সাহসী নেত্রী ও পথযাত্রী

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯

সাহসী নেত্রী ও পথযাত্রী

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

ইশতেহার 'সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা' নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী পাঁচ বছরের প্রতিশ্রুতি দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করে গণমানুষের রায় প্রার্থনা করেছেন। ২২ ডিসেম্বর ২০১৮ সমকাল পত্রিকায় আমার লিখিত নিবন্ধে এ সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দিয়েছি। আমার গভীর বিশ্বাস এই যে, কল্যাণাস্পদ জনবান্ধব আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নানাবিধ অঙ্গীকারসমৃদ্ধ এই ইশতেহার প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ তরুণ ভোটারসহ সব সম্মানিত ভোটারের মনস্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছে।

বোধের সচেতন পর্যালোচনায় এটুকু উপলব্ধি করেছি, সত্তর-একাত্তরের মতোই দেশ এই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে সরাসরি দু'ভাগে বিভক্ত ছিল। একদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনায় শানিত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে অর্থবহ করার অব্যাহত অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় শেখ হাসিনার ওপর অবিচল আস্থার অবস্থান, অন্যদিকে বর্ণচোরা, নষ্ট চরিত্র, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের কুশীলব গণতন্ত্রের সব অনুষঙ্গ বিনষ্টকারী জঙ্গি, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ এবং গণধিক্কৃত যুদ্ধাপরাধীদের সমন্বিত অপগোষ্ঠী।

'বিজয়ের গৌরবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়' শিরোনামে বিজয়ের মাসে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় মাসব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করে সঙ্গীত, নাট্য ও চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরসহ জেলার প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় প্রায় ৫০টি জনবহুল স্পটে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতার আদর্শ এবং এর ভিত্তিতে গত ১০ বছরের দৃশ্যমান অর্জনগুলো উপস্থাপন করার সময় জনগণের আগ্রহ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং প্রাপ্তি-প্রত্যাশার অনুভূতি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। আমি আঁচ করতে পেরেছিলাম, শুধু তরুণ প্রজন্ম নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ জনতার আকুতি এবং উজ্জীবনের প্রকাশ নির্বাচনের ফলে প্রতিফলিত হবেই। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনের সমাপ্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় এক যুদ্ধ যেন জনগণের সামনে অবশ্যম্ভাবী ছিল। এই ভোটযুদ্ধে জনতা তাদের সুচিন্তিত মতামত প্রদান করে শুধু বিজয়কে নিশ্চিত করেনি; ইশতেহারে উল্লিখিত সব অঙ্গীকারও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রত্যয় ঘোষণা করেছে। এই নির্বাচন জনতার জয়; মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির পিতার আদর্শিক চেতনার জয়; গত ১০ বছরের সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব শেখ হাসিনার জয়।

নিরঙ্কুশ বিজয় যেমন আনন্দ ও গৌরবের, তেমনি নির্ভীক সাহস-দৃঢ়তা-সততা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিশাল চ্যালেঞ্জ। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর ভাষণে বঙ্গবন্ধু অসাধারণ বিনয় ও মানবিক গৌরবগাথায় বলেন, 'এই দু'বছরে আমরা কী পেয়েছি আর কী পাই নাই, আজ তারও খতিয়ান এবং আত্মবিশ্নেষণের দিন। আমি বড় দাবি করি না। আমরা কোনো ভুল করি নাই বা কোনো কাজে ত্রুটি করি নাই- এমন কথা বলি না। শুধু অনুরোধ করব, আপনাদের চারপাশে পৃথিবীর আরও অনেক দেশের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন। আমেরিকা পৃথিবীর সবচাইতে ধনী দেশ। এই আমেরিকায়ও স্বাধীনতা লাভের পর দুই দুইটি গৃহযুদ্ধের মোকাবেলা করতে হয়েছে। আজকের অবস্থায় পৌঁছতে আমেরিকার সময় লেগেছে প্রায় ১শ' বছর। ... ১৬ ডিসেম্বরের সঙ্গে আমাদের অনেক ব্যথা, বেদনা, আনন্দ, গৌরব এবং আশা-আকাঙ্ক্ষা জড়িত। এই দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় এক লাখ পাকিস্তানি শত্রু আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে আরও শক্তিশালী শত্রু। এই শত্রু হলো অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুুধা, রোগ, অশিক্ষা, বেকারত্ব ও দুর্নীতি। এই যুদ্ধের জয় সহজ নয়। অবিরাম এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে এবং একটি সুখী, সুন্দর, অভাবমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। তবেই হবে আপনাদের সংগ্রাম সফল; আপনাদের শেখ মুজিবের স্বপ্ন ও সাধনার সমাপ্তি।'

বঙ্গবন্ধু অপরিমেয় দূরদর্শিতা ও মাটি-মানুষের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ উপস্থাপন করেন এইভাবে- 'তবুও বলব, আমরা রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন করেছি। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারিনি। আমাদের এবারের সংগ্রাম অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের সংগ্রাম। আমি যে সুখী ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, সংগ্রাম করেছি এবং দুঃখ-নির্যাতন বরণ করেছি; সেই বাংলাদেশ এখনও আমার স্বপ্ন রয়ে গেছে। গরিব কৃষক ও শ্রমিকের মুখে যতদিন হাসি না ফুটবে, ততদিন আমার মনে শান্তি নাই। এই স্বাধীনতা তখনই আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলাদেশের কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে। তাই আসুন, এই দিনে অভাব, দারিদ্র্য, রোগ-শোক ও জরার বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম ঘোষণা করি। সংগ্রাম ঘোষণা করি চেরাচালানি, কালোবাজারি, অসৎ ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারলে সোনার বাংলা গড়ার কাজ সফল হবে না। আর সোনার বাংলা গড়তে না পারলে ৩০ লাখ বাঙালি যে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে যাবে।'

