রাজনীতিতে আদর্শবিচ্যুতি

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

  ড. সুলতান মাহমুদ রানা

তত্ত্বগতভাবে রাজনীতি এবং আদর্শ পাশাপাশি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক ক্ষেত্রে উল্টো স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। এখন আদর্শের নামে রাজনীতির মাঠে অভিনয় মঞ্চস্থ হয়। রাজনীতিকরা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন। যখন যেমন অভিনয় করার দরকার ঠিক তেমনটি করে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন ভোটের রাজনীতিতে। আর ভোটাররাও সেই অভিনয়ে অনেক সময় মুগ্ধ হয়ে ভালো-মন্দ বিচার করতে পারছে না। সাধারণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ যেভাবে চায়, সেভাবেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নির্ধারিত হয়ে থাকে। কাকে ক্ষমতা দিতে হবে আর কাকে দিতে হবে না- সেই বিচারটা নিশ্চয় জনগণ সূক্ষ্ণভাবে করে থাকে। আর আদর্শবিচ্যুতদের হাতে জনগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তুলে দিয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারবে- এটি আমি বিশ্বাস করি না। পাশাপাশি বিশ্বাস করি, আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ রাজনীতিতে ভণ্ড নেতাদের অপছন্দের তালিকাতেই রাখে। ভণ্ডামি আর ছল-চাতুরীকে পছন্দ করার সংখ্যা নিশ্চয় কম। ভোটারদেরও নিজস্ব একটি আদর্শ আছে। তারা দেখে-শুনে-বুঝে রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে চায়। এমনকি সচেতন ভোটাররা সব সময় একটি সুন্দর, গঠনমূলক রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে থাকে।

যেসব রাজনীতিবিদ জনগণের কাছে নিজের আদর্শ পরিস্কার করতে পারেন না কিংবা আদর্শ চর্চার নামে অভিনয়ে লিপ্ত থাকেন, তাদের কোনোভাবেই সাধারণ জনগণ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে না। তবে ভোটারদের মধ্যেও এমন মানুষ রয়েছে যারা যথাযথ আদর্শিক অবস্থান গ্রহণ করতে পারে না। এসব কারণে মোটা দাগে বলা যায়, রাজনীতি এখন দেশের বড় ব্যবসা।

একজন ব্যবসায়ী যেমন অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হাট-বাজারের ইজারা নিয়ে সেখান থেকে খাজনা তুলে মুনাফা করার চেষ্টা করেন, তেমনি আমাদের দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রটিও এখন ওই হাট-বাজারের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। অনেক রাজনীতিবিদই হাট-বাজারের মতো নির্বাচনী এলাকা ইজারা নিয়ে পাঁচ বছরে মুনাফার চেষ্টায় মত্ত থাকেন। আসলে রাজনীতির ভাবাদর্শ হলো- 'রাজনীতিবিদরা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবেন।' বাস্তবে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ এর উল্টো দৃশ্যমান।

সাধারণ নাগরিকরা এখন আদর্শ রাজনীতিবিদ ও ভণ্ড রাজনীতিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছে না। বিশেষ করে একাদশ সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক বাংলাদেশে মনোনয়নের রাজনীতিতে যে নোংরামি দেখা যাচ্ছে, তা থেকে প্রকৃত আদর্শ রাজনীতিবিদে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বড় দুই জোটের নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে কিংবা তাদের নির্বাচনী প্রতীকে ভোট করার লক্ষ্যে রাজনীতিকরা দীর্ঘদিন লালন করা আদর্শকে পদদলিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছেন না। এ ক্ষেত্রে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের আদর্শের সঙ্গে দ্বিমুখী নীতি প্রয়োগ করছে। বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দল থেকে আসা রাজনীতিবিদকে সহজেই ঠাঁই ও তৎক্ষণাৎ মনোনয়ন দিচ্ছে।

