পানি :সীমিত মজুদে অন্তহীন চাহিদা

পরিবেশ-প্রতিবেশ

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯

পানি :সীমিত মজুদে অন্তহীন চাহিদা

  গৌতম কুমার রায়

পানির অপর নাম জীবন হলেও জীবনের অপর নাম কিন্তু শুধুই পানি না হয়ে তা বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি। পৃথিবীর মোট আয়তন ৫০ কোটি ৯১ লাখ ৪৯ হাজার ৯২ বর্গকিলোমিটার প্রায়। এই আয়তনের মধ্যে জলভাগ রয়েছে মোট আয়তনের ৭০.৭৮ শতাংশ এবং স্থলভাগ রয়েছে মাত্র ২৯.২২ শতাংশ। বিশাল জলরাশির মধ্যে লবণাক্ত পানির পরিমাণ ৯৭.৩ শতাংশ আর মিষ্টি পানির পরিমাণ মাত্র ২.৭ শতাংশ। এই ২.৭ শতাংশ পানি নিয়েই মানুষসহ প্রাণিকুলের জীবন ও পরিবেশ। পৃথিবীতে উৎপাদিত অধিকাংশ ফল ও ফসলের উৎপাদন আবার সামান্য এই মিষ্টি পানির স্থিতি ও অবস্থানগত স্থান দেখলে দেখা যায়, নদীতে পাওয়া যায় .০১ শতাংশ, হ্রদ ও জলাভূমিতে পাওয়া যায় .০৩ শতাংশ, আবহাওয়ায় মিলে থাকে .০৪ শতাংশ, ভূমিতে থাকে ২২.৪ শতাংশ আর পর্বত বা পর্বতশৃঙ্গের চূড়াতে আবদ্ধ থাকে ৭৭.২ শতাংশ। আমাদের সামান্য পরিমাণ সুপেয় পানি প্রাপ্যতা অনুযায়ী তা কৃষিতে ব্যবহার হয় ৬৯ শতাংশ, শিল্প খাতে ব্যবহার হয় ২৩ শতাংশ এবং গৃহস্থালিতে তার ব্যবহার মাত্র ০৮ শতাংশ। তবে অধিক জনসংখ্যার এই দেশে শিল্প কারখানায় যে ২৩ শতাংশ পানি ব্যবহার হয়, তা পরে ওই শিল্পের বর্জ্য অর্থাৎ বিষাক্ততা বহন করে দূষণ হয়ে নষ্ট করে আমাদের কৃষি ও জনস্বাস্থ্যকে। তবে পৃথিবীতে জলের পরিমাণ সবসময় স্থিত। জলের কোনো ক্ষয় নেই। বাড়তি বা কমতি নেই। তবে বাহ্যিক পরিবর্তন আছে।

এক সময়ের অফুরন্ত পানির দেশ, আমাদের নদীমাতৃকার বাংলাদেশ। দেশের চারদিকে পানি। পানি বেষ্টনীর অভ্যন্তর ভাগে রয়েছে অনেক নদী, নালা, খাল, বিল, হ্রদ, হাওর-বাঁওড়সহ পানির হাজারো চ্যানেল। এই পানি পৃথিবীর অন্য দেশে যে কারণে সোনার চেয়ে দামি, সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে দামি হলো বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের জন্য। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের পানির সংকট শুরু হয়েছে। দেশের কৃষি, শিল্প, এমনকি আমাদের প্রত্যেহ জীবনের প্রত্যেকটি ধাপে, মাটির নিচ থেকে পানি শুধু তোলাই হচ্ছে। যে জন্য মাটির নিচে তৈরি হচ্ছে পানিশূন্যতা। প্রতি বছর মাটির ওপরি পানি নিচে গিয়ে যে শূন্যতা পূরণ করার নিয়ম, তা বাধা পেয়ে ব্যত্যয় ঘটেছে অনেক আগ থেকে। এর প্রধান সমস্যা হলো গ্রামীণ নগরায়ন। জনসংখ্যার কারণে গ্রামীণ শহরায়ন বাড়ছে। পুকুর, ডোবাসহ জলাধার ভরাট করে সেখানে ইট-রড-সিমেন্ট-বালু মিশ্রিত কংক্রিটের দালান গড়ে উঠছে। বাড়ছে বসতভিটা, দালানকোঠা। মাটির যে ছিদ্র পথে সারফেস ওয়াটার কিংবা বন্যা বা বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে ভূঅভ্যন্তরে প্রবেশ করার কথা, সে পথ রুদ্র হয়ে যাওয়ায় তা ঢুকতে পারছে না মাটির তলদেশে। শুধু বছর বছর ভূতলের পানি আমরা নিচ্ছিই। যে কারণে দেশে এই পানিস্তর কমতে কমতে কোথাও কোথাও ২০-৩০ ফুট থেকে অবস্থানভেদে কোথাও কোথাও প্রায় ৪-৫শ' ফুট নিচেও নেমে গেছে। ফলে ভূগর্ভের অভ্যন্তরে তৈরি হচ্ছে বিস্তীর্ণ বায়ু-ভ্যাকুয়াম। ভ্যাকুয়ামের বাতাস এসে গভীরে চাপ প্রয়োগ করে পানির নিম্নস্তরে ভূরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পাইরাইট ও অক্সি-হাইড্রোক্সাইড যৌগ এই কঠিন খনিজ পদার্থ ভেঙে দিয়ে আর্সেনিক এবং ফ্লুরাইড বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র। ফলে পানির আর্সেনিক ও ফ্লুরাইড ওপরে উঠে পানি থেকে সরাসরি মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ছে, কখনও তা আবার ফল ও ফসলের মাধ্যমে। এতে আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, বাড়ছে জীবন বেদনা।

