যেভাবে পৃথিবী রক্ষা পেতে পারে

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০১৯

যেভাবে পৃথিবী রক্ষা পেতে পারে

  কামরুল ইসলাম চৌধুরী

আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ফরাসি জলবায়ু নেগোসিয়েটর পল ওয়াটকিনসনের সঙ্গে আমি কীভাবে ভিন্নমত পোষণ করতে পারি, যখন তিনি বলেন, 'ক্যাটোভিস... হচ্ছে সময়ের সন্ধিক্ষণ, যখন প্যারিস চুক্তির পর সময় অনেক গড়িয়েছে: এখন থেকে এটি নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যাবে।' সত্যিই, সম্প্রতি পোল্যান্ডের ক্যাটোভিস নগরীতে জাতিসংঘের জলবায়ু কনভেনশন (ইউএনএফসিসি) সংক্রান্ত কনফারেন্স অব পার্টিস (কপ ২৪)-এর ২৪তম অধিবেশনে বিশ্বের ২০০টি দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য নিয়মনীতি সম্পর্কে দুর্বল সমঝোতায় পৌঁছেছে।

প্যারিস চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করেছে। কী করে কৌশলগুলো বাস্তব ক্ষেত্রে কাজ করবে, সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অর্জন করার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিনিধিরা এই বিষয়ে কিছু বিতর্কিত বিষয় মীমাংসা করেছে। অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলো ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে আরও জোরালোভাবে সংশ্নিষ্ট দেশগুলোর জলবায়ু বিষয়ক পদক্ষেপ সম্পর্কে রিপোর্ট করার জন্য সাধারণ নির্দেশাবলিসহ নতুন আন্তর্জাতিক বিধি ও নির্দেশিকা ঠিক করেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর রিপোর্টিং ও সেগুলোর পর্যালোচনায় কিছু নমনীয়তা রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। একটি অভিন্ন রিপোর্টিং ও পর্যালোচনা কাঠামো স্বচ্ছতা উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। প্রতিনিধিরা ২০২৫ সালের পর বছরে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থের একটি নতুন আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য ২০২০ সালে একটি প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়েও একমত হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে শুরু করে উন্নত দেশগুলোকেও ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অর্থায়নের তথ্য প্রতি দুই বছরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মূল লক্ষ্য হচ্ছে অর্থায়ন ও সহায়তা। ক্যাটোভিস প্যাকেজে কিছুটা হলেও এই প্রয়োজনীয়তার বিষয়টির সমাধান দিয়েছে। পাশাপাশি অর্থায়ন সংক্রান্ত রিপোর্টিংয়ে অভিযোজন কর্মসূচিতে সহায়তা প্রদান (অভিযোজন তহবিলের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাসহ) এবং কনভেনশন ও প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাহিদা বিশ্নেষণের সুযোগ রয়েছে (দীর্ঘদিন ধরে এলডিসি, সিআইডিএস এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো অনুরোধ জানিয়ে আসছে)।

আমি মনে করি, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু কর্মসূচিতে সহায়তা প্রদান করার জন্য অর্থায়নের উপায় সম্পর্কে ক্যাটোভিস নগরীতে সম্মত দিকনির্দেশনা দুর্বল। আরও সমস্যা হলো, বাণিজ্যিক ঋণ এখন জলবায়ু অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেবে ধনী দেশগুলো। তবে বাংলাদেশের মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে, ক্যাটোভিস কপ ২৪ পাঁচ বছরমেয়াদি অগ্রগতি সংক্রান্ত গ্লোবাল স্টকটেকের অংশ হিসেবে ক্ষতি মোকাবেলার যথাযথ প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনার জন্য সম্মত হয়েছে।

দেশগুলো তাদের অভিযোজন যোগাযোগ ও স্বচ্ছতা রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রতিফলিত করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের মতো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যারা ইতিমধ্যে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবগুলো অনুভব করতে শুরু করেছে, যা মানিয়ে নেওয়া অসম্ভব। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা সম্মত হয়েছেন যে, প্যারিস চুক্তি অনুসরণ জোরদার করার জন্য কমিটির তদন্তমূলক কাজ কমিটিই শুরু করতে পারে। যখন দেশগুলো জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) সম্পর্কে যোগাযোগ বজায় রাখতে অথবা তাদের জলবায়ু কর্মসূচি ও সহায়তা সম্পর্কিত বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়।

প্যারিস রুল বুকের সব বিষয় ক্যাটোভিসে নিরাপদ হতে পারেনি। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের পরিবেশগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আগামী বছর চিলিতে অনুষ্ঠিতব্য কপ ২৫-এ আলোচনার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ক্যাটোভিস নগরীতে সস্মত বিষয়গুলোতে একটি ফাঁক রয়ে গেছে। অর্থাৎ এখনও প্যারিস চুক্তির ধারা-৬-এ কিছুই নেই, যা বাজার এবং অবাজারের দিকগুলোর সমাধান দিতে পারে।

আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্যারিস রুল বুক হচ্ছে প্যারিস চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য একটি পূর্বশর্ত। সম্প্রতি আইপিসিসি বিশেষ প্রতিবেদনে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলা হয়েছে, এর ফলে শেষ পর্যন্ত অনেক দেশকে তাদের জলবায়ু সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাদ দিতে হবে। কিন্তু কপ ২৪ নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারেনি যে, প্রধান কার্বন নিঃসরণকারীরা তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে তাদের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। প্রায় দুই সপ্তাহের আলোচনার সমস্যা ছিল যে, জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী চারটি দেশ আইপিসিসির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টটিকে 'স্বাগত' জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যাতে শত শত বিজ্ঞানীর বিশ্বব্যাপী বিপদাশঙ্কা প্রতিফলিত হয়েছে। নামকাওয়াস্তে তারা শুধু 'নোট' নিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু নেগোসিয়েটর হিসেবে আমি জানি, প্যারিস চুক্তিপূর্ণ আইনি শক্তিসহ সবল নয়। কিন্তু আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি, দ্বিতীয় সেরা। এই দুর্বল প্যারিস চুক্তিটি বাঁচিয়ে রাখতে সত্যিকার অর্থেই সংশ্নিষ্ট দেশগুলোকে শক্তিশালী এনডিসি ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু কৌশল গ্রহণ করতে হবে। ২০২০ সালের নির্দিষ্ট সময়ের আগে উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিব বিশেষ জলবায়ু সম্মেলন আহ্বান করেছেন। যেখানে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব প্রশমন, অভিযোজন ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু কর্মকাণ্ডে অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। কার্বন নির্গমন কমাতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, প্রায় এক হাজার নগরীর ১.৬ বিলিয়নের বেশি বাসিন্দা চরম তাপমাত্রার সম্মুখীন হবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রন আয়োজিত ওয়ান প্ল্যানেট সামিটেও অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা পালন এবং আমাদের কাজের মধ্যে সামাজিক মাত্রা সংহত করতে হবে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে, মেয়র ও নগর নেতারা একটি স্বাস্থ্যকর ও আরও টেকসই ভবিষ্যতের লক্ষ্যে আলোচনার জন্য সি ৪০ মেয়রদের শীর্ষ সম্মেলনে কোপেনহেগেনে জড়ো হবেন। বিশ্বজুড়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর জন্য বিশ্বব্যাপী আরও এমন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

আমার আন্তরিক আশা হচ্ছে যে, নতুন এলডিসি চেয়ার ভুটানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও অন্যান্য এলডিসি পর্যাপ্ত হোমওয়ার্কের মাধ্যমে আগামী দুই বছরে এই ৪৮-জাতি গোষ্ঠীকে প্রস্তুত করবে। দায়ী না হওয়া সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশ হচ্ছে একটি শূন্য প্রভাব সৃষ্টিকারী দেশ। প্রভাবের শিকার দেশ হিসেবে তার বিবরণও পরিবর্তন করতে হবে। বাংলাদেশ ২০০৮ সালে জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নকারী প্রথম দেশ, যা ২০০৯ সালে সংশোধন করা হয়েছিল। এখন এটি একটি অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে হালনাগাদ করা উচিত। যাতে বিলম্ব না করেই জরুরি ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়ন করা যায়।

বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে এনএপি রোডম্যাপ অনুসরণ করে অবিলম্বে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) প্রণয়ন করা উচিত। এখানে মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়ে জোর দেওয়া উচিত। এলডিসির পক্ষ থেকে আমি ২০০৯ সালে কোপেনহেগেন কপ সম্মেলনে এলডিসিগুলোর জন্য এনএপি তৈরির প্রস্তাব করি। তারপর ২০১০ সালে কানকুন সম্মেলনে কানকুন অ্যাডাপটেশন ফ্রেমওয়ার্কের অংশ হিসেবে এটি সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করি। ২০১১ সালে ডারবানে, ২০১২ সালে দোহায় এবং ২০১৩ সালে ওয়ারশ সম্মেলনে তা আমি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হই।

বাংলাদেশ নিজস্ব বাজেট থেকে ক্লাইমেট ট্রাস্ট ফান্ড তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও আরও কয়েকটি দেশসহ উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তায় ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্ট ফান্ড গঠন করেছে। এখন বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপটেশন ফান্ড, এলডিসি ফান্ড এবং অন্যান্য গ্লোবাল ফান্ড পাওয়ার জন্য কিছু অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচি প্রণয়ন করার দক্ষতা ও সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি প্রয়োজন।

জলবায়ু, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জাতিসংঘের কিয়োটো প্রটোকলের যুগ্ম বাস্তবায়ন সুপারভাইজারি কমিটির সাবেক চেয়ার এবং জাতিসংঘের অ্যাডাপটেশন কমিটির সাবেক সদস্য
quamrul2030@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