দৃষ্টি এখন নতুন মন্ত্রিসভায়

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯

দৃষ্টি এখন নতুন মন্ত্রিসভায়

  ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

সাধারণত নির্বাচনের পর সবাই উন্মুখ হয়ে থাকেন পরবর্তী চমক দেখার জন্য। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্বাধীন বাংলাদেশে ইতিহাস তৈরি করল। এখন সবার দৃষ্টি এখন নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। কে হবেন কাঙ্ক্ষিত মন্ত্রী, এর আকার হবে কেমন, কারা বাদ পড়ছেন বা নতুন কারা আসছেন- দেশের গুরুত্বপূর্ণ সচিবালয় থেকে মাঠ পর্যায়, সর্বত্রই এ নিয়ে চলছে গুঞ্জন। দেশে বড় মেগা কিছু প্রজেক্ট এসেছে। তাই মনে হচ্ছে, আগের চেয়ে সামান্য বড় হতে পারে মন্ত্রিপরিষদ। সবকিছুই নির্ভর করছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর। তার মেধা, বিচার-বিবেচনা সবসময়ই প্রশংসার দাবি রাখে। ধরেই নেওয়া হচ্ছে, অতীতের মতো এবারও ডায়নামিক, দক্ষ, যোগ্য, জনপ্রিয়, ত্যাগীরাই এগিয়ে থাকবেন। শেখ হাসিনার কাছে জনগণের যে চাওয়া, প্রত্যাশা, তার বাস্তব প্রভাব পড়বে এই মন্ত্রিপরিষদের মাধ্যমে। তাই জনগণ অধীর আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে নৌকার মাঝির দিকে। তাদের বিশ্বাস, ওয়াদা পূরণে শেখ হাসিনার বিকল্প এ দেশে কেউ নেই। শোনা যাচ্ছে, এবার মন্ত্রিসভায় কয়েকজন নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। নতুন-পুরনো সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু করবেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার প্রধান লক্ষ্য, সরকারকে দল থেকে আলাদা করে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত, সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ গড়ার। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার এক সপ্তাহ পর ১২ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল ৪৮ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা।

৩০ ডিসেম্বর নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে ইতিহাস সৃষ্টি করল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। কেননা, এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ দেখেনি আগে। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিল, ছিনিয়ে এনেছিল চূড়ান্ত বিজয়। বন্যাসহ চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল তখন। আজ ৪৮ বছর পর ২০১৮ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেল তারই প্রতিচ্ছবি। এ জয় নিয়ে সমালোচকদের কানাঘুষা থাকলেও বাস্তব উপযোগিতা নেই বিন্দুমাত্র। এখন হিসাবটা সামনে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে। মহাজোটের কাঁধে এখন বিশাল দায়িত্ব। মানুষ বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে মহাজোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। নানা শ্রেণির, নানা বয়সের বিভিন্ন পেশার ছোট-বড় অসংখ্য স্বপ্নের প্রতিফলন এবারের নির্বাচন। গত দুই-এক মাস ধরে টেলিভিশন, পত্রিকায় দেখেছি ড. কামাল হোসেনের সরব উপস্থিতি। বিএনপির মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করছেন তিনি। মাঝেমধ্যে মান্না, রব, সুলতান মনসুরসহ অনেকেই বজ্রবাক্য ছুড়ছেন। তাদের কথায় আমার মতো ষাটোর্ধ্ব নাগরিক ভড়কে যান। কেননা, '৯১-এর নির্বাচনে এভাবে সরব দেখেছিলাম তাদের। কিন্তু বিএনপির এ হাল তো হওয়ার কথা নয়। কেন নেতাহীন, অভিভাবকহীন আজ বিএনপি! কোথায় হারাল এক সময়কার মিছিল কাঁপানো, মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো নেতারা! সবাই সবার মতো আখের গুছিয়ে তেপান্তর তারা। বিএনপির এ দৈন্যদশার জন্য দায়ী কে? কেনই-বা সার্কাস পার্টিগুলো এসে ভর করছে বিএনপির কাঁধে। যারা একসময় বিএনপির কট্টর সমালোচক ছিলেন, তারা কেন আবার বিএনপির মুখপাত্র হয়েছেন! মানছি, এটা একটা রাজনৈতিক কৌশল; কিন্তু বিএনপির এত ভগ্নদশা তো এ দেশের জনগণ চিন্তাও করেনি। বিএনপির এ দুরবস্থার জন্য একমাত্র দায়ী দলটির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলটির প্রধান খালেদা জিয়াকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তারেক রহমান। তার নিয়ন্ত্রণহীন, বেপরোয়া জীবনযাপনে ক্ষুব্ধ সবাই। এ ছাড়াও দলের ভেতরে ভাঙন, সিনিয়রদের অবমূল্যায়ন, সীমাহীন দুর্নীতি, নমিনেশন বিক্রি, ঘুষ, অস্ত্রের চোরাচালানসহ নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক নেতিবাচক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারেক। বিএনপির ঝাণ্ডা নিয়ে মাঠ চষে বেড়ানো সৎ, ভদ্র নেতা ফখরুল ইসলামের মতো অনেকেই তখন জায়গা পাননি তারেক রহমানের অঘোষিত কেবিনেটে। আজ দলটির একজন জেলে, অন্যজন পলাতক। নির্বাচনে আসার আগে বিএনপির অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। আগে বুঝতে হবে, এ দেশের মানুষ অপশাসন, অন্যায় কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। শেষ পর্যন্ত ৩০ ডিসেম্বর জনগণ তাদের বয়কট করে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল।

