'... উন্নয়নে একশ'তে একশ'

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০১৯

'... উন্নয়নে একশ'তে একশ'

  ড. শেখ আবদুস সালাম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর একই দিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। ইশতেহার ঘোষণার কয়েক দিন পর আমার এলাকার দু'জন রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি অফিসে এসেছিলেন। তারা দু'জন ভালো বন্ধু এবং উভয়কে যথেষ্ট রাজনীতিসচেতন মানুষ বলে মনে হয়েছিল। একজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক, অন্যজন বিএনপির। চা খেতে খেতে তাদের সঙ্গে আলাপ করে আমার মনে হয়েছে, দু'জনেরই দেশ-বিদেশের রাজনীতি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রয়েছে। ভিন্ন রাজনীতির সমর্থক হয়েও তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক যুক্তি, পাল্টা-যুক্তি দেখিয়ে নিজ নিজ অবস্থানকে জাস্টিফাই করার বিষয়টি আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছিল। এই দু'জনের মতো আমাদের দেশটিতে রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সামগ্রিক একটা সামাজিক সহঅবস্থান তৈরি করা এবং একের সঙ্গে অন্যের এ ধরনের সুসম্পর্ক তৈরি করা গেলে সত্যিই সেটা ভালো হতো। আমার অফিসে অবস্থানকালে ওই দুই বন্ধু তর্ক-বিতর্কের সময় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির রাজনৈতিক অতীত, বিভিন্ন সময়ে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠান এবং দেশ পরিচালনা সবকিছুই তারা নিজ নিজ পক্ষে টেনে তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। তা আমার কাছে ছিল যথেষ্ট উপভোগ্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শুরু হয় নতুন দেশটির যাত্রা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পরিচিতি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে শাসনতন্ত্র রচনার মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের মধ্যে একটি দল, একটি মানুষ তার জনগণকে  একটি বিশ্বময় দেশ উপহার দিয়ে গেছেন এবং বিশ্বের প্রায় সব ফোরামে বাংলাদেশের পরিচিতি ও অংশীদারিত্ব দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। সেই দল এবং দলের অবিসংবাদিত নেতাকে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে  জনগণকে এই অল্প কয়েক দিনে এর চেয়ে বেশি দেওয়ার আর কী থাকতে পারে? বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবরণের পর খন্দকার মোশতাক হয়ে দেশ শাসনের ভার নিজ হাতে তুলে নেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি ক্ষমতায়  থেকে গড়ে তোলেন জাগদল; জাগদল থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সময় পরিক্রমায় জেনারেল জিয়ার মৃত্যু এবং ক্ষমতার পালাবদলে জেনারেল এরশাদের প্রায় ৯ বছরের সামরিক শাসনকাল পেরিয়ে ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের  মধ্য দিয়ে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় চলে আসে  বিএনপি। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি তাদের শাসনকালে এ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়। মাগুরার উপনির্বাচন সেই উদাহরণ হিসেবে মানুষের মুখে মুখে আজও উচ্চারিত। বলা যায়, সেই একটি কারণে বিএনপি ১৯৯৬ সালে এসে ক্ষমতা হারায়। ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়ে ১৯৭৫-এর পর দীর্ঘ ২১ বছরের মাথায়  বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় যথেষ্ট ইতিবাচক উপাদান থাকলেও শুধু নেতিবাচক ও অসত্য প্রচারণা আর বিএনপি-জামায়াতের অশুভ আঁতাতের কারণে ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হারাতে হয়। সেদিন শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা হারানো নয়; নির্বাচনের পরদিন থেকে সারাদেশের মানুষকে প্রত্যক্ষ করতে হয় এক ভয়াবহ তাণ্ডব। এ সময়ে এসে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতাকারীদের গাড়িতে তুলে দেয় আমাদের লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। বিএনপি সরাসরি তাদের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার বানায়। দুঃখিনী বাংলাদেশের শাসনভার যেন চলে যায় পাকিস্তানি ভাবধারার সেসব মানুষের হাতে। এর পর থেকে জঙ্গিবাদ, সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে গ্রেনেড নিক্ষেপ, ট্রাকভর্তি অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, ২১ আগস্টের মতো ঘটনা ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তথা দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে ধ্বংস করে দেওয়ার উদ্যোগ প্রভৃতি ঘটনা দেশের ওপর এক অন্ধকার কালো ছায়ার বিস্তার ঘটিয়ে ফেলে। এই চরম পরিস্থিতির এক ধরনের আপাত সমাপ্তি ঘটে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনার  মধ্য দিয়ে। এর দুই বছর পর আবার দেশে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ব্যাপক বিজয় হয় আওয়ামী লীগের।

