জাপানে বিদেশি শ্রমিক

অর্থনীতি

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯

জাপানে বিদেশি শ্রমিক

  মো. মোতাহের হোসেন

জাপান একটানা কয়েকশ' বছর ধরে বহির্বিশ্ব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে সিলগালা করে রেখেছিল। জাপানিরা অন্য দেশে গিয়ে কাহিনী করলেও পৃথিবীর কোনো দেশের লোক এ দেশে ঢুকতে পারত না। ইউরোপীয় বণিক ও মিশনারিরা শত চেষ্টার পরও জাপানে ঢুকতে পারে না। আমেরিকান নাবিক কমডোর ম্যাথু প্যারি প্রথমবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। জাপানে ঢুকতে পারেন না। কিন্তু বলে যায়, আমি আবার আসব। শেষে ১৮৫৪ সালে দ্বিতীয়বার জাপানে আসেন। ১০টি জাহাজের চিমনি দিয়ে কয়লার কালো ধোঁয়া ও কামানের নল দিয়ে আগুন বের করে বলেন, খিড়কি খোল, না হলে খাইছি। শেষে বাধ্য হয়ে জাপান আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে সই করে। কিন্তু জাপানিদের মানসিকতার কখনোই পরিবর্তন হয়নি। সেদিন পর্যন্ত বিদেশিদের নন-জাপানি ছাড়া ভিনদেশি বলত না। বিদেশিদের বালা-মসিবত মনে করত। এখন সেই জাপানই কিনা পার্লমেন্টে আইন পাস করে বিদেশ থেকে লোক আনছে। বলছে, ইচ্ছা করলে তোমরা এই সুন্দর দেশটিতে স্থায়ীভাবে থাকতে পার।

জাপান পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপূর্ণ দেশ। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ দেশে অনেক লোক মারা যায়। বছরে প্রায় ৩০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে। স্পর্শকাতর কিছু বিষয় ও বয়সজনিত কারণে মৃত্যু তো আছেই। অনেক বছর ধরে এই অবস্থা চলছে। ফলে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যাও দ্রুত কমে যাচ্ছে জাপানে।

ইদানীং জাপানকে বলা হয় গ্রে (ধূসর) সোসাইটির দেশ। অর্থাৎ শিশু ও যুবকের চেয়ে বয়সী লোকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। কর্মক্ষম লোকের অভাবে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানেও এর প্রভার পড়ছে মারাত্মকভাবে। ছেলেমেয়ে না থাকার কারণে জাপানে কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দুই লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন তেল শোধনাগার বন্ধ করে দেওয়া হয়; কারণ ওই একই। জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং গ্রে সোসাইটিতে তেলের চাহিদা কম। বিশ্বাস না হলেও সত্য যে, জাপানে রোগীর অভাবে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শতাব্দীর শেষ দিকে গিয়ে জাপানের জনসংখ্যা অর্ধেক অর্থাৎ ছয় কোটিতে এসে ঠেকবে। এই হলো জাপানের আংশিক ভেতরকার সমস্যা। জাপানের বাইরের সমস্যাগুলোকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কাজেই অন্য দেশ থেকে লোক আনা ছাড়া জাপানের সার্বিক অবস্থান নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

জাপানের পার্লামেন্টে নতুন করে এক আইন পাস হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে জাপানে তিন লাখ ৪৫ হাজার ১৫০ জন বিদেশি শ্রমিক আনবে এ দেশে। সংবাদটি বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় আসছে এবং টেলিভিশন সংবাদেও নাকি বলা হয়েছে জাপানে বিদেশি শ্রমিক আনার কথা।

পার্লামেন্টে এ আইন নতুন হলেও গত দুই দশক আগে থেকেই বিভিন্ন কাজের আওতায় জাপানে প্রচুর বিদেশি ঢুকছে ও ঢুকবে। যে সুযোগ বাংলাদেশ নিতে পারেনি। প্রথমে জাপান বিশেষ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০০০ সাল নাগাদ এক লাখ বিদেশি ছাত্রছাত্রীকে এ দেশে আসা ও পড়ালেখার সুযোগ দেয়। কিছুদিন পরই ২০২০ সালের মধ্যে এই ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তিন লাখে ধার্য করে। কিন্তু এই সংখ্যা যে ছাড়িয়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। একই সঙ্গে ২০২০ সাল নাগাদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্রছাত্রী ও পেশাজীবী লোক আসার মধ্য দিয়ে জাপানের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ বিদেশিদের দিয়ে পূরণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সংখ্যা দিন দিনই বাড়তে থাকবে এবং শেষে কত শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়, তা কেউ বলতে পারছে না।

