এভাবে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেওয়া ...

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮

এভাবে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেওয়া ...

  শিল্পী রহমান

যেসব প্রতিষ্ঠান ৭ থেকে ১৮ বছরের বাচ্চাদের নিয়েই থাকে সারাদিন, তাদের তো জানার কথা, এই বাচ্চাদের মন-মানসিকতা কেমন হতে পারে? কী করতে পারে ওরা? ওদের কী করার সম্ভাবনা-আশঙ্কা আছে?

যে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার জন্য বাচ্চাদের বই-খাতা গিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা তো আর যাই হোক খারাপ শিক্ষার্থী না। তাহলে কাউকে নকল করতে হচ্ছে কেন? সেটা খুঁজে বের করতে হবে না? সেটা শোধরাতে হবে না? অন্যায় করেছে- বের হয়ে যেতে হবে। তারা শুধু বিশুদ্ধ বাচ্চা চান, যাতে কোনো রকম ঝুটঝামেলা পোহাতে না হয়।

এসব বাচ্চাকে তারা পড়াবেনও না। বাচ্চারা দিনরাত পাগলের মতো কোচিং করে, নিজের প্রচেষ্টায় পড়াশোনা করে, জীবন পানি করে ক্লাসে ভালো ফল করে বছরের পর বছর। তা না হলে তো বের করে দেওয়া হবে স্কুল থেকে। বাবা-মাকে অপমান করা হবে; তাদের বাচ্চা এহেন হীন কাজ করেছে কেন- সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে। তবুও তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। কারণ এমন বাচ্চা তারা স্কুলে রাখতেই পারেন না। স্কুলের একটা রেপুটেশন আছে না?

বয়সেরও যে একটা ব্যাপার রয়েছে, সেটাও কি তারা জানেন না? এই বয়সের একটা বাচ্চা তো কত কিছুই করতে পারে! তাদেরকে এই পরিমাণ মানসিক চাপ দিলে কী হতে পারে, তারা শিক্ষক হয়ে সেটা জানেন না? তাহলে ভাবলেন না কেন?

অরিত্রিকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন ওর বাবা-মা ঢাকার খুব ভালো একটা স্কুলে। ভেবেছিলেন, একবার এই স্কুলে কোনো রকমে ঢোকাতে পারলেই জীবন গঠিত হবে তাদের সন্তানের। তাই এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য জীবনের সর্বশেষ শক্তি-সামর্থ্য ঢেলে দিয়ে অমানুষিক খাটুনি খেটে জায়গা করে নিয়েছিল মেয়েটা, জীবনের হিস্যা করে নেবে বলে। জীবনের হিস্যা একটা ঠিকই হলো; কিন্তু যেভাবে ভেবেছিল, সেভাবে নয়।

এখানে শিক্ষকরাই তো সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হলেন তাদের দায়িত্ব পালন করতে না পারার কারণে। একজন শিক্ষকের নামে জেলখানার জেলারের কাজ করছেন তারা। 'পানিশমেন্ট' শব্দটা আসলে উঠিয়ে দেওয়া উচিত পৃথিবী থেকে। কারণ পানিশমেন্ট দিয়ে কিছুই অর্জন করা যায় না। যা অর্জন হয় তা মিথ্যা মুখোশমাত্র। শিখছে না বাচ্চাগুলো কিছু, বরং শৃঙ্খলা (ডিসিপ্লিন) দিয়ে তাদের ভালোভাবে শিখিয়ে-পড়িয়ে মানুষের মতো মানুষ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তারা সহজ কাজগুলো বেছে নিয়েছেন। কারণ শৃঙ্খলা আনতে অনেক ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা প্রয়োজন। কোনো রকম বাড়তি কাজে সময় দেবেন না। এর চেয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া সহজ।