উপরোল্লিখিত বঙ্গবন্ধুর পবিত্র ভাষণ-বার্তা এখনও যেন আমাদের নতুন করে জাগ্রত করছে। বঙ্গবন্ধুতনয়া অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে অপরিসীম প্রজ্ঞা, মেধা, সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বপরিমণ্ডলে দেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন ঠিকই; কিন্তু এখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়ার ব্রত নিয়ে জাতি তার কাছ থেকে কঠিন এবং কঠোর দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছে। বস্তুতপক্ষে 'আমি সবার প্রধানমন্ত্রী'- এই বক্তব্যের মাধ্যমে পুরো দেশ ও দেশবাসীর মঙ্গলকে ধারণ করার যে অমিয় বাণী দিয়ে দেশবাসীকে নতুন চেতনায় উজ্জীবিত করেছেন; দুর্নীতি-জঙ্গি-সন্ত্রাস-মাদক নির্মূল ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' বা 'শূন্য সহিষুষ্ণতা' ঘোষিত নীতিকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করার

মধ্যেই জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশাই উচ্চারিত হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে কর্মবীর করার ব্রত, ক্রমান্বয়ে গ্রামীণ জনপদকে শহর-নগরায়নের আধুনিকতায় সমৃদ্ধকরণ, গুণগত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও নারী-পুরুষ সমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নকে অধিকতর দৃশ্যমান করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। শিল্প ও নগরবান্ধব পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটিয়ে উন্নত বিশ্বের আদলে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার প্রতি অধিকতর মনোনিবেশ করতে হবে।

আমাদের ধারণায় সুস্পষ্ট করতে হবে, অসৎ-অযোগ্য-অদক্ষ-প্রতারক-ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য অনৈতিক লবিস্ট বা অন্য মাধ্যমে কোনো নারী বা পুরুষ যাতে তাদের স্বার্থ সিদ্ধি করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ম্লান এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অথবা সরকারের ভাবমূর্তিকে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ করতে না পারে। গুটিকয়েক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিকৃষ্ট সিন্ডিকেট নয়; প্রকৃত অর্থে মেধাবী, নির্লোভ, নির্মোহ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবিড়ভাবে বিশ্বাসী অব্যাহতভাবে পরীক্ষিত-নিবেদিত-নির্যাতিত-ত্যাগী নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার সারবত্তা অসার ও অপাঙক্তেয় হয়ে যাবে। কথিত নব্য আওয়ামী নামধারী নেতাকর্মী যারা বঙ্গবন্ধুর সরকার পরিচালনার সময় নানাবিধ অপকর্ম তথা ভূমি দখল, চোরাকারবারি, দুর্নীতিবাজের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র তৈরি এবং ষড়যন্ত্রকে ত্বরান্বিত করেছে, তাদের অবশ্যই চিহ্নিত করার সময় এসেছে। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নৃশংসভাবে শাহাদত বরণের পর খুনি মোশতাক এবং তার কুৎসিত মানসিকতাসম্পন্ন অনুসারীদের মতো রাতারাতি সামরিক জান্তার অধীনে গঠিত ধারাবাহিক দলমতের অনুসারী-নেতাকর্মী হয়ে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন, জাতির পিতার আদর্শকে প্রচণ্ডভাবে ভূলুণ্ঠিত এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তারা বা তাদের সন্তান-সন্ততি আবার নতুন করে আওয়ামী লীগের অনুসারী সেজে সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত এবং দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সেদিকে গভীর মনোযোগ নিবিষ্ট করতে হবে।

কবি নজরুলের কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি দিয়ে ইতি টানতে চাই। 'সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি, এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোন এক মিলনের বাঁশি। একজনে দিলে ব্যথা-সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা। মহামানবের মহাবেদনার আজি মহা উত্থান, ঊর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নিচে কাঁপিতেছে শয়তান।' অতএব আত্মসন্তুষ্টি নয়, অন্ধকারের দানব শক্তি- সুবিধাবাদী বর্ণচোরা কথিত আওয়ামী লীগধারী এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সমূলে নিধন করা না গেলে মনন-সৃজন ও অগ্রগতির অভিযাত্রা নতুন সংকটের মুখোমুখি হবে- নিঃসন্দেহে

এটি বলা যায়। সত্য, সুন্দর, কল্যাণ, আনন্দের সাবলীল ও শাশ্বত আলো জ্বালিয়ে আমাদের অগ্রযাত্রাকে পরিপূর্ণতা দানে কঠিন ঐক্য প্রয়োজন। এই আয়োজনের পথপ্রদর্শক হবেন মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এবং তরুণ সমাজ হবে আমাদের প্রথম সারির সাহসী পথযাত্রী।

শিক্ষাবিদ ও উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