মর্নিং শোজ দ্য ডে ...

নতুন মন্ত্রিসভা

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

মর্নিং শোজ দ্য ডে ...

  ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

দিনটি কেমন যাবে, তা সকাল দেখেই অনুমান করা যায়। হ্যাঁ, গত মঙ্গলবার থেকে কথাটি বারবার মনে আসছে। কারণ নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে সব নবীন-প্রবীণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের এক গাড়িতে করে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে এবং টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে গেলেন, তা সত্যিই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এ দেশে। আরেকটি বিষয়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তিনি কীভাবে দেবেন তার একটি নমুনা দেখালেন মাত্র। এক ছাতার তলায় সবাইকে একত্র করে, তারপর এগিয়ে যাবেন দেশ পরিচালনা ও উন্নয়নের পথে। ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, সবার কর্মকাণ্ড ও অগ্রগতি মনিটরিং করা হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আশাকে দারুণভাবে স্পর্শ করেছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এত দীর্ঘ সময় ধরে দেশ পরিচালনার ইতিহাস শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বেও বিরল। আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সবাই উন্মুখ হয়েছিলেন পরবর্তী চমক দেখার জন্য। এতদিন সবার দৃষ্টি ছিল নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। কে হবেন কাঙ্ক্ষিত মন্ত্রী, এর আকার হবে কেমন, কারা বাদ পড়ছেন বা নতুন কারা আসছেন- দেশের গুরুত্বপূর্ণ সচিবালয় থেকে মাঠ পর্যায়, সর্বত্রই এ নিয়ে ছিল গুঞ্জন। দেশে বড় বড় মেগা কিছু প্রজেক্ট এসেছে। তাই ধরে নেওয়া হয়েছিল, আগের চেয়ে সামান্য বড় হতে পারে মন্ত্রিপরিষদ। সবকিছুই নির্ভর করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর। তার মেধা, বিচার-বিবেচনা সবসময়ই প্রশংসার দাবি রাখে। সোমবার দেশবাসী দেখল সে চমক। একঝাঁক নতুন মন্ত্রী নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের মন্ত্রিসভা। যাদের সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অর্থমন্ত্রী একজন পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট (এফসিএ), আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক। একজন আর্কিটেক্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। একজন শিক্ষিকার সন্তান-চিকিৎসাশাস্ত্রের মেধাবী শিক্ষার্থী এবারের শিক্ষামন্ত্রী। একজন কৃষিবিদ এখন কৃষিমন্ত্রী। পেশাদার কূটনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সাবেক আমলা পরিকল্পনামন্ত্রী। নারায়ণগঞ্জের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী। দলের প্রচার সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী। কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা ধান-চাল ব্যবসায়ী আজ খাদ্যমন্ত্রী। আইটি বিশেষজ্ঞ ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী। একজন অসমতল অঞ্চলের (পাহাড়ি) মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কমন্ত্রী। একজন কোরআনের হাফেজ আজ ধর্মপ্রতিমন্ত্রী। শ্রমিক নেত্রী শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী। ডাক্তার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। রানা প্লাজায় হাসপাতালের দুয়ার খুলে দেওয়া ডা. এনাম দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী। শিক্ষা উপমন্ত্রী একজন গবেষক। তারা সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজগুলো অতীতেও করে এসেছেন। এদের বেশিরভাগই ইয়ং, ডেডিকেটেড, এনারজেটিক ও পরিশ্রমী। প্রায় সবারই ব্যাকগ্রাউন্ড প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে চুলচেরা বিশ্নেষণ ও মূল্যায়ন করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

