আমাদের জাতিরাষ্ট্র সব শ্রেণির জন্য

ভাষার মাস

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আমাদের জাতিরাষ্ট্র সব শ্রেণির জন্য

  কবীর আনোয়ার

বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে আমাদের জাতিসত্তার নবজাগরণ হয়েছিল বলা চলে। প্রায় সব সমাজের ও সব শ্রেণির মানুষের তাতে অংশগ্রহণ ছিল। তাই তার শক্তিও ছিল অপরিসীম। ঔপনিবেশিক এবং সাম্রাজ্যবাদী অশুভ শক্তির শোষণ, নিপীড়ন ও বঞ্চনা আমাদের সংক্ষুব্ধ করেছিল। ইংরেজ কোম্পানি অতঃপর ব্রিটিশ শাসনামলে জমির খাজনা ও নাগরিক করের জন্য অত্যাচার এবং নির্যাতন হয়েছে গরিব কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর। এরপর পাকিস্তানি সামরিক ও পাঞ্জাবি আধিপত্যবাদের ধর্মীয় এবং জাতীয় বড়াই আমাদের জন্য তৈরি করেছিল বিশাল এক বৈষম্য ও বঞ্চনার ইতিহাস। যেমন ছিল সামন্ত প্রভু ও সেই সঙ্গে জমিদারদের অবর্ণনীয় নির্যাতন। সব মিলিয়ে কয়েকশ' বছরের আন্দোলন সংগঠিত হয়ে আসছিল বাংলার গরিব কৃষক ও নিম্নশ্রেণির মানুষের মধ্যে। আমাদের পরিচয় ছিল বাঙালি মুসলমান ও প্রান্তিক জনমানুষ অর্থাৎ কৃষক।

সুতরাং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকেই আমরা বুঝতে শিখেছি ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে আমরা বাঙালি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আমাদের যে রক্তদান তা সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করেছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেক তরুণ, কিশোর আমাদের এই মহান ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। এসব তরুণের বেশিরভাগ এসেছিল নিম্নবিত্ত, খেটে খাওয়া পরিবার থেকে। কিন্তু তারা জীবন দিয়ে আমাদের জাতিসত্তাকে সচেতন করে গেছে। ভাষাকে কেন্দ্র করে আমাদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি সাধিত হয়েছে- এ কথা অনস্বীকার্য। আমাদের বাংলা ভাষা প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে গতি পেয়েছে এবং জাতিসত্তার অভ্যন্তরে গতি ও শক্তি বৃদ্ধি করেছে। শত বছরের বাঙালির মুক্তি আন্দোলন এক শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে শেষ পর্যন্ত তা আমাদের ভাষাভিত্তিক আন্দোলন এবং পর্যায়ক্রমে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটেছে। শুরু হয়েছিল সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানিদের সীমাহীন শোষণ ও বঞ্চনার প্রথম চিত্রটি বাঙালি জনমানুষের সামনে প্রথম তুলে ধরলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তৎকালীন বাংলার মুসলমান কৃষকদের প্রথম সচেতন বাঙালি জাতিতে রূপান্তরের এক অভূতপূর্ব জাগরণও সৃষ্টি করলেন তিনি। তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম স্থপতি বলা চলে তাকে। সামরিক শাসক ও পাঞ্জাবিদের মিলিত উদ্যোগ তাকে বারবার কারাবন্দি করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দমেননি। যখনই সুযোগ পেয়েছেন জনসভা করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ করেছেন। তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন 'সোনার বাংলা শ্মশান কেন।' শেষ পর্যন্ত সমগ্র বাঙালি জাতি তার নেতৃত্বের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল এবং শুরু হয়ে গেল মহান মুক্তিযুদ্ধ। লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে ও অবর্ণনীয় নারী ও শিশু নির্যাতনের জাঁতাকলে পড়ে জীবন ধ্বংস হয়ে গেল কতজনের। বঙ্গবন্ধুকেও হত্যার জন্য কারাবন্দি করা হলো। কিন্তু দেশ স্বাধীন করার মহামন্ত্রে দীক্ষিত দেশের তরুণ-যুবা ও রাজনৈতিক দলগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল স্বাধীনতা যুদ্ধে।

