান্তি-শৃঙ্খলার অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক যেসব যানবাহন চলার কথা, সেগুলো চলাচল শুরু করে; যেসব বেসরকারি অফিস খোলা থাকার কথা, সেসব খোলা থাকে। যথারীতি সরকারি দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে চলেন। সর্বত্র যা দৃশ্যমান সেটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমগ্র বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে। স্বাধিকারের দাবিতে অটল-অবিচল সব শ্রেণি- পেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছে। ১৯৭১-এর মার্চের এ দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের কর্মচারীরা তাদের সংশ্নিষ্ট বিভাগের অফিস বর্জন করেছেন। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো, অসহযোগ সমর্থনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল; সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা, পেশাজীবীরা, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচির সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। দেশজুড়ে মানুষের মনে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের অবিচল সংগ্রামী মনোভাব বিরাজ করতে থাকে। এদিন বর্ষীয়ান মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে এক জনসভায় সব রাজনৈতিক পক্ষকে উদ্দেশ করে বলেন, 'সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করুন।' অপরদিকে জাতীয় লীগপ্রধান আতাউর রহমান খান সামরিক সরকারের উদ্দেশে এক বিবৃতিতে বলেন, 'এক রাষ্ট্রের জোয়ালে আবদ্ধ না থাকলেও দুটি স্বাধীন ভ্রাতৃরাষ্ট্র হিসেবে আমরা পরস্পরের এবং বিশ্বের এই অংশের সমৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারব।' ন্যাপপ্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। পাঞ্জাব প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব খুরশীদ হক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বাসভবনে বৈঠক করেন। বৈঠকে খুরশীদ হক আগের দিন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার বৈঠকের বিস্তারিত বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। এদিন পশ্চিম পাকিস্তানের কাম্বেলপুর থেকে নির্বাচিত কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা পীর সাইফুদ্দীন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক করেন। বৈঠকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সংকট উত্তরণের উপায় এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভাপতি মিয়া মমতাজ দৌলতানার একটি পত্র বঙ্গবন্ধুর কাছে হস্তান্তর করেন। এদিন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি মি. কে. উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধু তাকে যতদিন খুশি বাংলাদেশে থাকার অনুরোধ করে বলেন, 'পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশে গণহত্যা চালানোর পাঁয়তারা করছে।' এ অবস্থায় মানবতা রক্ষায় তাদের দেশ না ছাড়তে অনুরোধ করেন। এদিকে সদ্য ঢাকা ত্যাগকারী এয়ার মার্শাল আসগর খান করাচি প্রত্যাবর্তন করে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, 'কুর্মিটোলাস্থ ক্যান্টনমেন্ট ব্যতীত অন্য কোথাও পাকিস্তানের পতাকা আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে প্রশাসনের সচিব ও কর্মকর্তারা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করে চলছেন। সরকারের এখন উচিত শেখ সাহেব প্রদত্ত শর্তগুলো মেনে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।'

এদিন হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সব বিভাগের কর্মচারীরা তাদের সংশ্নিষ্ট অফিস-আদালত বর্জন অব্যাহত রাখেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত সময়সূচি অনুযায়ী স্টেট ব্যাংক, বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক, ট্রেজারি অফিসে লেনদেন চলে। বিগত কয়েক দিনের মতো আজও বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ নিহত ও আহতদের সাহায্যার্থে গঠিত ত্রাণ তহবিলে উদার হস্তে অর্থ সাহায্য প্রদান করেন। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃচতুষ্টয় এক বিবৃতিতে সামরিক সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খেতাব, উপাধি বর্জনের আহ্বান জানান। সামরিক বাহিনীর চলাচলের ব্যাপারে জনসাধারণকে সহযোগিতা না করার অনুরোধ করেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ছাত্রনেতারা শর্তারোপ করে বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার পূর্বে ইয়াহিয়া প্রদত্ত ৬ মার্চের বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে।'

