কপ্টার হুজুর ও ধর্মের নির্দেশনা

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮

  ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ফুরফুরা শরিফের হুজুর, চরমোনাইর হুজুর, শর্ষিনার হুজুরসহ বাংলাদেশ ও ভারতের অত্যন্ত বুজুর্গ হুজুরদের নাম, যশ ও খ্যাতির কথা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছিলাম। আমার মরহুম নানাজান ছিলেন একজন পীরে কামেল ও মানবতাবাদী মানুষ। তিনি ছিলেন ফুরফুরা শরিফের প্রখ্যাত পীর, ভারতীয় উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠতম আলেম ও সংস্কারক, শাহ সুফি হজরত আবুবকর সিদ্দিকের (রহ.) প্রিয়ভাজন খলিফা। একই সঙ্গে নানাজানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন শর্ষিনার মরহুম পীর হজরত নেছার উদ্দিন আহমদ (রহ.) ও ফুরফুরা শরিফের মহান পীরের জামাতা ও প্রতিভাধর আলেম হজরত রুহুল আমিন (রহ.)। নানাজানের মতো সিদ্ধপুরুষের সান্নিধ্যে আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে; যৌবনের উষালগ্নেই তাকে হারিয়েছি। ছোটবেলা থেকেই পীর, বুজুর্গ, সুফি, গাউস, কুতুব বা হুজুর হিসেবে যাঁরা সমাজে পরিচিত- তাঁদের প্রতি নানাজানের উদারনৈতিক, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের কারণে শ্রদ্ধাশীল থেকেছি। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়- শিক্ষার এ ধাপগুলো যতই একে একে অতিক্রম করতে থাকি, সমাজ-বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় ততই এ দেশের ধর্মীয় পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনকারী হুজুরদের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার জায়গাটি ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। এটি যে একেবারে সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য, তা কিন্তু নয়। তবে ব্যতিক্রম একেবারেই নগণ্য। নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের যে পরম শিক্ষা নানাজানের অমিয় সব বাণী ও বক্তব্য থেকে লাভ করেছিলাম, আশপাশের হুজুরদের মধ্যে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেসবের বিরাট ঘাটতি প্রত্যক্ষ করেছি। একেবারেই সর্বশেষে আলোচনার তুঙ্গে থাকা জনাকয়েক হুজুরের অভূতপূর্ব বিষয় দেখছি, যারা বর্তমানে হেলিকপ্টার হুজুর বলে বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন।

কথিত হেলিকপ্টার হুজুররা ওয়াজ-নসিহত করেন, ধর্মীয় নানা বিষয়ে ধর্ম সম্বন্ধে না জানা সাধারণ মুসলমানদের তারা বুঝিয়ে থাকেন। তাদের ওয়াজে, মাহফিলে, সভাগুলোতে সব শ্রেণি-পেশার মুসলমানরাই দোজাহানের অশেষ নেকি হাসিল করতে হাজির হয়ে থাকেন। মাহফিল আয়োজনের খাতিরে দশ, বিশ, একশ', পাঁচশ', এক হাজার, পাঁচ হাজার বা আরও কমবেশি টাকা করে চাঁদা দিয়ে থাকেন ধর্মপ্রাণ মানুষরা। এর মধ্যে বৃহত্তর খরচটি হলো ধর্মীয় বক্তা বা হুজুর, যাকে দাওয়াত দেওয়া হলো ওয়াজ করার জন্য- তার সম্মানী। এই সম্মানীর হার টাকার অঙ্কে পাঁচ হাজার, দশ হাজার, বিশ হাজার টাকা বা আরও বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিমাণ আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়; যা এক লাখ টাকা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। এখানে ২০০০ সালের একটি ঘটনা, যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল- উল্লেখ করতে চাই। এক ধনাঢ্য ব্যক্তি তার এলাকায় প্রচুর অর্থ ব্যয় করে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এলাকাবাসী সন্তুষ্টচিত্তে দানবীরের কাছে নিবেদন করলেন, যেন দেশের বিখ্যাত একজন ধর্মীয় বক্তাকে এনে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করা হয়। মসজিদ নির্মাণকারী শিল্পপতি এ প্রস্তাব মেনে নিয়ে ঢাকা শহরে সেই হুজুরের বাসায় এসে হাজির হলেন। তিনি হুজুরকে তার ও এলাকার মানুষের আগ্রহের কথা জানালেন। হুজুর বুঝতে পারলেন, কয়েকটা মাহফিল থেকে যা আয় করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি এখান থেকে পাবেন। তিনি ডায়েরি দেখে বলে দিলেন, ওইদিন কোনো সুযোগই নেই। কেননা তার আরও দুটি মাহফিল রয়েছে; তিনি ওয়াদা খেলাফ করতে পারবেন না। ধনাঢ্য আগন্তুকের মান-সম্মানের বিষয়, হুজুরকে যে নিতেই হবে। তিনি হুজুরকে বিনয়ের সঙ্গে সম্মানীর পরিমাণ জানিয়ে দিলেন। ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগলেন হুজুর আর একের পর এক কথায় আগন্তুক ভদ্রলোককে নিরাশ করতে লাগলেন। আমি বলতে পারি, সেদিন হুজুরের কোথাও মাহফিল ছিল না; শুধু টাকার পরিমাণ বাড়ানোর জন্যই তিনি এই অসত্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এ রকমই একজন সম্প্রতি পাবনার চাটমোহরে ওয়াজ করতে যান এবং চুক্তি অনুযায়ী ওয়াজ না করায় জনরোষের শিকার হন। হেলিকপ্টার তাকে ছাড়াই ছেড়ে যায়। অতঃপর পুলিশের হস্তক্ষেপে ট্রেনের টিকিট কেটে তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

