পহেলা জানুয়ারি, পহেলা বৈশাখ

নববর্ষ

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৯

পহেলা জানুয়ারি, পহেলা বৈশাখ

  মুস্তাফা জামান আব্বাসী

প্রথমের অনুভূতি হতে হবে প্রথম দিনের মতোই। মানুষ আলাদা আলাদা। একেক মানুষের মনে একেক রকমের দোলা। বছরের দিনের শেষে যখন আসে নবপ্রভাতের পহেলা জানুয়ারি, তা যেমন মনকে করে সতেজ, উৎফুল্ল ও নব প্রেরণায় উদ্ভাসিত, তেমনি বাংলাভাষী বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহিত একজন বাঙালির মনে পহেলা বৈশাখ আনে আরেক অনুভূতি। একটির সঙ্গে আরেকটির সাদৃশ্য থাকতে পারে; কিন্তু অনুভূতির গাঢ়তা আলাদা।

যখন জাপানে ছিলাম, জেনেছি ৩১ ডিসেম্বর জাপানি তরুণ-তরুণীর মনে আনে কী উদ্দীপনা, কী উল্লাস, কী নতুনের প্রতি প্রগাঢ় আবাহন। নৃত্যগীত উল্লাসের অংশমাত্র। সে নৃত্যগীত সাধারণ নয়। এর মধ্যে আছে রোমান্টিকতা, আছে নতুনের প্রতি মানুষের একটি অবচেতন মনের কামনা-বিলাস। এক জাপানি দম্পতির সঙ্গে সারারাত গান গেয়েছি, নৃত্য করেছি, তারপর গাড়ি করে সেই পাহাড়ের কাছে গিয়ে পৌঁছেছি, যার নিচে দ্রাক্ষাকুঞ্জ, আঙুরের ক্ষেত। আঙুর খেয়েছি, শুনেছি ক্যারোলের গানগুলো, যা বাজতে থাকে ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই। যিশুখ্রিষ্ট, যিনি আমাদের ঈসা (আ.) নবী, যেন অনেক দিন থেকেই আমাদের কাছে আসার জন্য উদগ্রীব। পৃথিবীর মানুষকে তিনি শুনিয়ে যান 'মেরি ক্রিস্টমাস'-এর শান্তির বাণী। সে বাণী এক দেশ থেকে আরেক দেশে, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায়, এক তরুণ থেকে আরেক তরুণীর মনে জাগায় ভালোবাসার দুরন্ত আগমনী। ফুজি পাহাড়ের ক্যালেন্ডারে ক্যালেন্ডারে। এ পাহাড় শোভা পায় পৃথিবীর নানা কোণে। সেই ফুজি জাপানিদের মনেও আনে নতুনের অনুভূতি। কখনও কখনওবা এই উল্লাসকে দেখেছি আমেরিকার নানা শহরে, যখন যেখানে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে। নিজের চোখে দেখেছি সেই রাতের উচ্ছৃঙ্খলতাকেও।

পহেলা জানুয়ারি যখন আসে, তখন নতুন ক্যালেন্ডারের খোঁজ করি, যেখানে নতুন করে লিখব। ২০১৯ জানুয়ারির পহেলা দিন থেকে আমার কী কী কাজ ইতিমধ্যে জমা হয়ে আছে মনের ডায়েরিতে। সামনে আসছে ফেব্রুয়ারি, যে মেলায় হাজারো লেখকের বই খুঁজে পাব। তার মধ্যে আমারও যে নাম আছে ক্ষুদ্র লেখকের তালিকায়। প্রকাশকের তাগাদায় কোনো ফুর্তির মাহফিলে যাওয়ার অবকাশ নেই অক্টোবর থেকে। এর মধ্যে পড়ে যায় বিয়ের হুল্লোড়। বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধ, আব্বাসী ভাই, আপনি খুব ভালো বিয়ের মাহফিলে দোয়া পড়তে পারেন। তাই আপনাকেই বুক করলাম। অল্প কথায় দুটি হৃদয়কে এক করে দেওয়ার জন্য আপনার যা কিছু আহ্বান অথবা মহাগ্রন্থ থেকে পাঠ সব মিলিয়ে দুই মিনিটে কাজ সারবেন। তাই জানুয়ারিতেও ব্যস্ত প্রতি লেখক।

