রূপান্তরমূলক অভিযোজন পরিকল্পনা চাই

জলবায়ু পরিবর্তন

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

রূপান্তরমূলক অভিযোজন পরিকল্পনা চাই

  কামরুল ইসলাম চৌধুরী

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপদাহ বাড়ছে। শৈত্যপ্রবাহ বাড়ছে। জল ও বায়ুচক্রে টালমাটাল পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে। সাগর-মহাসাগর উত্তপ্ত হচ্ছে, লোনা জল উপকূলে ঢুকছে। ঋতুচক্রে পরিবর্তন খোলা চোখে দেখা যাচ্ছে। তবুও বিজ্ঞানীদের সতর্কবাণী উপেক্ষা করে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ পুঁজিবাদী ভোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন আসছে না। কার্বন নিঃসরণ কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে। ১৯৯২ সালের গৃহীত জাতিসংঘ জলবায়ু সনদ শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোর অনেকেই মানছে না। ফলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ঘন ঘন আঘাত হানছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে। জলবায়ুর অভিঘাতে জাতীয় আয়ের দুই-তিন শতাংশ ফি বছর তলিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু উদ্বাস্তুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। ২০১৯ সালের নতুন বছরের সূচনায় এসে দেখছি, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো (এসডিজি) অর্জনে সামনে রয়েছে মাত্র ১১ বছর। মনে রাখতে হবে, এসডিজির ১৭টি অভীষ্টের ১৩ নম্বর লক্ষ্য হলো জলবায়ু। প্যারিস চুক্তির অধীনে অভিযোজন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন লক্ষ্য অর্জনের পথেও রয়েছে কেবল সামনের ১১ বছর।

প্রশ্ন হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কী হবে? এটি কীভাবে স্বাভাবিক উন্নয়ন থেকে ভিন্ন? মনে রাখা দরকার, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোজন এখনও সঠিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন। অভিযোজন বিজ্ঞান এ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অভিযোজনের তিনটি পর্যায় চিহ্নিত করেছে। প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রতিকূল প্রভাবগুলো মূল্যায়ন এবং যাচাই করা, আমরা এমন কিছু করছি কিনা- যা আমাদের সেই প্রভাবগুলোর জন্য আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করে তুলছে। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের নিজেদের আরও ঝুঁকির সম্মুখীন করার অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ভালো হয় যদি আমরা প্লাবন ভূমিতে ভবন নির্মাণ করতে পারি।

আমরা এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছি। তাই আমাদের এখন দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগুলোতে বিনিয়োগ; যেমন সেতু, রাস্তা, বিমানবন্দর ও নৌবন্দরগুলোর বিষয় বিবেচনা করতে হবে। যাতে সেগুলো ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-সহিষুষ্ণ হয়। এখন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে সব বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। অভিযোজনের তৃতীয় পর্যায়টিকে রূপান্তরমূলক অভিযোজন বলা হয়, যা এখনও কিছুটা তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে। এখনও তেমন কোনো ভালো নজির নেই। কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোর ঝুঁকি মোকাবেলা নয় বরং অভিযোজন ব্যবস্থার ভালো ফল লাভের জন্যও এটি প্রযোজ্য।

জাতিসংঘ জলবায়ু সনদের অধীনে স্বল্পোন্নত ৪৯টি দেশের শীর্ষ অভিযোজন নেগোসিয়েটর হিসেবে আমি বাংলাদেশসহ এসব দেশে জাতীয় অভিযোজন কর্মপরিকল্পনা (নাপা) প্রণয়নের দাবি তুলেছি। বাংলাদেশ ২০০৫ সালে নাপা প্রণয়ন করে। স্বল্পোন্নত সব দেশ নাপা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে। জাতিসংঘ জলবায়ু সনদে নেগোসিয়েশনে; এরপর নাপার ওপর ভিত্তি করে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (নাপা) প্রণয়নের দাবি তুলি। নেপালসহ বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে এ পরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়নে যাচ্ছে। বাংলাদেশও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার পথনকশা ২০১৫ সালে তৈরি করে। সেই পথনকশার একজন প্রণেতা হিসেবে এবং জাতিসংঘ অভিযোজন কমিটির সাবেক সদস্য হিসেবে বলতে পারি, অবিলম্বে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করা দরকার। জনঅংশগ্রহণের ভিত্তিতে এ দলিলটি তৈরি করা প্রয়োজন। তাহলেই আগামী দশকে রূপান্তরমূলক অভিযোজন গ্রহণ করে বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তন-সহিষুষ্ণ দেশ হয়ে উঠতে সক্ষম হবে। প্রকৃতই রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অভিযোজনকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।

