নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

 নয়া রাষ্ট্রদূত কী বার্তা নিয়ে এসেছেন?

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার।

  আহমেদ সুমন

একাদশ সংসদ নির্বাচন আসন্ন। এই সময় ঢাকায় এসেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়া রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। নির্বাচনের এই যুগসন্ধিক্ষণে তিনি কী বার্তা নিয়ে এসেছেন, তা নিয়ে কমবেশি স্বাভাবিক কৌতূহল রয়েছে। প্রায় পৌনে চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে ঢাকা ছেড়ে ওয়াশিংটন চলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেন ব্লুম বার্নিকাট। রবার্ট মিলার ১৬তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে ইতিমধ্যে স্বীয় পদে যোগদান করেছেন। ১৮ নভেম্বর ২০১৮ ঢাকায় পা দিয়েই তিনি পূর্বসূরি বার্নিকাটকে অনুসরণের অঙ্গীকার করেছেন। বার্নিকাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়কালে ঢাকায় এসেছিলেন। ইতিমধ্যে মার্কিন প্রশাসনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে রবার্ট মিলার ঢাকায় এসেছেন। মার্কিন প্রশাসনে পালাবদল ঘটলেও দেশটির বিদেশ নীতিতে যে খুব একটা হেরফের হয় না, সেটা রবার্ট মিলারের প্রাথমিক মন্তব্য থেকে পরিস্কার হয়েছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে রবার্ট মিলার ঢাকায় দায়িত্ব নিয়েছেন। ঢাকায় আসার আগে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ প্রসঙ্গে রবার্ট মিলার এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করার একটি সুযোগ। এ জন্য প্রয়োজন জনগণের মতের প্রতিফলন হয় এমন একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন। সব রাজনৈতিক দলের মুক্তভাবে নিজেদের সভা-সমাবেশ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড করার স্বাধীনতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক সদস্য এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া নিজেদের মতপ্রকাশ করতে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে রবার্ট মিলার পূর্বসূরি বার্নিকাটের নীতি তুলে ধরে বলেছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্রের প্রসারে বার্নিকাট অগ্রগামী ছিলেন।

রবার্ট মিলার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের আদ্যোপান্ত জেনেছেন। এ পর্যন্ত তার উচ্চারিত বক্তব্য-বিবৃতিতে সে কথার স্পষ্ট আভাসও পাওয়া গেছে। রবার্ট মিলার তার বিবৃতিতে মোটাদাগে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন, যা নিবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা যদি তা বিশ্নেষণ করি তবে দেখি, আসন্ন নির্বাচন তিনি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনরায় নিশ্চিত করাকে 'সুযোগ' বলেছেন। এই সুযোগ বলতে তিনি এটা বোঝাতে চাচ্ছেন যে, দশম সংসদ নির্বাচনে গণতন্ত্রের প্রতিফলন ঘটেনি এবং দেশে আইনের শাসনের ঘাটতি আছে। জনগণের মতের প্রতিফলন ঘটে, এমন গ্রহণযোগ্য ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের কথা বলে তিনি আসলে নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব তুলে ধরেছেন। নির্বাচন নিয়ে মার্কিন প্রশাসন আশা করছে, এবার নির্বাচনে জনসাধারণ স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে কোনো প্রকার বাধাবিপত্তি ছাড়া ভোট দিতে পারবে এবং নির্বাচনী ফলাফলে জনরায়ের প্রতিফলন ঘটবে। আমরা লক্ষ্য করছি, সাম্প্রতিককালে বিরোধী দল বিএনপির রাজনীতি গুলশান এবং নয়াপল্টনের কার্যালয় থেকে রাজপথে ফিরে এসেছে। এই দৃশ্য বার্নিকাট তার সময়কালেই প্রত্যক্ষ করে গেছেন। রবার্ট মিলারও নিশ্চয় এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। রবার্ট মিলার মতপ্রকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন। বাস্তবে বিষয়টি কীরূপ ধারণ করেছে, তা নিয়ে মতান্তর রয়েছে। সরকার পক্ষ দাবি করছে, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে বলেই রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনাসহ ইচ্ছামতো কথা বলছেন। আমরা মনে করি, রবার্ট মিলার হয়তো সরকার এ ক্ষেত্রে আরও উদার হবে- সে প্রত্যাশা করছেন। ধারণা করছি, রবার্ট মিলার হয়তো দেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। দূতাবাস অফিসগুলোতে রাজনৈতিক সচিব থাকেন। রবার্ট মিলার নিশ্চয় ইতিমধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতির ভেতর-বাইরের চালচিত্র জেনেছেন।