তরুণদের সঙ্গে আমার সখ্য। তারা বলেন, এবার আমরা নতুন বুদ্ধি করেছি। ৩১ ডিসেম্বর সবাই কলকাতার, দিল্লির, মুম্বাইয়ের টিকিট কিনেছি। সেখানেই হবে আমাদের থার্টিফার্স্ট। আর ঢাকার অনেক বাড়িতে ফুর্তির আসর। সেখানে নৃত্য ও নানা উপসর্গের মাঝখানে তরুণদের হৃদয় স্ম্ফুর্তি। আমরা নতুন বছরের সংকল্পের কথা ছাত্রছাত্রীদের বোঝানোর চেষ্টা করি। বলি, নতুন কী পরিকল্পনা করলে আমার সঙ্গে শেয়ার করবে? অনেকেই বলে, না স্যার, নতুন কিছু ভাবিনি, ভেবেছি পুরনো বিদায় নেয় কেন, ভালোবাসা কেন স্মৃতি হয়ে লুকায়, নতুন কেন আসে না আমাদের জীবনে প্রতিশ্রুতি নিয়ে? তাই গতানুগতিকতায় গা ভাসিয়ে দেওয়া।

তুলনা করতে বসি বাঙালির জীবনের পহেলা বৈশাখ নিয়ে, পহেলা জানুয়ারির। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে জীবনের নানা বয়সের স্তরে পহেলা বৈশাখকে অনুভব করেছি। এটি বাঙালি জীবনের সবচেয়ে স্বর্ণালি দিন। এদিন নতুন খাতার উন্মোচন যেমন, তেমনি তরুণ বাঙালি জেনেছে, এটি বাংলাদেশের একটি উৎসব নয়, সমস্ত পৃথিবীতে উৎসবের একটি মহার্ঘ্য চিত্র। রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো সামনে চলে আসে, নজরুলও বসে নেই। 'আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে'। পহেলা বৈশাখ মানে টগবগে খুনের উল্লাস, পৃথিবীর আর কোথাও এমন দেখিনি। সুযোগ এসেছে জীবনে ইরানের নওরোজে যাওয়ার। ইরানি গুলবাগে নার্গিস ফুলের সৌরভে মাতানো সিরাজের নতুন বছর। পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। তুলনা করলাম আমার নব বৈশাখের সঙ্গে। ইরানে নেই কালো বৈশাখের কালো মেঘ, নেই উতল হাওয়া, নেই পদ্মা, মেঘনা, যমুনার অশান্ত কল্লোল। হাজারো বাঙালি কবির সুন্দর মননে আগামীর পটচিত্র। পহেলা বৈশাখ তাই, এখন আর শুধু বাঙালির নয়। সারা পৃথিবী জানে, এটি আমাদের স্বাতন্ত্র্যের একটি দুরন্ত পতাকা। সেখানে শুধু মিলনের গান, শুধু ভালোবাসার ক্ষণিক ঝলক। তরুণদের রক্তে আনে নতুন সুর, যা পৃথিবীতে বাঙালির জীবনে এনেছে এক নতুন স্বপ্নের দ্যোতনা। বাংলাদেশ তাই গর্ব করে তাদের পহেলা বৈশাখ নিয়ে।

এবার আসি মনের দুয়ারে। যারা ভালোবাসতে জানে, তাদের কাছে প্রতিদিনই ভালোবাসার। যেদিন চলে গেছে চোখের জলে ভেসে, সেদিন তো ফিরবে না। তাকে ফেরানো যায় শুধু গানে, সুরে, কবিতায়। কোনোদিন থেকে কোনোদিন আলাদা নয়। সবদিনই এক। হিসাব আলাদা। ক্যালেন্ডারও অনেক। গণনারও অনেক হিসাব। তাই কোনো শব্দকে জানলে হবে না। জানতে হবে তার অনুষঙ্গ। জানুয়ারির প্রথম দিনে যখন পড়ি :

দিন আলাদা নয়, সবদিনই এক/এমন একটি শব্দকে জান যার কোন অনুষঙ্গ নেই?/কখনও একটি গোলাপ ছিঁড়েছ, যা গোলাপ থেকে আলাদা?/তুমি নাম উচ্চারণ কর/এখন বুঝতে চেষ্টা কর নামের গভীরতার দিকটি/আকাশের চাঁদ, তার দিকে তাকাও, হ্রদে যে ছায়া পড়ে সেদিকে নয়/যদি শব্দের প্রতিই তোমার দুর্বলতা/আর সুন্দর অক্ষরগুলোর প্রতি আকর্ষণ কমাতে চাও/একটি আলিফ লেখ/সেখানে থাকবে না আলাদা অস্তিত্ব অথবা কোন আকৃতির বিশিষ্টতা/শুধু একটি উজ্জ্বল আঁধার যার চারদিকে/রসুলদের জ্ঞানরাশি, সেখানে নেই কোন গ্রন্থ/অথবা ব্যাখ্যাকারীরা।

দিন আলাদা নয়, সবদিনই এক। (মূল :জালালউদ্দিন রুমি, অনুবাদ : মু. জা. আ., রুমির অলৌকিক বাগান থেকে)।

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮

সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য