পানি জীবন পানিই মরণ

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

পানি জীবন পানিই মরণ

  ডা. সাইফুল আলম

আমার বন্ধু কিসমিস আলীকে এতটা মনোযোগী হতে আমি আগে কখনও দেখিনি। পার্কে ও লেকের ধারের একটি বেঞ্চে বসে ও একটা ছোট্ট সিরামিকের বাটিতে কিছুটা পানি সংগ্রহ করে একটা ম্যাগনিফাইং গল্গাসের সাহায্যে কী যেন পরখ করে চলেছে। গল্গাসটিকে একবার বাম চোখে আরেকবার ডান চোখের কাছে এনে একজন অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্টের মতো ও যেন পানিতে কিছু খুঁজছে।

মর্নিং ওয়াকে আসা নারী-পুরুষের কেউ কেউ তাকে লক্ষ্য করলেও অধিকাংশই তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। আমিও ওই হাঁটা মিছিলের একজন সদস্য হলেও কিসমিসের মতো প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে এ অবস্থায় উপেক্ষা করতে না পেরে ধীর ও নিঃশব্দ চরণে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার দিকে ও যেন একটি মলিন দৃষ্টি ফেলে চোখের ইশারায় বেঞ্চে ওর পাশে আমাকে বসতে ইঙ্গিত করল। আমিও অনেক দিন পর সুবোধ বালক সেজে ওর পাশে বসে দৃশ্যটি অবলোকন করতে লাগলাম। আমার উষ্ণ উপস্থিতিতে ও যেন আর দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস চাঙ্গা হয়ে ওর গবেষণার কর্মকাণ্ডটিকে আরও দ্বিগুণ মনোযোগী করে তুলল। প্রায় পৌনে সাত মিনিট অপেক্ষা করার পর আমার ধৈর্যের বরফ গলতে শুরু করল। আমি ওর তেজপাতা মার্কা প্রবীণ কানের কাছে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

-দোস্ত, ব্যাপারটি কী? এভাবে কী গবেষণা করছ? তুমি কি এই শেষ বয়সে পানিবিজ্ঞান নিয়ে মসলা বাটা শুরু করলে নাকি?

-হুম। কিসমিস যেন ধ্যান ভঙ্গ হয়ে আমার পানে তাকিয়ে একটা ভাঙাচোরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আমি বিষয়টার কোনো কূলকিনারা না পেয়ে আবার শুধালাম, তা বাটির পানিতে কী এমন রত্নের সন্ধান করছ দোস্ত?

-ব্যাকটেরিয়া! লেকের পানির ব্যাকটেরিয়া। কিসমিসের ত্বরিত উত্তরটি যেন আবহাওয়া অফিসের আট নম্বর মহাবিপদ সংকেতের মতো আমার বুকের পাঁজর ভেদ করে বাইপাস সার্জারি করা হূৎপিণ্ডের দেয়ালে ধাক্কা দিল। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললাম, কিন্তু এ সামান্য খেলনা ম্যাগনিফাইং কাচ দিয়ে ব্যাকটেরিয়া অনুসন্ধান করাটা কি সম্ভব?

-দোস্ত, মহানগরীর নদীনালা আর লেকের পানি এতটাই বিষাক্ত হয়ে পড়েছে যে, ম্যাগনিফাইং গল্গাস কেন, অচিরে খালি চোখেই নানা প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার গেট টুগেদার অনুষ্ঠান পানিতে অনায়াসেই দেখা যাবে, হিঃ হিঃ হিঃ। কিসমিসের যেন একটু লঘু সুরের হাসি মাখিয়ে তার মন্তব্যটি পেশ করল। -তা মন্দ বলোনি। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহানগরীর সরবরাহকৃত খাবার পানিতে নাকি যথেষ্ট মাত্রায় ডায়রিয়ার জীবাণু পাওয়া গেছে। আমার কথাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, সামনের রাস্তা দিয়ে তথাকথিত মিনারেল ওয়াটার ভর্তি কয়েকটি পল্গাস্টিকের জারবোঝাই একটি ভ্যানগাড়ি দ্রুত চলে গেল। সেদিকে তাকিয়ে কিসমিস বলল :দোস্ত, খাবার পানিভর্তি ওই জারগুলোর গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত শরীরের বেহাল দশা দেখলেই বোঝা যায়, পানির বিশুদ্ধতা কতখানি। অভিযোগ আছে, অনেক নিম্নমানের পানি কোম্পানি নাকি ওয়াসার পানি পল্গাস্টিকের জারে ভরে বাজারে মিনারেল ওয়াটার বলে চালিয়ে লাভের খাতা পুষ্টিকর করছে। অথচ দেখার কেউ নেই। আমি বললাম, তাছাড়া ফুটপাতের ধারের নানা রঙবেরঙের শরবতের পানি, আখের রসে বরফের নোংরা পানি, চটপটি-ফুচকায় তেঁতুলের পানি, কিছু অসাধু গোয়ালার দুধে নদী বা কলের পানি, বাজারের শাকসবজিতে ফরমালিন মেশানো পানি, আহারে; পানির একি অপব্যবহার! আমার ভটভটি মার্কা গতির মন্তব্যটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিসমিস এবার উঠে দাঁড়িয়ে ওর শুকনো সুপারি মার্কা শরীরটা কিছুটা আড়মোড়া দিয়ে বলল, দোস্ত, চলো সামনের বাজারটায় যাই কয়েকটা ছোট-বড় সাইজের শিশি বোতল কিনতে হবে।