বিএনপির ঠিক বিপরীত চিত্রটি দেখা যাক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার ৬ বছর পর প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সামরিক জান্তার জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার পরও হাল ছাড়েননি তিনি। জীবন বাজি আর কণ্টকময় সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে স্বৈরাচারের হাত থেকে গণতন্ত্র উদ্ধার করেন। ১৯৯১ সালে সূক্ষ্ণ কারচুপি, ভুয়া ভোটার লিস্ট ও নানা চক্রান্তের কারণে ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়েও লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর বিএনপি সরকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে চালিয়ে যায় আন্দোলন। ১৯৯৬-এর নির্বাচনে পরাজিত হয় বিএনপি। ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই রচিত হয় সুবর্ণ এক অধ্যায়ের। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটা ছিল প্রথম জয়। এরপর ২০০১ সালের লতিফ-সাহাবুদ্দীন-সায়েদ গং পরিচালিত নির্বাচনে নীলনকশার মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় আসে একাত্তরের পরাজিত শক্তি বিএনপি-জামায়াত। দেশে নেমে আসে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মঙ্গার প্রকোপ, চুরি, লুণ্ঠন আর বোমাবাজির রাজনীতি। গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪টি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়। পরম করুণাময়ের অশেষ দয়ায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে বেঁচে থাকে লাখো প্রাণের স্বপ্ন। ২০০৮ সালের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা। আওয়ামী লীগ প্রায় ২৩০টি আসন, বিপরীতে বিএনপি-জামায়াত জোট পায় ৩০টি আসন। এরপর শেখ হাসিনা দেশকে নিয়ে যান অনন্য এক উচ্চতায়, যা ছিল জাতির জন্য কল্পনাতীত। দেশজ সম্পদ, মাথাপিছু আয়, শিল্প-কৃষি ও সেবা খাতের উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মহাকাশ বিজয়, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সমুদ্রজয়, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, ছিটমহল সমস্যা, যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিশ্বে রোল মডেল হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত সারাদেশে মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতি শুরু করে। জনগণের মনে ভয়. আতঙ্ক জন্ম দিয়ে জয়ী হতে চেয়েছিল জোট। কিন্তু এ দেশের মানুষ তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। জোটের নেতারা পাবলিক সেন্টিমেন্ট বুঝতে পেরে আর অংশ নেননি নির্বাচনে। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুনরূপে শুরু হয় উন্নয়নের কাজ। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশাল এক অর্জন পায় মহাজোট। যার ফলে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা দেশের জনগণকে আরও বেশি আস্থাশীল করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি। গ্রামগুলোতে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, তরুণদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় আগামীর স্বপ্নে ভাসিয়েছে জনতাকে। সুশাসনের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোরতর হতে হবে। সন্ত্রাস, মাদকদ্রব্য নির্মূল ও রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধাবাদীরা যেন জনগণের ভরসায় চির ধরাতে না পারে। দলের ত্যাগী, প্রকৃত কর্মীরা যেন নিরাশ না হয়, সেদিকে তীক্ষষ্ট দৃষ্টি রাখতে হবে। বিপুল ভোটের মাধ্যমে জনগণের যে আমানত শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিল, তার সঠিক প্রয়োগ যেন হয়। সরকার পরিচালনায় সেদিকে সংশ্নিষ্ট সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে একটি বিশেষ টিম গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তা সমাধানের ব্যবস্থা করবেন। গত সেপ্টেম্বরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে জরুরি সেবা প্রদানের চিন্তাটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও সময়োপযোগী। ত্বরিত ফলাফল ও দোরগোড়ায় সেবা পেতে এ ধরনের আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে জনগণকে। তাদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তা সমাধান বা পরিত্রাণের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাঙালি স্বপ্নবান জাতি, তাদের স্বপ্নের কাণ্ডারি এখন শেখ হাসিনা। তাই সব আবদার, প্রত্যাশা শেখ হাসিনাকে ঘিরেই।

শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি বিশ্নেষক


মন্তব্য যোগ করুণ