সেদিন আমার সামনে বসা দু'জনের হাতে ছিল তাদের সমর্থিত দুই দলের নির্বাচনী ইশতেহার। এটা সত্য যে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ফোকাস ছিল উন্নয়ন আর বিএনপির ইশতেহারে ফোকাস ছিল রাজনীতি। সন্দেহ নেই, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে এই দেশটিকে বিশ্বময় পরিচিত করে দিয়ে গেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১০ বছরে তা সমুদ্রে আর আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বলা হয়, বঙ্গবন্ধুর বিশ্বময় বাংলাদেশ আজ সমুদ্রময়, আকাশময়। বাংলাদেশের সীমানা আজ তাই স্থলে-অন্তরীক্ষে, সমুদ্র থেকে আকাশে বিস্তৃত। গত কয়েক বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া। এর মধ্য দিয়ে এ দেশের ১৬ কোটি মানুষকে তিনি আজ তাদের এক স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে আশাবাদী করে তুলেছেন। মাত্র কয়েক বছর আগে প্রায় অর্ধেক সময় ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে অন্ধকারে থাকা দেশটিতে ইতিমধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়া, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নিজস্ব তহবিল থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ জোগান, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে স্থল ও সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, প্রতি বছর মাধ্যমিক পর্যায়ে সব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে তিন কোটির বেশি বই বিতরণ, কৃষকের জন্য কৃষিকার্ড ও এক কোটির বেশি কৃষকের ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, সারাদেশে প্রায় ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, মাথাপিছু আয় ১৭৫১ ডলারে উন্নীতকরণ, গার্মেন্ট খাতের বিকাশ, বাংলাদেশকে অর্থনীতির হট স্পটে পরিণত করার উদ্যোগ, মেট্রোরেল-ফ্লাইওভার ইত্যাদি মেগা প্রকল্প গ্রহণ, পদ্মা সেতু দৃশ্যমান, মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ড শুধু প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় নেতৃত্ব আর তার নিঃসন্দেহ দেশপ্রেমের কারণেই সম্ভব হয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ আজ এ কথা স্বীকার করে। মাত্র কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থান কোথায় ছিল এবং বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ কোথায় অবস্থান করছে, তা আন্দাজ করার জন্য আমি কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমার একটি লেখায় ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর তারিখে একই পত্রিকায় ড. আতিউর রহমানের 'বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়াবার জয়যাত্রা' লেখাটি পড়ে দেখার জন্য পাঠকদের অনুরোধ জানিয়েছিলাম।