আমরা দারুণভাবে আশাবাদী নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে। বাংলাদেশকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে নতুন মন্ত্রিসভা তার মেধা, শ্রম আর সততার স্বাক্ষর রাখবেন, এ প্রত্যাশা সবার। যেহেতু আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন ও বিশাল দল, তাই সবার সমান মূল্যায়ন করাটা দুরূহ। নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি ও মেধার পরিচয় দিতে এ সিদ্ধান্ত যুগোপযোগী মনে হয়েছে আমার কাছে। প্রবীণরা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে শক্ত স্তম্ভ গড়েছেন গত দশ বছরে; এবার নবীনরা উপসংহার টানবেন। ধাপে ধাপে তৈরি হচ্ছে নেতৃত্ব, সিদ্ধ হবেন অভিজ্ঞতায়। সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী তো বটবৃক্ষের মতো সবাইকে আগলে রেখেছেন। আমি বিজ্ঞানের শিক্ষক। তাই শিক্ষা ও প্রযুক্তিবিজ্ঞানের দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত হয়, তা নিয়ে প্রচণ্ডভাবে উন্মুখ হয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি আশ্বস্ত হলাম। এখন আত্মবিশ্বাসী। বুকের ছাতিটা বড় হয়ে গেল। ইয়াফেস ওসমান ও ডা. দীপু মনি দু'জনই দারুণ প্রফেশনাল। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে এবং মানসম্পন্ন আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গড়তে তারা অগ্রদূত হয়ে থাকবেন। আর তরুণ নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান সুশিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষা বিষয়ক উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আছেন সঙ্গে।

বঙ্গবন্ধুকন্যার মেধা, বিচার-বিবেচনা সবসময়ই প্রশংসার দাবি রাখে। ধরে নিয়েছিলাম, অতীতের মতো এবারও ডায়নামিক, দক্ষ, যোগ্য, জনপ্রিয়, ত্যাগীরাই এগিয়ে থাকবেন। শেখ হাসিনার কাছে জনগণের যে চাওয়া, প্রত্যাশা, তার বাস্তব প্রভাব পড়বে এই মন্ত্রিপরিষদের মাধ্যমে। তাই জনগণ অধীর আগ্রহ নিয়ে চেয়েছিলেন নৌকার মাঝির দিকে। তাদের বিশ্বাস, ওয়াদা পূরণে শেখ হাসিনার বিকল্প এ দেশে কেউ নেই। নতুন-পুরনো সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু করবেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার প্রধান লক্ষ্য, সরকারকে দল থেকে আলাদা করে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত, সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ গড়ার। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার এক সপ্তাহ পর ১২ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল ৪৮ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা দেশের জনগণকে আরও বেশি আস্থাশীল করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি। গ্রামগুলোতে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, তরুণদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় আগামীর স্বপ্নে ভাসিয়েছে জনতাকে। আমাদের বন্ধু, সুহৃদ, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হলো। সবার চাওয়া একটিই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে আগে। সুশাসনের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোরতর হতে হবে। সন্ত্রাস, মাদকদ্রব্য নির্মূল ও রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধাবাদীরা যেন জনগণের ভরসায় চির ধরাতে না পারে। দলের ত্যাগী, প্রকৃত কর্মীরা যেন নিরাশ না হয়, সেদিকে তীক্ষষ্ট দৃষ্টি রাখতে হবে।

বিপুল ভোটের মাধ্যমে জনগণের যে আমানত শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিল, তার সঠিক প্রয়োগ যেন হয়। সরকার পরিচালনায় সেদিকে সংশ্নিষ্ট সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে একটি বিশেষ টিম গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তা সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। গত সেপ্টেম্বরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে জরুরি সেবা প্রদানের চিন্তাটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক, সময়োপযোগী। ত্বরিত ফলাফল ও দোরগোড়ায় সেবা পেতে এ ধরনের আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হবে জনগণকে। তাদের অভিযোগগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তা সমাধান বা পরিত্রাণের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে দায়িত্বশীল ভূমিকাই সবার কাম্য। স্বচ্ছতা, সুনিশ্চিত জবাবদিহির মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আপনার নির্বাচিত মন্ত্রী জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে। কারণ, অতীতে আপনার সিলেকশন বিস্মিত করেছে সবাইকে।

বাঙালি স্বপ্নবান জাতি, তাদের স্বপ্নের কাণ্ডারি এখন শেখ হাসিনা। তাই সব আবদার, প্রত্যাশা শেখ হাসিনাকে ঘিরেই। এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আপনাকে নিয়ে যাবে মহাকালের চূড়ায়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন আপনি করবেন, তা উপলব্ধি করতে পারছি। কারণ মর্নিং শোজ দ্য ডে...।

শিক্ষাবিদ ও রাজনীতি বিশ্নেষক


মন্তব্য যোগ করুণ