এটা ঠিক যে, মধ্যপ্রাচ্য, ইতালি বা মালয়েশিয়ার মতো হবে না। বিদেশ থেকে লোক আনার ব্যাপারে জাপান নানা রকম কৌশল অবলম্বন করবে। শক্ত নীতিমালা থাকবে। কাউকে অসম্মান করা বা কোনো অধিকার খর্ব হবে না। বাইরের দেশ থেকে লোক আনার ব্যাপারে জাপান প্রথম পর্যায়ে ৮টি দেশ বেছে নিতে চাইছে। ইতিমধ্যে ৭টি দেশ বেছে নিয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে- মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও চীন। বাকি আর একটি কোন দেশ হবে, তা এখনও নির্ধারণ করেনি। পছন্দমতো আর একটি দেশ নেওয়া নির্ভর করছে মূলত কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর।

জাপানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এ ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা যারা দীর্ঘদিন জাপানে বসবাস করি, তাদের অনেকের ধারণা, মাসুদ বিন মোমেন, যিনি এর আগে জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। এ সময় জাপানে (রাষ্ট্রদূত) থাকলে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই এই ৭টি দেশের মধ্যে জায়গা করে নিত। কোন রাষ্ট্রদূত কেমন, কী কাজ করেন, কার সময় দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা হয়, অগ্রগতি লাভ করে, প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন- এসব জানা কঠিন কিছু নয়। সরকার চাইলে এ তথ্য সহজেই জানা সম্ভব।

এখানে একটি অপ্রাসঙ্গিক কথা না বলে পারছি না। বাংলাদেশ একটা স্বজনপ্রীতির দেশ। আমি এটাকে মোটেও খারাপভাবে দেখি না। কারণ, বিপদে-আপদে, ভালোমন্দে আত্মীয়-স্বজন পাশে না দাঁড়ালে, স্বজনপ্রীতি না দেখালে অন্যের কী দায় পড়েছে এসব দেখানো। আমি নিজেও স্বজনপ্রীতি দেখাই। কাউকে জাপানে আনার ব্যাপারে প্রথমেই আমার আত্মীয়-স্বজনকে বেশি গুরুত্ব দিই। কিন্তু কথা হচ্ছে, বিদেশি মিশন বা দূতাবাসে চাকরি দেওয়ার ব্যাপারে এটা ঠিক নয়। দেশের স্বার্থ ও স্বজনদের কথা ভেবে ভিন্ন কোনো দেশ, যেমন নেপাল, ভুটান, ফিলিপাইন- এসব দেশে পাঠালে ভালো হয়। কাজকর্ম কম থাকায় স্বজনরাও এসব দেশে গিয়ে ভালো থাকবেন। কিন্তু জাপানসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেশ আছে, যেখানে কাউকে পাঠানোর সময় কে কী পারে, না পারে কর্তৃপক্ষের একটু ভেবে দেখা দরকার।