আমার সামনে বসা আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্যক্তির হাতে সেদিন আমার ওই লেখাটির একটি কপি ছিল। দুই বন্ধুর বিতর্ককালে তিনি আমার সেই লেখাটি থেকেও উদ্ৃব্দতি দিচ্ছিলেন। এই তর্ক-বিতর্ক বা আলোচনাকালে বিএনপি সমর্থক ভদ্রলোক যা বলতে চেয়েছিলেন, তার সত্যতা বা যুক্তি আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষ একেবারে খণ্ডন করতে বা উড়িয়ে দিতেও পারেননি। এই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি, গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত স্কুল-কলেজে সর্বত্র নিয়োগ বাণিজ্য, বড় বড় প্রকল্পের ডিজাইন পরিবর্তন এবং সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি ঘটানো, সর্বত্র আর্থিক সুযোগ-সুবিধার উৎসগুলো সংসদ সদস্যের আত্মীয়-স্বজন এবং বেছে বেছে নির্দিষ্ট কিছু দলীয় লোকের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা, পুলিশ-আমলাদের ওপর নির্ভর করে দেশ চালানো, কমবেশি সর্বত্র দলীয় হস্তক্ষেপ প্রভৃতি ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বিএনপি সমর্থক ভদ্রলোকের যুক্তি।

এক পর্যায়ে বিএনপি সমর্থক ব্যক্তি যখন তার প্রতিপক্ষ বন্ধুকে বলছিলেন, তোমরা তো আমাদের ইলেকশন করতেই দিচ্ছ না; কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। তখন অন্যজন জবাব দিলেন, তোমরা ২০০১ এবং ২০১৪ ও '১৫ সালে  যা করেছ, তার পর থেকে তোমাদের নিজেদেরই কোনো লেভেল নেই। এসব কথা  ভুলে নির্বাচনে নেমে নিজেদের জনপ্রিয়তা  যাচাই করো। তাদের তর্কের একটা ভালো দিক দেখেছি, তারা একে অপরকে দোষারোপ করছেন ঠিকই; কিন্তু কখনও মাত্রা ছাড়িয়ে যাননি। জাতীয়ভাবে এমনটি করা গেলে খুবই ভালো হতো। তর্কের মধ্যে আমার একটি কথা খুবই ভালো লেগেছে। এক পর্যায়ে যিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক তিনি বলছেন, ভাই আমরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায়, এ জন্য শাসন পরিচালনায় একটু-আধটু গড়বড় হয়তো হয়েছে। তবে দেশের উন্নয়নের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকার বা আমাদের নেত্রী কিন্তু পারফেক্ট; একশ'তে একশ'। এই নির্বাচন সামনে রেখে আমরা শেখ হাসিনার উন্নয়ন ইমেজ নিয়েই তোমাদের ডুবিয়ে দেব। তিনি ভারতের একটি রাজনৈতিক উদাহরণ টেনে বললেন, একবার ভারতে রাজীব গান্ধীর সময় তার সরকারের ওপর আরোপিত দুর্নীতি আর চুরির ব্যাপারে আওয়াজ উঠেছিল- 'সারা ভারতমে শোর হ্যায়, রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়।' ফলে রাজীব গান্ধীর দল সেই জাতীয় নির্বাচনে হেরে গিয়েছিল। তোমরা যতই বলো, জাতির সামনে আমাদের দল ও নেত্রীকে সেই রকম কোনো চোর সাজাতে বা এ রকম কোনো আওয়াজ তুলতে পারনি। আমরা বরং নির্বাচনের সময় জাতির সামনে বলব- 'সারা বাংলাদেশে আওয়াজ হ্যায়, শেখ হাসিনাই উন্নয়নের নেতা হ্যায়।' এবার উন্নয়ন দিয়েই তোমাদের মাঠছাড়া করে দেব। সুশাসন, জবাবদিহির বিষয়গুলো আবারও ক্ষমতায় এলে দেখা যাবে।

আমি সেদিন দু'জনের তর্ক-বিতর্ক সত্যিই উপভোগ করেছি। আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও অভাবিত বিজয় নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। আমরা আশা করছি, এবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে তারা যেন বাংলাদেশের শাসন পরিচালনায় সুশাসনের বিষয়টি এজেন্ডার একেবারে সামনে নিয়ে আসে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশেরই জয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও এবার সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন। সমৃদ্ধ আর সম্ভাবনার বাংলাদেশে যেন এমনটিই ঘটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক

skasalam@gmail.com


মন্তব্য