সমাজের প্রতি চপেটাঘাত

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮

সমাজের প্রতি চপেটাঘাত

  মোস্তফা হোসেইন

দুরন্ত কিশোরী। দু'দিন পরই হয়তো পরীক্ষা শেষের আনন্দ উদযাপনে বেড়াতে যেত কোথাও। সেই অরিত্রি অধিকারী কিনা গলায় দড়ি দিয়ে জানিয়ে দিল- বেঁচে থাকার কোনো অধিকার তার নেই। কে কেড়ে নিল ভিকারুননিসা স্কুলের নবম শ্রেণির এই ছাত্রীটির অধিকার?

সোমবার বিকেলে টেলিভিশনে সংবাদটা দেখার পর শিউরে উঠেছি আর ভেবেছি, কেন বাচ্চা মেয়েটা এমন করল? টিভি ক্যামেরায় যখন অরিত্রির বাবার কান্নার দৃশ্য দেখছিলাম, একজন বাবা হিসেবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরীক্ষা হলে মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিল মেয়েটি। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে চূড়ান্ত শাস্তি দিয়েছে। তাকে টিসি দিয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি কী হতে পারে? কিন্তু জানা গেল, মেয়েটির সামনে তার বাবাকেও স্কুল কর্তৃপক্ষ অপমান করেছে। বাড়িতে যাওয়ার পর তার বাবা-মা'ও কি তাকে বকাঝকা করেছিলেন? জানা যায়নি সেটুকু।

এই বয়সের বাচ্চাদের মানসিক কিংবা শারীরিক শাস্তির পরিণতি সম্পর্কে অনেক কিছুই তো জানি না আমরা। কত সংবাদই তো ছাপা হচ্ছে পত্রিকায়! শিক্ষকের বেত্রাঘাত ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা কিংবা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার ঘটনাও আমাদের অজানা নয়। কেন আমাদের শিক্ষকরা এই মারাত্মক ও ধংসাত্মক পথটি পরিহার করতে পারছেন না?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা হয়েছে ২০১১ সালে। সরকার পরিপত্র জারি করে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করেছে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। পরিপত্রের ২ নম্বর ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, 'কোনো শিক্ষার্থীকে কক্ষে এমন কোনো মন্তব্য করা যেমন, মা-বাবা/বংশপরিচয়/গোত্র/বর্ণ/ধর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করা, অশোভন অঙ্গভঙ্গি করা বা এমন কোনো আচরণ করা, যা শিক্ষার্থীর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে।' এর এক বা একাধিক ব্যবস্থাকে মানসিক শাস্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সেখানে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমে বহুবার এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা আলোকপাত করেছেন। জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রচারমাধ্যম বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল বাংলাদেশের সেরা একটি স্কুল হওয়ায় সঙ্গত কারণেই ধারণা করা যায়, এই নির্দেশনাটি স্কুলের সব শিক্ষকের নজরে এনেছিলেন অধ্যক্ষ।

আবার আইনের প্রয়োগ হয় না, সেটাও বলতে পারি না। শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার নওপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ইউসুফ আলী, কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার মহিদেব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, নাটোর সদরের জয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাবুত ফারহানা মুন্নিকে সাময়িক বরখাস্তের সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল পত্রিকায়। পাবনা, নওগাঁ, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের কিছু স্কুল শিক্ষককেও শাস্তি প্রদান করা হয়েছে এই অভিযোগের ভিত্তিতে। এমন আরও উদাহরণ আছে। তারপরও কোনো কারণে এ প্রবণতা রয়ে গেছে। এখনকার শিক্ষকদেরও পরিণতি জানা আছে।

একসময় শিক্ষকদের বেতনও চালানো হতো এলাকাবাসীর অর্থে। এখন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেতে হয়। স্বাধীনতা লাভের পরও এ দেশে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষককে এসএসসি পাস না হলেও চলত। এখন সে সুযোগ নেই। হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে অনেক। তারপরও এমন কেন? বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষকদের মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করা হয় খুবই কম। শিক্ষকের ব্যক্তিগত হতাশা, পারিবারিক পরিবেশ, রাগ, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে শিক্ষার্থীর প্রতি। এসব শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যহীনতাও শিক্ষার্থীর বিপদের কারণ হতে পারে। সুতরাং শিক্ষার্থীর মানসিক বিপর্যয় রোধের চিন্তা করার পাশাপাশি শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এদিকটি একেবারেই উপেক্ষিত।

অন্যদিকে নামিদামি স্কুলগুলোতে কড়াকড়ির একটা মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়। পান থেকে চুন খসে পড়লেই রক্ষা নেই। যেন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যারা মনে করেন- যত কড়া হবেন, শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষককে যত বেশি ভয় পাবে, তিনি তত ভালো শিক্ষক। আমার চেনা কিছু শিক্ষক আছেন, যারা জীবনেও কোনো শিক্ষার্থীকে তুই ছাড়া সম্বোধন করেননি। এটা অবশ্য আদরের সম্বোধন নয়, সেটাও বলে রাখি।

শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়াই কি ভালো শিক্ষাদান পদ্ধতি? অরিত্রিকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, আইনিভাবে তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু তাকে দেওয়া শাস্তি যে কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা বোধ করি স্কুল কর্তৃপক্ষ একবারও ভেবে দেখেনি। তাকে টিসি দেওয়ার মতো বড় শাস্তি না দিলেও পারতেন অধ্যক্ষ। এমনকি তার অভিভাবককে না ডেকেও ফয়সালা করা যেত। তার পরীক্ষা ৫-১০ মিনিট বন্ধ রেখে কিংবা লঘু কোনো শাস্তি দিলে হয়তো এত বড় বিপর্যয় নাও ঘটতে পারত। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মানসিক শক্তি বিচার্য। একজন শিক্ষক তার কোন শিক্ষার্থীর মানসিক শক্তি কতটা, তা অন্যদের চেয়ে বেশি বোঝার কথা। সেই অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ হলে হয়তো অরিত্রিকে এ পথে যেতে হতো না। তারপরও বলতে হবে, শিক্ষক কখনও তার শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ হতে চাইবেন না। এ মর্মান্তিক ঘটনার পর আশা করি, সব প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তৎপর হবে।

অরিত্রির বাবা-মা ও তার বোনকে যদি অঢেল অর্থ দেওয়া হয়, তারপরও তাদের ক্ষতিপূরণ হবে না। বাবার যে কান্না, মায়ের যে কান্না, সেই কান্না থামানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে এটা কামনা করতে পারি, আর কোনো অরিত্রি যেন গলায় ফাঁসি লাগিয়ে সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় চপেটাঘাত করতে না পারে। আর সেই পথটি আমাদেরই বের করতে হবে।

সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