কারণ এ দেশের রাজনীতিতে একবার কেউ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে তাকে আর কোনোভাবেই জবাবদিহির মধ্যে আনা যায় না। একবার একজন নির্বাচিত হলে পরে তার নানা অপরাধ থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাকেই মনোনায়ন দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এটি কোনোভাবেই সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়। এতে ওই নেতার অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর বলেছিলেন, ছয় মাস পরপর এমপি-মন্ত্রীদের হলফনামায় বর্ণিত আয়-ব্যয়ের ফলোআপ করা হবে। কিন্তু পরে এই ফলোআপ কাজটি যথাযথভাবে হয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ছয় মাস পরপর মন্ত্রীদের কার্যক্রম তদারকির ভিত্তিতে প্রয়োজনবোধে তাদেরকে (মন্ত্রীদের) পরিবর্তন করা হতে পারে। সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। বরং কোনো কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বৃহৎভাবে তথা জাতীয় পরিসরে অভিযোগ এবং পদত্যাগের দাবি আসা সত্ত্বেও তারা বহাল রয়েছেন।

আমাদের রাজনীতিকরা নির্বাচনী গণতন্ত্রকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন, সেখানে ব্যক্তি ইমেজের কোনো মূল্য নেই। আর মূল্য নেই বলেই প্রতীক পাওয়ার লক্ষ্যে দলত্যাগের প্রবণতাও অধিক সংখ্যায় পরিলক্ষিত হয়। যদি তৃণমূলের পোড়খাওয়া সৎ রাজনীতিবিদরা ভোটারের কাছে সঠিক মূল্যায়ন পেতেন, তাহলে কিছুটা হলেও আদর্শবর্জিত রাজনীতির সংশোধন আসত। কিন্তু অর্থ-বিত্ত, পেশিশক্তি আর প্রতীক পরিচিতির রাজনীতির মানদণ্ডে আদর্শবাদীরা হেরে যাচ্ছেন।

এমনকি রাজনীতির সঙ্গে কোনো অতীত যোগাযোগ নেই; সুখে-দুঃখে দলকে এগিয়ে নেওয়ায় কোনো ভূমিকা কখনও রাখেননি তেমন ব্যক্তিদের রাতারাতি মনোনয়ন পাওয়ার প্রবণতাও রাজনীতিকে কলুষিত করছে। জাত-পরিচয় খুইয়ে হলেও ক্ষমতার সিঁড়িতে পা রাখতে সম্প্রতি বেশ কিছু রাজনীতিবিদ দলত্যাগের নিকৃষ্টতম পর্যায়ে পৌঁছেছেন। ক্ষমতার লোভে যেসব রাজনীতিবিদ আদর্শকে লাথি মেরে জাত-কুল-মান বিসর্জন দিতে পারেন, তাদেরকে ব্যালট পেপারেই জবাব দিয়ে রাজনীতিকে শুদ্ধ করতে পারে একমাত্র ভোটাররাই।

এ ক্ষেত্রে দেশের সচেতন তরুণ ভোটারদের বিশেষ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে যেখানে মোট ভোটার সংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশই তরুণ, সেখানে এই দায়িত্বটা তাদেরই। যদিও তরুণ ভোটারের কোনো সংজ্ঞা নেই, তবে ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সের ভোটারদেরই তরুণ ভোটার বলে বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশ সংজ্ঞায়িত করে থাকে। তরুণ ভোটাররাই একটি দেশের ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু দলাদলি আর দলীয় মনোনয়নের বাইরে কোনো যোগ্য ব্যক্তি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না বিধায় তরুণদেরও এ বিষয়ে আগ্রহ কমে গেছে। এমনকি তরুণদের মধ্যেও ইদানীং দলীয় মনোভাব বিরাজ করছে কিছু ক্ষেত্রে। এ কারণে আদর্শবিচ্যুতদেরও প্রতীক কিংবা দলীয় বিবেচনায় তরুণরা অনেক সময় ভোট দিয়ে থাকে।

তবে সচেতন তরুণ সমাজকে প্রার্থী নির্বাচনে যথাযথ এবং ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা রাখতে হবে। তরুণ ভোটাররাই প্রার্থীদের নূ্যনতম আদর্শ অনুসন্ধানের দায়িত্বটা নিতে পারে। এ কারণে প্রয়োজনবোধে আইন করে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও তরুণদের সম্পৃক্ত করার বিধান রাখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সাধারণ ভোটারদেরও বিশেষভাবে আকৃষ্ট করা যায়। কারণ তরুণদের সচেতন ভূমিকাই আদর্শবিচ্যুত রাজনীতিবিদদের মুখে চপেটাঘাত করতে পারে।

সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
sultanmahmud.rana@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