পানি সংকটের আগে অতীত ঘটনার দিকে তাকালে দেখতে পাই, গত ৫০ বছরে পৃথিবীতে ৫০৭টি সংঘাত সংঘটিত হয়েছে শুধু পানি নিয়ে। সহিংস ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি। এগুলো ছিল পানির অধিকার ও ব্যবহারগত হিস্যা আদায়ের জন্য। পানির অধিকারের কথা বললে দেখা যায়, দেশে দেশে পানির উৎস নির্ভরতা বা জলপ্রবাহে উজানের রাষ্ট্রগুলো পানিকে ইচ্ছামতো কাজে লাগাতে গিয়ে ভাটি রাষ্ট্রগুলোকে বঞ্চিত করছে যুগ যুগ সময়। আর এ কারণে যত সংঘাত ও সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশে পানির অভাব ব্যাপকভাবে অনুভূত হয় আশির দশকের পর। জনআধিক্যের কারণে খাদ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় দেশের অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনের তাগিদে এ সময় ব্যাপক হারে উচ্চ ফলনশীল বীজ আমদানি করা শুরু হয়। দেশের প্রায় সমগ্র এলাকাকে কৃষি চাষের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়। ফলে বছরে যে পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, তার মধ্যে সুপেয় পানির সিংহভাগ ব্যবহূত হতে থাকে সেচ কাজে। এ ছাড়া প্রত্যেহ মানুষ ও জীবের জন্য অন্য কাজে এই পানির ব্যাবহার তো রয়েছেই। জীববৈচিত্র্যগত কারণে মৌসুমি বায়ুর চরিত্রে এসেছে পরিবর্তন।

এ দেশে ব্যবহারগত কারণে গ্রামে একজন প্রতিদিন পানির ব্যবহার করে ৫০ লিটার। শহরে তা প্রয়োজন হয় একজনের ১০০ লিটার। আবার মেট্রোপলিটন এলাকায় তার পরিমাণ ১৫০ লিটার পর্যন্ত। বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে দৈনিক প্রতিজনে পানির ব্যবহার গড়ে ৩৩৪ লিটার। সেই হিসাবে যুক্তরাজ্যে ব্যবহার হয় গড়ে ৫৮৭ লিটার, এশিয়ার দেশগুলোতে গড়ে ৮৫ লিটার এবং আফ্রিকাতে তা মাত্র ৪৭ লিটার। সুপেয় পানির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বছর বছর পানির ব্যবহার বাড়বেই। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ এ বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে আরও প্রায় ২০ শতাংশ। আমাদের দেশে এখনও পানি ব্যবহারের কোনো নীতিমালা নেই। এমনকি নেই পানি অবচয় রোধের কোনো নিয়মকানুন। অল্প বিস্তর প্রাপ্য সুপেয় পানির সিংহ ভাগ ব্যবহার হয় সেচ কাজে, শিল্প খাতে ও গৃহস্থালিতে। যদি এই খাতগুলোর পানি ব্যবহারে একটা ধারাবাহিক সারণি মেনে চলা যেত, তবে সেচ কাজের ব্যবহূত পানি থেকে আমরা প্রায় ৫০ শতাংশ পানি ব্যবহার কমাতে পারি। বর্তমানে দেশে মোট জনগোষ্ঠীর ২৬ শতাংশ অর্থাৎ ৩.৬ কোটি মানুষ এই আর্সেনিক বিষে ক্ষতিগ্রস্ত। বাড়তি মানুষের প্রতিদিনের পয়ঃনিস্কাশন পরিবেশ এবং সামান্য প্রাপ্তি মিষ্টি পানি দূষিত করছে। যদি ঢাকার কথা বলি, তবে এখানে প্রতিদিন ১২.২০ লাখ ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য সম্পূর্ণভাবে শোধন করা সম্ভব না হওয়ায় তা নদী, খাল, বিলে বাহিত হয়ে পানি যেমন দূষণ করছে আবার রাজধানীর আশপাশের প্রায় ৭০০০ শিল্প কারখানা থেকে প্রতিদিন ১.৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার তরল বর্জ্য গড়িয়ে যাচ্ছে শীতলক্ষ্যা, বালু, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদে। খুব দ্রুত বিষাক্ত হচ্ছে এখানকার পানি। যে জন্য ঝুঁকি মোকাবেলা করতে বাধ্য হচ্ছে আমাদের জনস্বাস্থ্য। এভাবে দেশে প্রতিদিন প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যবহূত বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার হয়ে থাকে, এই বিষাক্ততার মধ্যে তাও কতটা নিরাপদ তা ভেবে দেখা দরকার। মানব সৃষ্ট সংকটের জন্য আমাদের উপকূলীয় এলাকায় লবণ পানি উঠে আসছে ওপরে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের ভূউপরি ভাগের বিভিন্ন সম্পদ ও ওই এলাকার পানি, বনজ ও পশুসম্পদ। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে আমাদের জনস্বাস্থ্য। প্রকৃতির বন উজাড় হচ্ছে। পশুপাখিসহ মৎস্যসম্পদ বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখন এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ মোকাবেলা করছে এই সমস্যা। পরিবেশ বিপর্যয়ের ধারায় মানুষ আজ সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত। আইন করে, আন্তর্জাতিক কর্সসূচি দিয়ে মোকাবেলা করার চেষ্টা করা হচ্ছে এই বিপর্যয়। সীমিত সম্পদের সংরক্ষণ ব্যবহারের দিকে কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে সরকার, এনজিও ও ব্যক্তিক পর্যায়ে সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। তাহলে অপার এই স্বপ্নের বিশ্ব হবে আমাদের জন্য বাসযোগ্য এক পৃথিবী।

গবেষক


মন্তব্য যোগ করুণ