মানুষের মতো বাঁচতে চাই

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯

মানুষের মতো বাঁচতে চাই

  রহমান মৃধা

বলতে গেলে ৯০ শতাংশের বেশি লোকই এই সরকারের কাজকর্মে খুশি। তাহলে কেন ধর্মঘট, লুটপাট, অবৈধ কাজকর্ম? কারা এসব করে? এরা কোথায় বা এরা কখন দেশ থেকে পালাল, তাও ঠিক ইলেকশনের আগের মুহূর্তে? অবাক! বাংলাদেশ অবাক করেছে আমাকে? নাকি আমার ভাবনায় যা আমাকে এই মুহূর্তে লিখতে বাধ্য করছে তা হলো, ১৯৭১ সালে বাংলার স্বাধীনতার সঙ্গে জন্ম নিয়েছে শাসন, শোষণ আর ভাষণের। হোক না সে বিএনপি, হোক না সে মৌলবীবাদী, হোক না সে জাতীয় পার্টি, হোক না সে আওয়ামী লীগ, হোক না সে স্বতন্ত্র পার্টি, হোক না সে ধান্দাবাজ- উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। পার্থক্য রয়েছে শুধু একটি। তা হলো, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার শাসন, শোষণ ও ভাষণের পুরো ১০০ শতাংশ সুযোগ পেয়েছে বিধায় এবারের ইলেকশনে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকার স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতায় রয়েছে পুরো ইলেকশনের সময় বিধায়, যা তারা শোষণ করেছে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তার বেশিরভাগ অংশ; কিন্তু দেশের সরকারি কর্মচারীদের ভাগ-বণ্টন করে দিয়েছে, যার কারণে পুরো প্রশাসন বর্তমান সরকারকে ১০০ শতাংশ সাহায্য করেছে এবারের ইলেকশনে জয়লাভ করতে। বাংলার সরকারি কর্মচারীরা বেইমান নয়। এরা যার নুন খায় তার গুণও গায়। বাংলাদেশে ভাষণ সবাই দিতে পারে, তবে শোনার লোকগুলো কিন্তু আওয়ামী লীগের মিটিংয়ে বেশি ছিল। তাদের সব মিটিংয়ে হাজারো লোকের ভিড় দেখা গেছে। কারণ শাসিত সরকারের এমপি, মন্ত্রী তারাই তো তখন ভাষণ দিয়েছে। তাই পাবলিক মনের আনন্দে দলে দলে এসেছে চা-কফির সঙ্গে কিছু বিস্কুট নিশ্চয় ছিল বা পান-বিড়ি বা সিগারেটের অভাবও নিশ্চয় ছিল না। সব মিলে ইতি ঘটেছে গণতন্ত্রের, আগামী পাঁচ বছরের জন্য।

আমি গত এক বছর ধরে ভাষণ নয়, শাসন নয়, শোষণও নয়; তবে লিখেছি, বারবার লিখেছি সুশিক্ষাই আনতে পারে পরিবর্তন, অন্য কিছুতে দেশের পরিবর্তন আসবে না। ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে শুধু নিজেকেই সংগ্রাম করতে হবে, অন্য কেউ তা গড়ে দেবে না। জনগণের কোনো ক্ষমতা কোনোদিনই ছিল না, এখনও নেই। বিশেষ করে গরিব দেশে। ক্ষমতা তাদের কাছে, যারা দেশের দায়িত্বে রয়েছে। যারা সরকারি চাকরিতে ক্ষমতাসীন তারা। এদের সংখ্যা বেশি নয়; তবে এদের ক্ষমতা অনেক বেশি একটি গরিব দেশে। জনগণের ভোটের অধিকার আছে ঠিকই; কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা ভোট দিতেই পারেনি। কারণ জনগণের যে অস্ত্রের প্রয়োজন, তা নেই। তাদের নেই ভালো শিক্ষা, তাদের নেই সুশিক্ষা, তাদের নেই অর্থনৈতিক বা সামাজিক সচেতনতা। তাই তাদের গণতন্ত্রের অধিকার নেই, বিশেষ করে দরিদ্র দেশের মানুষের জন্য। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। আমাদের এই সমস্যার পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। তবে একটি জিনিস বিশেষ কারণ, যা আমার মনে ধরেছে তা হলো, লক্ষ্য করেছি বাংলার মানুষ ফুটবল খেলে শয়নে-স্বপনে আর তা দেখে নিশি জাগরণে নয়ন ভরে চার বছর পরপর। আর একটি কাজ করে তা হলো, দেশপ্রেমিক হয়ে দেশের জন্য জীবন দেয় শয়নে-স্বপনে এবং জাগরণে পাঁচ বছর পরপর যখন ইলেকশনের সময় আসে। বিশ্বকাপ খেলা শেষে ভুলে যায় তারা যেমন বিশ্বকাপ ফুটবলকে, ঠিক একইভাবে রাজনীতির ইলেকশনের কথাও তারা ভুলে যায় ইলেকশনের পরদিন। শুধু রাজনীতিবিদরা এই ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে হয়তো হবে ৫ শতাংশ, যারা দেশের সাধারণ জনগণকে ব্যবহার করে তাদের জীবনের সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে চলেছে, যেমনটি করেছিল ব্রিটিশ, পাকিস্তান।

