ঊনসত্তরের শপথ দিবস

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ঊনসত্তরের শপথ দিবস

  তোফায়েল আহমেদ

১৯৬৯-এর ৯ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন এবং আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। পল্টনে জীবনের প্রথম জনসভা। এ দিনেই আমরা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দশজন ছাত্রনেতা লাখ লাখ মানুষের সামনে 'জীবনের বিনিময়ে ১১ দফা দাবি আদায়ের শপথ গ্রহণ' করি। ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে 'শপথ দিবস' পালিত হয়। জনসভা তো নয়, যেন বিশাল এক গণমহাসমুদ্র! চারদিক কানায় কানায় পরিপূর্ণ। তিলধারণের ঠাঁই নেই। সেদিনের সুবিশাল পল্টন ময়দান সংগ্রামী জনতাকে ধারণ করতে পারেনি। কাজ বন্ধ রেখে দাবি আদায়ে কারখানার শ্রমিক, মেহনতি কৃষক, নৌকার মাঝি, জেলে, কামার-কুমার-তাঁতি, ছাত্র, অফিসের কেরানি, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী- সবাই জনসভায় ছুটে এসেছে প্রাণের টানে। মানুষ ঠাঁই নিয়েছে স্টেডিয়ামের দোতলা-তিনতলার বারান্দায়, কার্নিশে। যে যেখানে পেরেছে স্থান করে নিয়েছে। গণতরঙ্গে উত্তাল বিশাল সেই জনসভায় আগত জনসাধারণ ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ। তাদের মুখে ছিল স্বাধিকারের দৃপ্ত স্লোগান আর চোখ ছিল দুর্জয় সংকল্পে অটল।

সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যপট এখনও আমার স্মৃতিতে অম্লান। পল্টনের সেই জনসমুদ্রে শিল্পী অজিত রায়ের ভরাট কণ্ঠে যখন গীত হলো, 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা', তখন জনতরঙ্গে যে ঢেউ উঠেছিল তা অভূতপূর্ব। সে দৃশ্য কোনোদিন ভুলবার নয়! সুতরাং এমন একটি দিন, যেদিনে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেদিন ডাকসুর ভিপি হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করার। সেদিনের শপথ দিবসের সভায় দেশের বিভিন্নমুখী সমস্যার উল্লেখ করে, ঐতিহাসিক ১১ দফা ব্যাখ্যা করে, ছাত্রদের রাজনীতি করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে, আইয়ুব খান প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠক প্রশ্নে ছাত্র সমাজের অভিমত ব্যাখ্যা করে দশজন ছাত্রনেতার প্রত্যেকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল, 'অবিলম্বে আইয়ুব খানের পদত্যাগ, বর্তমান শাসনতন্ত্র বাতিল, রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং ১১ দফা দাবির ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ভোটে গণপরিষদ গঠন।'

সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক এবং সভার সভাপতি হিসেবে পিনপতন নীরবতার মধ্যে একটানা ৪৫ মিনিট বক্তৃতা করি। সেদিনের বক্তৃতায় যা বলেছিলাম, দৈনিক ইত্তেফাকের পাতা থেকে তার কিয়দংশ আজ পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি- "এ দেশের যে নেতা জন্মের পর হতে বাংলার মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন, সেই প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। ছাত্র-জনতার দাবি-দাওয়া যদি পূরণ না করা হয়, শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দির যদি মুক্তি দেওয়া না হয়, তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে প্রচণ্ড বিস্টেম্ফারণ ঘটবে।

রাজনীতির অর্থ যদি হয় শ্রমিক-কৃষকের অধিকার নস্যাৎ করা, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা, ছাত্রসমাজ সেই রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কিন্তু রাজনীতির অর্থ যদি হয়, দেশের ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নতুন সমাজ গঠন করা- ছাত্রসমাজ সেই রাজনীতি অবশ্যই করবে। ছাত্রদের ১১ দফা এই দৃষ্টিতেই প্রণীত হয়েছে এবং এই ১১ দফা কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের মুক্তিসনদ। আমরা শিল্পপতি-জমিদারের ছেলে নই, আমরা কৃষক-মজুর-মধ্যবিত্তের সন্তান। আমাদের মাতাপিতার যদি অধিক ট্যাক্স দিতে হয়, তারা যদি পাটের ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে আমাদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছাত্রদের পড়াশোনার সাথে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিচ্ছিন্ন নয়।"

বক্তৃতার শেষে সমবেত জনতার তুমুল গর্জনের সঙ্গে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান তুলি, 'শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মাগো তোমায় মুক্ত করবো।'

'৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণআন্দোলন সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত করে ৯ ফেব্রুয়ারি এক মোহনায় শামিল করেছিল। ভাবতে আজ কত ভালো লাগে, ঐতিহাসিক শপথ দিবসের এই সেল্গাগানের দুটি লক্ষ্যই সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছি। সোনার বাংলার ৩৯ জন সোনার সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে '৬৯-এর ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্ত করেছি। আর '৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ৬ দফা ও ১১ দফার পক্ষে গণরায় নিয়ে, '৭১-এর মহত্তর মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষাধিক মানুষের সুমহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে সেদিনের সেই শপথবাক্যের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করেছি।

সেদিন পল্টনের জনসভা শেষে সংগ্রামী ছাত্র-জনতার বিক্ষুব্ধ মিছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় আমরা তৎক্ষণাৎ সেখানে যাই এবং বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে শান্ত করে ইকবাল হলে (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ফিরিয়ে আনি। স্বৈরশাসকের শত উস্কানি সত্ত্বেও আমরা নৈরাজ্যের পথে যাইনি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলন করেছি। নিজেদের মধ্যে মত ও পথের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেদিন ১১ দফা দাবি আদায়ের প্রশ্নে ছিলাম ঐক্যবদ্ধ। দলীয় আদর্শ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে মতদ্বৈধতা থাকলেও আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক ছিল চমৎকার। এক টেবিলে বসেই আহার করতাম। বিপদে-আপদে একে অপরের খবর নিতাম এবং হৃদ্যতাপূর্ণ এই সম্পর্কই ছিল আমাদের আন্দোলনের ভিত্তি।

'৬৯-এর গণআন্দোলনে আমাদের সংগ্রামী ভূমিকা, কর্মসূচি পালনে নিষ্ঠা, সততা ও জনদরদি আবেদন মানুষের হৃদয়ে এতটাই সাড়া জাগিয়েছিল যে, বাংলার মানুষ আমাদের মাথায় তুলে নিয়েছিল। ৯ ফেব্রুয়ারির শপথ দিবসের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ডাক-এর (ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি) মিটিংয়ে সভাপতি হিসেবে নূরুল আমীনের নাম প্রস্তাব করা হলে সংগ্রামী জনতা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে আমাকে মঞ্চে তুলে নিয়েছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হককে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন আন্দোলন চরম উচ্চতায় উঠেছিল; ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হলে বাংলার মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে সংগ্রামী ছাত্রসমাজ ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়ার পর ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের স্বৈরশাসক তথাকথিত লৌহমানব আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

আজ যখন ইতিহাসের সেই গৌরবোজ্জ্বল ৯ ফেব্রুয়ারি 'শপথ দিবস'-এর সোনালি দিনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন ফেলে আসা সংগ্রামী দিনগুলোর জ্যোতির্ময় বৈপ্লবিক বহিঃপ্রকাশ, অনন্যসাধারণ মনে হয়! সংগ্রামমুখর সেই দিনগুলোর কথা এবার আরও বেশি করে মনে পড়ে। মনে পড়ার অনেক কারণ আছে। মনে হয়, আমরা বেঁচে আছি ঠিকই। কিন্তু আমাদের জীবনে এই দিনগুলোই ছিল শ্রেষ্ঠতম সময়। প্রতিনিয়তই ভাবি, একদিন আমিও চলে যাব। কিন্তু রয়ে যাবে আমাদের এসব ঐতিহাসিক কীর্তি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই সৌভাগ্যবান। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপজেলা ভোলার অবহেলিত গাঁয়ের সন্তান আমি। সেই ছোট্টবেলায় কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি। পায়ে হেঁটে স্কুলে গিয়েছি। সেই অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে এসে আজ জাতীয় রাজনীতির যে পর্যায়ে আমার অধিষ্ঠান, তা সম্ভব হয়েছে কেবলই গণমানুষের অপার ভালোবাসায়। সেই '৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছি; '৭২-এ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব; আবার '৭৫-এ বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হলে আমাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী করেছেন। '৯৬-এ বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব লাভ করলে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেছেন। ২০০৯-এ জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি। এরপর ২০১৩-তে নির্বাচনকালীন সরকারে শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে, ২০১৪-এর বিজয়ের পর বিগত পাঁচ বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছি। এবারের সর্বশেষ নির্বাচনে অষ্টমবারের মতো জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি। জীবনে যা প্রাপ্য তার সবই পেয়েছি।

যতদিন বেঁচে আছি স্মৃতির পাতায় ভেসে থাকবে '৬৯-এর অগ্নিঝরা উত্তাল সেই দিনগুলো। যে দিনগুলো আমার মতো একজন অখ্যাত মানুষকে সারা বাংলার মানুষের কাছে পরিচিত করেছিল। পরম করুণাময়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, আমি যেন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শেষজীবন ত্যাগ করতে পারি।

আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য

tofailahmed69@gmail.com


মন্তব্য