আগেই বলেছি, বৃদ্ধ লোকের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে জাপানে বড় ধরনের এক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। দেখাশোনার লোক নেই। বৃদ্ধদের নিয়ে আগামীতে এ সমস্যা বাড়তেই থাকবে। কাজেই বাইরের দেশ থেকে শ্রমিক আনার ব্যাপারে নার্সিং কেয়ারের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে জাপান সরকার। আগামী ৫ বছরে ১৪ রকম পেশায় তিন লাখ ৪৫ হাজার ১৫০ জন শ্রমিকের মধ্যে ৬০ হাজারই আনবে নার্সিং কেয়ারের জন্য। গত কয়েক বছর ধরে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ জাপানে নার্সিং কেয়ারে লোক পাঠানোর জন্য জোর তৎপরতা চালিয়েও কোনো দেশ ভালো করতে পারছে না। আমি নিজে দীর্ঘদিন ধরে জাপানে একাধিক এনপিওতে (নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন) কাজ করছি। বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আমার কাজ। আমি জানি, নার্সিং কেয়ারে কাজ করতে হলে ধৈর্য থাকা, আন্তরিক হওয়া ও ভালো জাপানি ভাষা জানা দরকার। আমার বিশ্বাস, বাঙালিরা দক্ষতার সঙ্গে সব কাজ করতে পারবেন। কারণ, এমন কোনো কাজ নেই যা বাঙালিরা চ্যালেঞ্জ করলে পারে না এবং ইতিমধ্যে জাপানসহ দেশ-বিদেশে আমরা সেটা প্রমাণ করেছি।

আর একটা বিষয় হলো, জাপান থেকে ভিসার কাগজ বের হওয়ার পর ঢাকার জাপান দূতাবাস থেকে ভিসা নিতে হয়। তখন বেশ কিছু জটিলতা দেখা দেয়। যেমন- আমরা জানি, জাপানসহ পৃথিবীর সব দেশেই পারিবারিক নামই সবার (পরিবারের) ধারাবাহিক পরিচয় বহন করে। কিন্তু পারিবারিক নাম যেমন- মোল্লা, বিশ্বাস, খান- এসব নাম থাকা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এর খুব ব্যবহার হয়। দেখা যায়, বাপের নাম গোলাম মওলা অথচ ছেলের নাম আবুল হাসান। এখানে পারিবারিক নাম তো নেই-ই, কোনো মিলও নেই। দূতাবাস তো দূরের কথা, এ রকম কেন হয়, সেটা আমরাই বুঝি না। আবার গ্রামের অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ীর বৈধ আয় আছে, টাকাপয়সা আছে। কিন্তু টিন (ট্যাক্স) সার্টিফিকেট নেই। টিন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয় না বা গুরুত্ব বোঝে না। এখন ছাত্র বা অন্য কোনো চাকরি নিয়ে জাপানে আসতে চাইলে সব যোগ্যতা থাকার পর এই পারিবারিক নাম ও টিন সার্টিফিকেটের জন্য অনেকেই ঝামেলায় পড়ে যান। বিষয়টা বিবেচনায় রাখা দরকার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকেই জাপান বাংলাদেশের পাশে আছে। ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়। বৃদ্ধ জাপানিদের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরেক পরিচয় হচ্ছে 'রহমান সান নো মুসুমে (মি, রহমানের মেয়ে)'। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ অস্থায়ী সদস্য পদে প্রার্থী হয়। একই পদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল থেকে জাপানও প্রার্থী ছিল। পরে শেখ হাসিনা সরকার জাপানকে সমর্থন করে (জাতিসংঘের অস্থায়ী সদস্য পদ থেকে) প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়। নির্বাচন হলে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ, মুসলিম দেশগুলো ও চীনের সমর্থনে বাংলাদেশ জিতে যেত। জাপানের পত্রপত্রিকা তেমনটিই ইঙ্গিত দিয়েছিল। আগেও একবার সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে জাপানকে হারিয়ে বাংলাদেশ জিতে গিয়েছিল। সমুদ্রসীমা ও কিছু দ্বীপের মালিকানা নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকা, দেশ-বিদেশে আধিপত্য বিস্তার ও বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের চরম টানাপড়েনের মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও জাপানকে সমর্থন দেওয়া ছিল শেখ হাসিনা সরকারের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জাপানের জনগণ ও সরকার এসব মনে রাখে। কাজেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জাপানে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আসতে না পারলে আমরা চরমভাবে ব্যর্থ হবো। বাংলাদেশ থেকে প্রচুর লোক জাপানে আসলে আমাদের কমিউনিটি আরও বড় হবে। বাংলাদেশ বিমান আবার নারিতা-ঢাকা ফ্লাইট চালু করবে। পরিবার-পরিজনসহ আবার ট্রানজিট ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে দেশে যেতে চাই।

জাপান প্রবাসী
hm.motahar@yahoo.com


মন্তব্য