বঙ্গবন্ধু নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে বাংলাদেশের জনগণের নামে প্রতিদিন একের পর এক নির্দেশ জারি অব্যাহত রাখেন। এদিন থেকে কিছু বিষয় হরতালের আওতামুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। যেমন, ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক যেসব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক লেনদেন অনুমোদিত হয়েছে, সেগুলো সাপেক্ষে ছুটির দিনসহ নির্দেশিত সময়সূচি অনুযায়ী চলবে। মজুরি ও বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সার্টিফায়েড পে বিলের মাধ্যমে তা করতে হবে। এ ছাড়াও কৃষি তৎপরতা, বন্দর পরিচালনা, ইপিআইডিসি ফ্যাক্টরি পরিচালনা; সাহায্য, পুনর্বাসন ও পল্লী উন্নয়ন কাজ, প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে এজি অফিস আংশিক সময় খোলা রাখা, কারাগারের ওয়ার্ড অফিস খোলা রাখা, আনসারদের দায়িত্ব পালন, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ চালু রাখতে সংশ্নিষ্ট দপ্তর খোলা রাখাসহ সব ইন্স্যুরেন্স অফিস খোলা রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ ছাড়াও তাজউদ্দীন আহমদ চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধুর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অবলোকনের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অতুলনীয় দক্ষ সংগঠক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রতিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণের জন্য পৃথক টিম ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাদের সবার সঙ্গে আলোচনা করে তারপর শীর্ষ নেতারা জাতীয় চার নেতার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হতেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আমার মনে আছে, কখনও কখনও আলোচনার প্রয়োজনে যেতে হতো সহকর্মী বা টিম সদস্যদের বাড়িতে। সঙ্গে থাকতেন জাতীয় চার নেতার কখনও তিনজন বা দু'জন আর আমি। সে সময় ঢাকা শহরে খুব কম মানুষেরই গাড়ি ছিল। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে শুধু বঙ্গবন্ধুরই গাড়ি ছিল। সবাইকে তাদের স্ব-স্ব বাসভবন থেকে তুলে নিতেন বঙ্গবন্ধু। আবার কাজ শেষে প্রত্যেককে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে তবে বাড়ি ফিরতেন। একবার বঙ্গবন্ধু সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন মগবাজারস্থ চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধনাঢ্য এক ব্যক্তির বাড়িতে। বাড়ির নাম মালদা হাউস। সে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন আমাদের প্রিয় মজু ভাই, সৈয়দ মুজতবা আহসান খান। বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের ও প্রিয় একজন মানুষ, দুর্দিনের সহযোগী, পরম শুভানুধ্যায়ী, বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের অনেকেই তার কাছে ঋণী। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। তার বাসায় বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন পাকিস্তানের কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে। সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল হামিদ, জেনারেল মিঠ্‌ঠা। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গিয়ে পাশের একটি কক্ষে অপেক্ষা করছি। আলোচনার এক পর্যায়ে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ÔWhat do you think of me? Do you think that Sheikh Mujib will surrender? No, Sheikh Mujib will give his life but he will not surrender anybody else. পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো আপস প্রস্তাব দিয়েছিল, যাতে উত্তেজিত হয়ে তিনি এ কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন।

অসহযোগ আন্দোলনের এ দিনগুলোতে শুধুই মনে পড়ত '৬৯-এর গণআন্দোলনের কথা। ১৯৬৬ থেকে '৬৯- এই সময়টা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল পর্ব। আমরা চারজন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও আমি আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ভক্সওয়াগন গাড়িতে চেপে রাতের বেলায় পোস্টার, দেয়াল লিখনে বের হতাম। গাড়ির সামনের সিটে আমি, পেছনে অপর তিনজন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুই গাড়ি চালাতেন। চালকের আসনে বসা মঞ্জু সব সময় গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাখতেন। আমরা নিজ হাতে দেয়ালে পোস্টার সাঁটতাম। সেদিন আমাদের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে নেতাকে আমরা কারামুক্ত করেছিলাম; ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত মানব হিসেবে বের করে এনেছিলাম; আজ সেই নেতার নেতৃত্বে ও নির্দেশে স্বাধিকার আন্দোলনে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। নেতার নৈকট্যে থেকে দেখেছি, শিখেছি কী করে কোন প্রক্রিয়ায় জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হয়। কীভাবে একটি সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন সফলভাবে এগিয়ে নিতে হয়। ধানমণ্ডিস্থ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনটি এ সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরের নেতা ও লোকজনে সরগরম থাকত। বঙ্গবন্ধু সবার সঙ্গে কথা বলতেন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক সব বিষয়ে টিম সদস্যদের কাছ থেকে বাস্তবসম্মত পরামর্শ গ্রহণ করে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তবেই তিনি পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আজ যখন স্মৃতির পাতা থেকে সেসব ঘটনা স্মরণ করি শুধু মনে হয়, সবাইকে ঘিরে সূর্যের মতো দেদীপ্যমান এই মহান মানুষটি গভীর সংকটকালেও হাস্যোজ্জ্বল মুখে সবাইকে সময় দিয়েছেন। আন্তরিকভাবে সবার কথা শুনেছেন এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে অগ্রসর হয়েছেন।


মন্তব্য যোগ করুণ