বিনা পুঁজির ব্যবসা বলা হয় এ ধরনের অর্থ উপার্জনকে। এই ব্যবসায় অর্থের বিনিয়োগ নেই; কিন্তু প্রতিদিন অজস্র টাকাপ্রাপ্তির তৃপ্তি। এখানে এদের বিনিয়োগ হলো আল্লাহর কোরআন আর রাসুলের হাদিস, যা প্রকৃত অর্থে কোরআন ও হাদিসের অবমাননা। ইহুদি ব্যবসায়ী শাইলক আর ওয়াজ ব্যবসায়ী এসব হুজুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কোনো সম্মানিত আলেম যদি ধর্মীয় মাহফিলের দাওয়াত নেন, সেখানে উপস্থিত হয়ে অপেক্ষমাণ ধর্মপ্রাণ মানুষের হেদায়েতের জন্য ওয়াজ-নসিহত করেন এবং বিদায় বেলায় আয়োজকরা সন্তুষ্টচিত্তে যদি তাঁকে সম্মানী প্রদান করেন, সেখানে কোনো আপত্তি বা ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকার কথা নয়। কিন্তু এর আড়ালে ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি কাজে লাগিয়ে যেসব বক্তা চুক্তি করে আয়োজকদের সাধ্য-সামর্থ্যের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে বিনা পুঁজির এই ধর্মব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন, নিঃসন্দেহে এটি জুলুম। এ কাজের মধ্য দিয়ে তারা কোনোমতেই ইসলামের কল্যাণে অবদান রাখছেন না; বরং প্রকারান্তরে ইসলামকেই কলুষিত করছেন।

সাধারণ মুসলমানদের উচিত, ধর্মের আলখাল্লাধারী হেলিকপ্টার হুজুরদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সজাগ হওয়া, বস্তুনিষ্ঠভাবে শান্তি ও মানবতার ইসলামকে অনুধাবন করা এবং ব্যবসায়ী হুজুরদের থেকে নিজেদের দূরে রাখা। চিন্তা করে দেখুন, অন্যদের হেদায়েতে এরা কীভাবে কাজে লাগবে? আল্লাহপাকের বাণী-'ওয়াল্লাহু য়াহ্‌দি মাইশাউ ইলা সিরাতিম মুস্তাকিম' অর্থাৎ মহান আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে সঠিক পথের দিশা প্রদান করে থাকেন। আমরা সর্বক্ষেত্রে মহান আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী। আর তিনি বলেই দিয়েছেন- 'ওয়াল্লাহু য়াখতাস্‌সু বিরাহমাতিহি মাইয়াশাউ' অর্থাৎ মহান আল্লাহ যাদের খুশি তাদের ওপরে তাঁর রহমতকে বণ্টন করে দেন। আমরা যেন তাঁরই করুণাপ্রাপ্ত হয়ে আমাদের জীবনকে ধন্য করতে পারি।

লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