এ কথা সবাই জানেন, বিরোধী দলের বর্জন এবং প্রতিহতের মধ্য দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ধরন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা নিয়ে পক্ষের মতামত অগ্রহণযোগ্য না হলেও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ছিল ও আছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের চালচিত্রে ভালো খবর এই যে, এই নির্বাচনে সব দলই অংশগ্রহণ করছে। বিগত সংসদ নির্বাচন যে দাবিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার শরিক এবং অপরাপর দলগুলো বর্জন করেছিল, বর্তমানে সেই দাবি বিদ্যমান থাকলেও কার্যত তার বাস্তবায়ন হয়নি। এতদসত্ত্বেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে সব দলই অংশগ্রহণ করছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ তার শক্তি ও সামর্থ্য প্রয়োগ করে বিরোধী পক্ষকে কাবু করতে সক্ষম হয়েছে। দলীয় প্রার্থী পদের চিঠি বিতরণকালে বিরোধী দল বিএনপি মহাসচিবের দলীয় চেয়ারপারসনের কথা মনে করে কান্নার দৃশ্য সেই অসহায়ত্বকে আবেগঘন করেছে। সরকারি দল ও তাদের মিত্র দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য এ উৎসব বাস্তবে রূপ নিলেও সরকারবিরোধীদের ক্ষেত্রে উৎসবে ভাটা আছে। মামলা মোকদ্দমা ও থানা-পুলিশের দৌড়ানিতে বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মী নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নির্বিঘ্নে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। তারপরও তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার কথা জানান দিচ্ছে। নয়া রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার হয়তো শিগগিরই এসব বিষয়ে কথা বলতে শুরু করবেন।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারের ইতিমধ্যে বিবৃত মন্তব্যগুলোর সঙ্গে সাধারণভাবে দ্বিমত পোষণের কিছু নেই। তবে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্নেষণে ধরা পড়ে, তার কথাগুলোর মধ্যে এক ধরনের খবরদারির প্রয়াস রয়েছে। ধারণা করা যায়, রবার্ট মিলার কয়েকদিনের মধ্যেই আসন্ন নির্বাচন এবং অন্যান্য বিষয়ে মুখ খুলবেন। নিশ্চয় তিনি বাংলাদেশের ভালো-মন্দের এবং পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট বিষয়াদির অংশীজন হিসেবে ভেতরে-বাইরে এলিসন ব্লেক এবং হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে আলোচনা করবেন। হর্ষবর্ধন শ্রিংলার পূর্বসূরি পঙ্কজ শরণ সংবিধানের বাধ্যবাধকতা রক্ষার যুক্তিতে দশম সংসদ নির্বাচন যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হোক না কেন, তার পক্ষে একাট্টা ছিলেন। ঠিক তার উল্টো অবস্থানে ছিলেন ড্যান মজীনা। শুধু তাই নয়, নির্বাচনোত্তর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পুনরায় শপথ গ্রহণের পরও ড্যান মজীনা ওই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন অব্যাহত রেখেছিলেন। বিএনপিসহ সব দলের অংশগ্রহণের জন্য আগাম নির্বাচনের কথাও বলেছেন। এ জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের কেউ কেউ ঠাট্টার ছলে ড্যান মজীনাকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলে উল্লেখ করতেন। ড্যান মজীনা-উত্তর বর্তমান সরকারের ওপর মার্কিন নীতি এখন অনেকটা বদলে গেছে। নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফর করেন। চীন-ভারত শীতল যুদ্ধ দীর্ঘদিনের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেটা ভালোভাবেই জানেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চীনের একক খবরদারিত্ব খর্ব করা নিমিত্ত সে সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে দক্ষিণ এশিয়ার অপরাপর দেশগুলোর ওপর ভারতীয় খবরদারিত্ব প্রকান্তরে কর্তৃত্ব বৃদ্ধির মনোভাব প্রকাশ করেন। ভারত মনে করে, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের এ কর্তৃত্ব প্রয়োজন। পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্নিষ্ট বিষয়াদির হিসাবনিকাশের বোঝাপড়ায় সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবে অভিন্ন মত পোষণ করেন। এ কারণে আমরা বার্নিকাটের আচার-আচরণে ড্যান মজীনার মতো আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী অসহিষুষ্ণ মনোভাব লক্ষ্য করিনি। যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনও আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী দৌড়ঝাঁপে অংশ নেননি। গিবসনের উত্তরসূরি এলিসন ব্লেক অনেক দিন হয় ঢাকায় এসেছেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের প্রতি দমন-পীড়ন ইত্যাদি নিয়ে তার তেমন উচ্চবাচ্য লক্ষ্য করিনি। এখন রবার্ট মিলার, এলিসন ব্লেক এবং হর্ষবর্ধন শ্রিংলা- এই ত্রয়ী মিলে হয়তো চাচ্ছেন শেখ হাসিনার অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। জনরায়ে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করুক।

গবেষক
asumanarticle@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