কী করা যেতে পারে এর থেকে রেহাই পেতে হলে, তা কি ভাবার সময় এখনও হয়নি? নাকি কেউ আমার মতো করে এই অপ্রিয় সত্যকে তুলে ধরেনি এর আগে; তাই কেউ ভাবতে শুরু করেনি? যেটাই হোক না কেন আমার প্রশ্ন- জাতি কি তাহলে দেশের রিয়েল পরিবর্তন আনতে চায় বা নিজেও পরিবর্তন হতে চাই? জীবন চলার পথ শতটা থাকতে পারে; তবে জাতিকে বেছে নিতে হবে একটা। আমি মনে করি, মানুষের মতো বেঁচে থাকার সহজ-সরল পথ একটাই তা হলো, নতুন প্রজন্মকে আর দেরি নয় আজ থেকেই শপথ করতে হবে সুশিক্ষা গ্রহণ করে বিদেশে বা দেশের বড় বড় সুযোগ নিতে হবে এবং নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে হবে। তখন দেশের পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমি নিজে বাংলাদেশের অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের ছেলে। এইসএসসি পাস করে দেশ ছেড়ে কঠিন নয় মোটামুটি পরিশ্রম করে গড়েছি নিজের জীবন। যে জীবনে রয়েছে স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সফলতা, যখন যা খুশি (ভালো) করতে পারা, মনের ভাব প্রকাশ করা, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভ্রমণ করা। সবই করা সম্ভব। কারণ একটিই, তা হলো সুশিক্ষা, যা যতই বিক্রি করছি ততই তার মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার জীবন চর্চা করলে মনে পড়ে যাবে ছোটবেলার সেই গানের কথা- 'আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে-/ নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?' ভাবতে অবাক লাগারই কথা!

তাই দেশের নতুন প্রজন্মকে বলতে চাই, আর প্রজা নয়; রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখ এবং তা বাস্তবায়ন করতে শুরু কর। অন্ধকার হয়েছে যখন মনে রেখো আলো আসবেই। প্রশ্ন- কত ঘণ্টা পরে? ইলেকট্রিক আলো নেই জীবনে? যেমন মামা-চাচা নেই? চাঁদের আলো ব্যবহার কর; তাও কি মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে? দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে দীপ জ্বালো। তাও যদি না থাকে অপেক্ষা কর, তবু বসে থেকো না। শুনেছি, চোরে শোনে না ধর্মের কাহিনী। তাই ধর্মের নয় বলি কিছু নিজের জীবনের কর্মের কাহিনী।

বিদেশে থেকেও দেশকে ভালোবাসা সম্ভব, যার প্রমাণ আমি নিজে। মনে রেখো, মুখের থুথু ফেলছ যখন, তখন তা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে না। যারা দরিদ্র মানুষকে সামান্য সাহায্য করে, তাদের শোষণ করে, তাদের ঘৃণা কর। দুর্নীতিকে ঘৃণা কর। অন্যায়কে ঘৃণা কর। যারা রাষ্ট্রে কর্মরত অথচ শোষণ করছে. তাদেরকে ঘৃণা কর। মানবতা ও মনুষ্যত্বকে ভালোবাসো। জয় তোমাদের হবেই। জন্ম যখন হয়েছে মানুষের ঘরে; দূরে সরে দানবের মতো হয়ে বেঁচে থেকো না। নতুন বছরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও এমন প্রত্যাশায়।

দূর প্রবাস সুইডেন থেকে
Rahman.Mridha@gmail.com


মন্তব্য

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