বিজয়ের পূর্ণতার এই দিনে

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯

বিজয়ের পূর্ণতার এই দিনে

  তোফায়েল আহমেদ

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর প্রিয় দেশ শত্রুমুক্ত হলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায় আছেন, কেমন আছেন; আমরা জানতাম না। যেদিন ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি সংবাদ জানলাম, সেদিন এক অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সারাদেশে। মানুষের যে কী আনন্দ, তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়। যেদিন তিনি ফিরে এলেন সেদিনটি ছিল সোমবার। সকাল থেকেই লাখ লাখ মানুষ 'জয় বাংলা', 'জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগানে দশদিক মুখরিত করে মিছিল নিয়ে বিমানবন্দর অভিমুখে। রণক্লান্ত যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সংগ্রামী জনতা, অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে সন্তানহারা জননী, স্বামীহারা পত্নী, পিতৃহারা পুত্র-কন্যা সব দুঃখকে জয় করে স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা ভুলে গর্বোদ্ধত মস্তকে সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ দু'হাত বাড়িয়ে জাতির পিতাকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করার জন্য।

ঢাকায় যখন সাজসাজ রব, তখন সকাল থেকেই দিল্লির রাজপথ ধরে হাজার হাজার মানুষের মিছিল পালাম বিমানবন্দর ও প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দিল্লির জনসাধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, 'আপনার জন্য আমি গর্বিত। ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ আপনার জন্য গর্ব অনুভব করে। তার স্বাধীনতার স্বপ্ন আজ সার্থক।' বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেন, 'আমার জন্য এটা পরম সন্তোষের মুহূর্ত। বাংলাদেশে যাবার পথে আমি আপনাদের মহতী দেশের ঐতিহাসিক রাজধানীতে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ কারণে যে, আমাদের জনগণের সবচেয়ে বড় বন্ধু ভারতের জনগণ এবং আপনাদের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, যিনি কেবল মানুষের নন, মানবতারও নেতা। তার নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারের কাছে এর মাধ্যমে আমি আমার নূ্যনতম ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারব।' অভ্যর্থনার আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে বঙ্গবন্ধু একান্তে অনুরোধ করেছিলেন, 'ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে আমি ঋণী। আপনি আমার বাংলার মানুষকে অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার নিকট আমার একটি অনুরোধ। আপনি কবে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করবেন?' শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী মহানুভবতার স্বরে বলেছিলেন, 'আপনি যেদিন চাইবেন।' বঙ্গবন্ধু এমন বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, এ রকম একটি অবস্থার মধ্যেও রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞায় ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যর্পণের বিষয়টি আলাপ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আদায় করে নেন।

এর পর অবসান ঘটে আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার। দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর বিমানটি ঢাকার আকাশসীমায় দেখা দিতেই জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্য নেতৃবৃন্দ, আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ছুটে যাই নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে। সে এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ, অভূতপূর্ব মুহূর্ত, যা আমার মানসপটে এখনও জ্বলজ্বল করে। বিমানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জনতার মহাসমুদ্রের উদ্দেশে হাত নাড়েন। তার চোখে তখন স্বজন হারানোর বেদনা-ভারাক্রান্ত অশ্রুর নদী আর জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়ানো মুখাবয়বজুড়ে বিজয়ী বীরের পরিতৃপ্তির হাসি।

এরপর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যাওয়ার জন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপেক্ষমাণ ট্রাকে উঠে রওনা দিই। রাজপথের দু'পাশে দাঁড়ানো জনসমুদ্র পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট পর ময়দানে পৌঁছলাম। আবালবৃদ্ধবনিতার মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত। 'জয় বাংলা', 'জয় বঙ্গবন্ধু' রণধ্বনিতে সবকিছু যেন ডুবে গেল। বঙ্গবন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার কেবলই মনে হয়েছে, জাতির পিতা জীবনভর এমন একটি দিনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। চিরাচরিত ভঙ্গিতে 'ভায়েরা আমার' বলে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশে নিবেদন করলেন তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা। হৃদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগঘন ভাষায় বললেন, 'ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।' দীর্ঘ নয় মাস ১৪ দিন নির্জন কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গোনা একজন মানুষ কী করে এ রকম উদ্বেলিত পরিস্থিতিতেও স্থির-প্রতিজ্ঞ থেকে বলছেন, 'ভায়েরা, তোমাদেরকে একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে।'

সভামঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ধানমণ্ডির ১৮নং বাড়িতে গেলেন, যেখানে পরিবারের সদস্যবৃন্দ অবস্থান করছিলেন। সেই বাড়ির সামনে আর একটি বাড়ি তখন তার জন্য রাখা হয়েছিল। কেননা, ধানমণ্ডির ৩২নং বাসভবনটি শত্রুবাহিনী এমনভাবে তছনছ করে দিয়েছিল, যা বসবাসের অনুপযুক্ত ছিল। প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে ১১ জানুয়ারি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন এবং আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করলেন। ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আমাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব করেন। দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় গণতন্ত্র।

এবারে এক নতুন প্রেক্ষাপটে ১০ জানুয়ারি আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। '৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। সেই গণজোয়ারে বাংলার মানুষ নৌকায় ভোট দিয়ে জাতির পিতাকে বিজয়ী করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করেছিল। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন- তিনিই বাংলার মানুষের একক নেতা। এবারের নির্বাচনেও '৭০-এর গণজোয়ারের মতোই নৌকায় ভোট দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করে বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করল- দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের তিনিই একমাত্র নেতা। তার নেতৃত্বে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মর্যাদাশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে।

২০২০-এ আমরা সগৌরবে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালন করব এবং ঘোষিত রূপকল্প অনুযায়ী ২০২১-এ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। এবারের ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হাতে নিয়ে দেশকে তিনি উন্নয়নের চরম শিখরে নিয়ে যাবেন এবং বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল- বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। আমাদের তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। তার প্রথম স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। আরেকটি স্বপ্ন যখন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছিলেন, তখনই বুলেটের আঘাতে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়। জাতির পিতাকে হারানোর দুঃখের মধ্যে '৮১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে আমরা যে পতাকা তুলে দিয়েছিলাম, সেই পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে আজ তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। প্রতিপক্ষের শত ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচক আজ ইতিবাচক অগ্রগতির দিকে ধাবমান। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি; যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘরে ঘরে ছিল খাদ্যাভাব। আজ দেশে ১৬ কোটি মানুষ এবং খাদ্যভাণ্ডার পরিপূর্ণ। '৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি ছিল ৩৪৮ মিলিয়ন ডলার; এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতে চার বিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ ৩৩ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় যেখানে ছিল মাত্র ৫০-৬০ ডলার, আজ তা ১৭৫১ ডলারে উন্নীত হয়েছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, 'সামাজিক-অর্থনৈতিক সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এগিয়ে। এমনকি সামাজিক কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারত থেকেও এগিয়ে।' যেমন আমাদের রফতানি, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, বিদ্যুৎ উৎপাদন পাকিস্তান থেকে বেশি। আবার সামাজিক খাতে আমাদের গড় আয়ু ভারত-পাকিস্তান থেকে বেশি। নারীর ক্ষমতায়নেও আমরা এগিয়ে। ২০২১ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষকে আমরা বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারব।

আমাদের আশা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত 'রূপকল্প' অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ডিজিটাল দেশে রূপান্তরিত হবে। বিশ্বব্যাংককে অগ্রাহ্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যে অনন্যসাধারণ সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে এবং পদ্মাবক্ষে সেই সেতুর অবয়ব এখন দৃশ্যমান। যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে জাতির পিতা 'স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আজ তা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। এক সময়ের অন্ধকার গ্রামবাংলা আজ আলোকিত। পিচঢালা পথ; সেই পথে সশব্দে ছুটে চলেছে যাত্রীবাহী, মালবাহী গাড়ি। ঘরে ঘরে টিভি, ফ্রিজ। পাকা দালানকোঠা। খালি পায়ে লোকজন চোখে পড়ে না। বাজারগুলো সরগরম। গ্রামীণ জনপদের মানুষের হাতে ধূমায়িত চায়ের পেয়ালা। গ্রামগুলো শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে এবং ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য
tofailahmed69@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