একটা ১৫ বছরের বাচ্চা নকল করতে গিয়ে যতটা অপরাধ করেছে, তার চেয়ে হাজার গুণ অন্যায় করেছেন একজন শিক্ষক। কারণ এটা তারই ব্যর্থতা। বাচ্চারা ভুল করবেই। আবারও বলছি- ভুল করবেই। নির্ভুল মানুষ পৃথিবীতে নেই এবং থাকা উচিতও না। ভুল করেই তো শিখবে। ভুল করলেই তাকে শেখানোর একটা সুযোগ আসে। তারই সদ্ব্যবহার করার দায়িত্ব শিক্ষকের। এই বাচ্চাদের পড়ালেখার সঙ্গে ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-বেঠিক, জীবনদর্শন- এসব শেখানোর দায়িত্ব তো স্কুল কর্তৃপক্ষের। তারা যদি ক্লাসে কোনো শিক্ষার্থীর আচরণে ভুল দেখেন, পড়াশোনায় অমনোযোগ বা কোনো অবনতি দেখেন, তখন বাবা-মাকে ডেকে ব্যাপারটা তাদের নজরে আনতে পারেন, এটা বোঝানোর জন্য যে, বাচ্চাটা কেন এমন করছে। আর কী কী সমস্যা আছে তার জীবনে, বাসায় কোন সমস্যা? কোনো ধরনের শারীরিক বা যৌন সংক্রান্ত অ্যাবিউজ জড়িত আছে কিনা, সামাজিকভাবে কোনো চাপবোধ করছে কিনা? কিংবা কোনো রকম ড্রাগে জড়িয়ে পড়েছে কিনা। পড়াশোনায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে কেন? কীভাবে উৎসাহিত করা যায়; এগুলোই তো একজন শিক্ষকের কাজ।

আমি সিডনি হাই স্কুলের প্রিন্সিপালকে দেখেছি, একটি মেয়ে ডিপ্রেশনের কারণে কয়েক দিন স্কুলে যায়নি বলে প্রিন্সিপাল নিজে তার বাসায় গিয়ে তাকে স্কুলে নিয়ে গেছেন। এমন শিক্ষকের গল্প শুনেছি আমাদের বাপ-চাচাদের কাছে। আজ সেসব শুধুই গল্প। সত্যি বলতে এই কাজগুলো বাবা-মা এবং স্কুল মিলেই করার কথা, যেন বাচ্চাকে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠায় সাহায্য করতে পারেন। এখানে কেউ কাউকে অপমান করার তো প্রশ্নই আসে না। প্রয়োজনই নেই। স্কুলের কাজ তো শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে বাচ্চা ভর্তি করানো নয়। আরও অনেক কিছু। তিলতিল করে একটা মানুষকে সুন্দর-স্বাভাবিক জীবন দিয়ে গড়ে তোলাই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ। আজকাল মনে হয়, স্কুুল-কলেজগুলো নিজেদের কাজটাই ভুলতে বসেছে।

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের তো রেপুটেশনের ব্যাপার আছে- এই স্কুলে কেউ নকল করবে? হতেই পারে না। ব্যাপারটা এমন, গাছে কী অসুখ হয়েছে, তা না দেখে গাছই উপড়ে ফেলে দেবে এরা। রেপুটেশন রক্ষা করতে হলে আর যা-ই করা হোক, শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করার সময় নেই কারও। ওটা হয়তো আসবে সবার শেষে কিংবা আসবেই না।

আরেকদিকে দেখলাম, ঢাকা ইউনিভার্সিটি তার রেপুটেশন রক্ষার্থে ১৮ হাজার টিনএজ বাচ্চার জীবন নিয়ে জুয়া খেলল। রেপুটেশন তো রক্ষা পেল। কিন্তু এটা বাঁচাতে গিয়ে কতজনের জীবন রক্ষা পেল কি পেল না, সেই হিসাব কেউ রাখল না। এগুলো কেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান? ভাবতেই অবাক লাগে, আমরা কোনদিকে ধাবিত হচ্ছি? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে আর কত আত্মহনন দেখতে হবে আমাদের?

সবাই নিজের কথা ভাবছে। যাদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান, শুধু তাদের কথা ভাবার সময় নেই কারও। ভেসে যাচ্ছে জীবন, হারিয়ে যাচ্ছে জীবন, মিশে যাচ্ছে অনিশ্চয়তায়। সবাই অন্ধ হয়ে গেছে নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে, মান বাঁচাতে। কিন্তু কেউ বাচ্চাদের মনের অবস্থা নিয়ে ভাবছে না। কেউ কিছু করছে না, কেউ না।

আহারে হতভাগা অসহায় কিশোর সমাজ! তোমাদের যদি ফিরিয়ে দিতে পারতাম স্বাভাবিক জীবনের সাধ!

মনো-পরামর্শক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