একাত্তরে প্রাণ দিয়ে মহান মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের শত বছরের বাঙালি কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের প্রেরণা তাদের সৃজনধর্মী কর্মে ভাষা ও জাতিসত্তাকে শক্তিশালী করে তুলেছিল আগে থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের এক শীর্ষ পর্যায়ে এসে শিক্ষিত সচেতন মানুষসহ নিরক্ষর প্রান্তিক কৃষকও হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। তারই ফলে আমরা পেলাম এই মহান স্বাধীনতা। স্বাধীন সার্বভৌম দেশের কৃষক ও শ্রমিকরাও গর্বভরে আজ তাকিয়ে দেখে আমাদের জাতীয় পতাকা। কান পেতে শোনে জাতীয় সঙ্গীত 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।' আমাদের স্বাদেশিকতার শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে অপরিমেয় শক্তি অর্জন করল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক জীবনেই আমাদের মাতৃভাষাকে স্বয়ম্ভর করে গিয়েছিলেন। সেই জন্য তার কাব্যে, উপন্যাসে, সঙ্গীতে, নাটকে এবং বিশ্বসাহিত্য থেকে অকাতরে গ্রহণ-বর্জন করে তা বিশ্বজনীন করে গিয়েছিলেন। আমরা জানি, সমাজ পরিবর্তনে ভাষাকে গতিশীল হতে হয়। রবীন্দ্রনাথ জানতেন ইতিহাস সমাজকে কোন প্রান্তে নিয়ে উপনীত করবে। তা নির্ভর করে আছে ভাষার মাধ্যমে সমাজ নিজে কীভাবে উন্মোচিত হবে তার ওপর। ইতিহাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই বাংলা ভাষা গঠনের আদল পাল্টে দিয়েছেন। আমাদের বাংলা ভাষাকে আন্দোলন-সংগ্রামে যোগ্য করতে তার কাব্যে, গল্প-উপন্যাসে, নাটক-প্রবন্ধে এবং সর্বোপরি সঙ্গীতে আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের উপযোগী করে গিয়েছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছিলেন আমাদের জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং উদার ও অসাম্প্রদায়িক হতে। তিনি ছিলেন সার্থক সাম্যতন্ত্রের উদ্গাতা। তিনি সামান্য কুলি-মজুরের জন্য যেমন দুঃখবোধ করেছেন, তেমনি আমাদের সমাজের নারীর অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। লিখে গেছেন তার অজস্র অমর কাব্য। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কঠোর বিরোধিতা করেছেন আজীবন। যার পরিণতিতে তার ছয়-ছয়টি গ্রন্থ ও সংবাদপত্র ইংরেজ কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল এবং এই বিদ্রোহী কবিকে তারা নিক্ষেপ করেছিল কারাগারে। এরপর কবি নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলিম বন্দিদের নিয়ে কারাগারের অন্তরালেই গড়ে তুলেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। সে কারণেই চতুর ইংরেজ সরকার তাকে একের পর এক দেশের বিভিন্ন স্থানে চারটি কারাগারে বদলি করেছিল। কিন্তু কবি নজরুলকে শেষ পর্যন্ত দমাতে পারেনি। কারাগারের ভেতর সব রাজবন্দিকে নিয়ে একত্রে গেয়েছিলেন কারাগারের লৌহকপাট ভাঙার গান। করেছেন অনশন ধর্মঘট। তখনকার হিন্দু-মুসলিম বাঙালি নেতারা নজরুলের নিঃশর্ত মুক্তির জন্য কলকাতায় জনসভা করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাকে অনশন ভাঙার জন্য টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। সে জন্যই বলা হয় আমাদের সংগ্রাম আন্দোলনের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি গৌরবের এক অনন্য-অসাধারণ পর্ব। সেই সময় অগণিত জাতীয় ও বামধারার নেতাকর্মীরাও জীবনদান করেছেন এই আন্দোলনে। আজ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, জীবনানন্দ দাশ ও শামসুর রাহমানই শুধু নয়, ভাষাকে আধুনিক, ক্ষুরধার ও গতিশীল করতে অবদান রেখেছেন শত শত লেখক, শিল্পী ও সাহিত্যিকরা। অথচ সেই ভাষাভিত্তিক আমাদের এই জাতিসত্তা যা গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক হওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত যা কিছু অর্জিত হয়েছে, তাতে সর্ব শ্রেণির মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ আজও খোলসা হয়নি। আজও আমাদের রয়ে গেছে কোটি কোটি বেকার অসহায় জনগোষ্ঠী। সমাজের শুধু এলিট ও উচ্চবিত্তের স্বার্থেই আজও ব্যবহূত হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সুফল। দেশের শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের আশায় আশায় আজ ৪৭টি বছর কাটিয়ে দিয়েছে তারা। আর কত দিন!

আত্মকেন্দ্রিকতায় লীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের জাতিসত্তা তথা স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। হাজার বছরের যে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আমাদের মহাপুরুষরা রেখে গেছেন; মুক্তিযুদ্ধের জীবনদানকারীরা যে কারণে আত্মোৎসর্গ করেছেন, তার অনুসরণে আমরা সব শ্রেণির জন্য একটি মানবিক সমাজ ও জাতিরাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি।

লেখক ও চলচ্চিত্রকার


মন্তব্য