কেন? শিশি বোতল দিয়ে কি তুমি এবার রূপকথার সেই জিন-পরীকে বন্দি করার মতলব করছ নাকি? আমি আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলাম। -না, তা নয়। তবে আজ আমি মহানগরীর বিভিন্ন খাল-বিল আর নদীর পানি ওই সব শিশি-বোতলে সংগ্রহ করব। যাব বুড়িগঙ্গার ধারে, আরও যাব তুরাগের পাড়ে। তারপর কোনো গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষার আবেদন করব। আমি কিসমিসের এ ধরনের অভিপ্রায়ে যারপরনাই বিচলিত হয়ে ওকে পরাস্ত করার জন্য বললাম, কিন্তু মহানগরীর যানজটের কোষ্ঠকাঠিন্যে পড়ে এত সব জায়গায় পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে যে তোমার শরীরের পানি কতটা শুকিয়ে যাবে, তা একবার ভেবে দেখেছ? - হুম। তা মন্দ বলোনি। কিসমিস মুহূর্তে যেন আমার সাবধানবাণীটি আঁকড়ে ধরে কিছুটা সংকল্পচ্যুত হলো। তারপর পুনরায় বেঞ্চে বসে আবার বলল, দেশের চিকিৎসকদের মতে, মহানগরীতে দূষিত পানিবাহিত রোগ, যেমন- টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়রিয়া ইত্যাদি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে অথচ আমরা কেউই সাবধান হই না। আমি এবার কিসমিসের সহানুভূতিমূলক তথ্যটিতে শঙ্কিত হয়ে বললাম :আবার দেখা যায় কোনো মহলল্গা বা রাস্তার ধারের স্যুয়ারেজের বিষাক্ত হলুদিয়া পানি পাইপের ছিদ্রপথে বেরিয়ে ওই এলাকাটাকে শুধু স্নান করিয়েই দেয় না বরং এতে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকিরও সম্ভাবনা দেখা দেয়।

-তাছাড়া সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর অনেক এলাকা যে পানির রিজার্ভ ট্যাঙ্কিতে পরিণত হয় আর তাতে যে অনায়াসে ডুবসাঁতার দেওয়া যায়, তা নিশ্চয় তোমার অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে জমা করেছ। কথাগুলো বলে কিসমিস আবার উঠে দাঁড়িয়ে ওর আশপাশটায় একবার ইতিউতি চেয়ে হাতের বাটির পানিটুকু লেকটায় ঢেলে দিল। আমি ওর এহেন গুডবয়সুলভ কাণ্ড দেখে নিজের অজান্তেই হাততালি দিয়ে উঠলাম। কিসমিস আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য মুচকি হেসে আমার পাশে এসে বসল। কিছুক্ষণ নীরবতার সঙ্গে বলড্যান্স দিয়ে আমি আমার কণ্ঠে দু'চামচ শরমের গুঁড়া মসলা ছিটিয়ে বললাম :দোস্ত, অনেক বিনোদন কেন্দ্র অথবা অভিজাত এলাকার সুইমিং পুলে সন্তরণ অবস্থায় অনেকের বিরুদ্ধে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে জলাধারের পানিকে দূষিত করার অভিযোগও শোনা যায়। কিসমিস যেন আমার অভিযোগনামাটি তেমন আমলে না নিয়ে সামনের লেকের তরঙ্গায়িত পানির স্রোতের পানে কিছুক্ষণ নীরবে চেয়ে থেকে বলল :দোস্ত, মহানগরীর এই বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ আর যানজটদূষণের মাঝে পানিদূষণও যেন তার আসনটি চিরবন্দোবস্ত করে নিয়েছে। আমি বললাম :দোস্ত, চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, আমাদের শরীরের গঠনের পঁচাত্তর ভাগই পানি। পানি ছাড়া জীবন অচল। তাই তো পানির অপর নাম জীবন। কিসমিস আমার এ ধরনের মাস্টারিসুলভ লেকচারটার লেজে যেন কিছুটা সুড়সুড়ি দিয়ে থেমে থেমে দু'বার মিহি কণ্ঠে হেসে উঠল হিঃ হিঃ হিঃ! হুঃ হুঃ। আমি কিছুটা হতাশা নিয়ে বললাম, কী বিষয় দোস্ত। তোমার এভাবে পানিশূন্য হাসির উদ্দেশ্য কী? ও এবার বলল, দোস্ত, বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- পানিই জীবন, পানিই মরণ। আমি ওর মন্তব্যের তাৎপর্যটা অনুভব করলেও প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম, চল, এবার না হয় ওঠা যাক। -বেশ, তাই চল। কিসমিস সম্মতি জানাতেই আমরা উঠে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই লক্ষ্য করলাম, একজন স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী লুঙ্গিতে মালকোঁচা বেঁধে উদোম গায়ে লেকের পানিতে হাঁটু পর্যন্ত নেমে মাছের নোংরা গামলাগুলো পরিস্কার করছে। শুধু তাই নয়, সে মনের আনন্দে উচ্চস্বরে গান গাইছে, সাধের লাউ বানাইছে মোরে বৈরাগী...হা...হা... বানাইছে মোরে বৈরাগী! হা...হা...।

দৃশ্যটি দেখে আমরা দুই সনাতনী বন্ধু নীরবে মাথা নত করলাম। জানি না লজ্জায়, নাকি ঘৃণায়!

সাবেক ডেন্টাল সার্জন, বিডিআর হাসপাতাল, ঢাকা


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