প্রথম শিক্ষাটি হচ্ছে, সত্যিকারের রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের জন্য এক দশক বা তারও বেশি সময় লাগবে। অতএব, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ এ ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযুক্ত হবে না। বৈশ্বিক তহবিল যেমন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) ব্যবহারের জন্য এটি একটি সমস্যা, যা শুধু প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে। তারা যদি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় রূপান্তরমূলক অভিযোজন কর্মসূচিতে সহায়তা দিতে চায়, তাহলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচিতে অর্থায়ন করতে হবে। দ্বিতীয় শিক্ষাটি হচ্ছে, সরকার ও সরকারের বাইরে, বিশেষ করে বেসরকারি খাতসহ সংশ্নিষ্ট সব অংশীদারকে সম্পৃক্ত করা। অর্থাৎ কেবল সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে সরে আসা। প্রকৃত রূপান্তরমূলক যে কোনো পরিবর্তনে অবশ্যই প্রতিটি দেশের সংশ্নিষ্ট সব অংশীদারকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের মাত্রা হতে হবে দেশজুড়ে, কেবল কোনো ছোট অঞ্চলে বা খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাই এসব দেশে শুধু জাতীয় পর্যায়ে রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা করতে হবে, মোটেও খাত পর্যায়ে নয়। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় অনুষ্ঠিত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জন এবং জলবায়ু-সহিষুষ্ণতা অর্জনের মাধ্যমে এলডিসি অবস্থান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আমরা ২০০৮ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) তৈরি করি। ২০০৯ সালে তা সংশোধিত হয়। বাংলাদেশ প্রথম দেশ, যে এটি করেছে। দশ বছর পর এখন এটি জনঅংশগ্রহণের ভিত্তিতে হালনাগাদ করা প্রয়োজন। এ দলিলের অন্যতম প্রণেতা হিসেবে এটি আমার দাবি। তা হলে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনার একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দেখতে পাবে। এটির মেয়াদ এখন ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন। সব জাতীয় পরিকল্পনা মূলধারায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিতে হবে। এতে বাংলাদেশকে জলবায়ু-সহিষুষ্ণ দেশে পরিণত করার জন্য, রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এসডিজিগুলোর সঙ্গে ডেল্টা প্ল্যান এবং দেশের অষ্টম ও নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনকে সংযুক্ত করে সমগ্র সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা দরকার। ব-দ্বীপ পরিকল্পনাটিকেও জনমতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করা দরকার।

রূপান্তরমূলক অভিযোজন কেমন হতে পারে তার একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। উপকূলবর্তী জেলাগুলোর লাখ লাখ মানুষকে অনিবার্য স্থানচ্যুতির বিষয়টি বিবেচনা ও প্রস্তুতির জন্য, আমাদের উপকূল থেকে দূরে একডজন শহরে বিনিয়োগ করতে হবে। যাতে এগুলো জলবায়ু-সহিষুষ্ণ এবং অভিবাসী-বন্ধুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে, কমপক্ষে এক লাখ অভিবাসীকে স্থান দিতে পারে। উপকূলীয় এলাকার অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে হবে এবং দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে তারা তাদের পিতামাতার মতো কৃষক হওয়া ও মাছ ধরার পরিবর্তে শহরগুলোতে ভালো বেতনে কাজ করতে পারে।

এই কৌশল রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমাবে। এই মহানগরী আগামী দশকে আরও এক কোটি জলবায়ু অভিবাসীকে স্থান দিতে পারবে না। এটি বাংলাদেশকে রূপান্তরমূলক অভিযোজনের উদাহরণ হিসেবে আমাদের সব তরুণ ও ভবিষ্যতের নাগরিকদের অভিযোজন সক্ষমতা তৈরির কথাও বলে। বাংলাদেশ নিজস্ব বাজেটে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল এবং বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ও কয়েকটি দেশসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় জলবায়ু রেসিলিয়েন্ট ফান্ড তৈরি করেছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করার জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড, এলডিসি ফান্ড এবং বৈশ্বিক তহবিল থেকে অর্থায়ন পাওয়ার জন্য অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচিগুলো প্রণয়ন ও পরিচালনার জন্য দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরি করা  জরুরি প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে শুরু করা প্রয়োজন ধ্রুপদী গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যক্রম।

এভাবেই বাংলাদেশ ২০১৯ সালে পরিচিতিমূলক বিবরণ পাল্টাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি থেকে বাংলাদেশ রূপান্তরমূলক অভিযোজন অর্জনের মাধ্যমে সর্বাধিক সহিষুষ্ণ দেশে রূপান্তরিত হতে পারে। বাংলাদেশ তাহলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো অর্জনে সামনের কাতারের দেশে রূপান্তরিত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক
ফোরামের চেয়ারম্যান
quamrul2030@gmail.com


মন্তব্য