আশার ঘরে বাসা

নির্বাচন ও রাজনীতি

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮

আশার ঘরে বাসা

  দেবব্রত চক্রবর্তী বিষুষ্ণ

সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। সাংবিধানিক এই বাধ্যকতা মেনে নিয়ে বলা যায়, শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনের ক্ষণগণনা। দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২৮ জানুয়ারি এবং সে অনুযায়ী ৩১ অক্টোবর থেকে নির্বাচনের ক্ষণগণনায় গণ্ডিবদ্ধ হয়ে গেছে দেশ। ইতিমধ্যে নির্বাচন-সংক্রান্ত মুখ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তারা প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ করে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে এর বিপরীতে ইতিমধ্যে এ কথাও বলা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে- এ কথা বলা হলেও জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারে এমন কিছু তারা এখন পর্যন্ত করতে সক্ষম হয়নি। এ নিয়ে বিতর্ক ফুরাবার নয়। অতীতেও বহুবারই এমন বিতর্ক পরিলক্ষিত হয়েছে।

ইতিপূর্বে নির্বাচন কমিশনের ভেতরে মতবিরোধ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর মধ্যে বিভাজনের সৃষ্টি করেছিল এবং এমতাবস্থায়ই তারা জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় ধরনের কর্মযজ্ঞ সম্পন্নের প্রস্তুতি চালাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, আগামী সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের দায়দায়িত্ব অনেক বেড়ে যাবে এবং কর্মপরিধিও সঙ্গতই হবে বিস্তৃত। নির্বাচন কমিশনের তরফে এখন যেসব বিষয় তাদের এখতিয়ারবহির্ভূত বলে বলা হচ্ছে, তখন আর এমনটি বলার অবকাশ থাকবে না। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু জরুরি শর্ত তো অবশ্যই রয়েছে। এর মধ্যে সবার জন্য সমঅধিকারের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' অর্থাৎ অধিকারের 'সমতল ভূমি' নিশ্চিতকরণের প্রসঙ্গে ইতিমধ্যে বিস্তর কথাবার্তাও হয়েছে। এখন যদিও এসব ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা এখতিয়ারের প্রসঙ্গ সামনে আনার অবকাশ পাচ্ছেন; কিন্তু ভবিষ্যতে, অর্থাৎ তফসিল ঘোষণার পর সঙ্গতই সেই অবকাশ আর থাকবে না। সবার জন্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে 'সমতল ভূমি' নিশ্চিতকরণের বিষয়টি অবশ্যই অপরিহার্য বটে; কিন্তু আমাদের দেশের মতো বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই এ বিষয়টি নিয়ে এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কিংবা আলোচনা-পর্যালোচনা শোনা যায় না।

এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক সব রকম নেতিবাচকতা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটের কারণগুলোও আমাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট। এর মধ্যে আস্থার সংকট বড় বেশি নেতিবাচকতা পুষ্ট করেছে কিংবা করছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা রকম সংকট বিরাজ করছে, তবে এর মধ্যে বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বিরোধী পক্ষের ওজর-আপত্তির বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা রকম সমীকরণও চলছে। এই সমীকরণ ক্রমে পুষ্ট হচ্ছে রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে। হঠাৎ করেই বহুবিধ রাজনৈতিক শঙ্কার মধ্যে আশার আলোরেখা ফুটে উঠেছে। যদিও এই আশার আলো শেষ পর্যন্ত কতটা পূর্ণতা পাবে, এ নিয়েও নানা রকম সংশয় রয়েছে। কিন্তু একটা কথা তো সত্য যে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংকট সামনে রেখে আলোচনার পথ খুলে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সংলাপ বা আলোচনা অর্থবহ কিংবা ফলপ্রসূকরণের জন্য সব পক্ষের উদার মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়টিকে কোনোভাবেই বলা যাবে না তাৎপর্যহীন।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দফায় দফায় রাজনৈতিক দল কিংবা জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনার দরজা খুলে দিয়ে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছেন- এই অভিমত ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে পাওয়া গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, অবাধ করার দাবি দেশ-বিদেশের নানা মহল থেকে বারবার উত্থাপিতও হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি প্রশ্নমুক্ত করতে এরই অংশ হিসেবে হয়তো প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ করার দায়টা কিন্তু শুধু নির্বাচন কমিশন ও সরকারেরই নয়। এ ক্ষেত্রে দায় রয়েছে নির্বাচন-সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের এবং এমনটি যদি আন্তরিকভাবে সবাই চায়, তাহলে নূ্যনতম কিছু বিষয়ে তাদের ঐকমত্যে পৌঁছতেই হবে সময়ক্ষেপণ না করে।

সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্নে যারা তাড়িত, তারা নিশ্চয়ই এ কথাটা বিশ্বাস করবেন যে, যথার্থ গণতন্ত্রই সেই সমাজ কাঠামো তৈরির অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বাস্তবতায় রাজনীতিতে সংঘাত-হানাহানি অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সূচনা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা ও রাজনীতিকের যৌথ পরিকল্পনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে। স্বাধীন বাংলাদেশে একটানা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি কখনও স্থিতিশীল থাকেনি। রাজনীতিকদের একাংশের ক্ষমতার লোভ, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ আমাদের অনেক অর্জনেরই শুধু বিসর্জন ঘটায়নি, একই সঙ্গে তারা অন্ধ হয়ে শুধু নিজের পায়ের নিচে মাটি আঁকড়ে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে সভ্যতাকেও কলঙ্কিত করেছেন। এই গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থান্বেষী মহলের হীন চেষ্টা আধুনিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় দেশের সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রের জন্য এত ত্যাগ সত্ত্বেও।

আন্তরিক প্রচেষ্টায় পরস্পরের মতের প্রতি সহিষুষ্ণ আচরণ করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ তৈরিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন মহল থেকে ইতিমধ্যে কম ব্যক্ত হয়নি। কিন্তু প্রায় সব আশাই দুরাশায় রূপ নিয়েছে কখনও কখনও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। এই যে আজ স্বচ্ছ-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে বিরোধী পক্ষের তরফে, বিশেষ করে বিএনপির নেতৃবৃন্দের এত কথা শোনা যায়, তারা কি ভুলে গেছেন মাগুরাসহ তাদের শাসনামলের আরও কিছু কদর্যপূর্ণ অধ্যায়ের কথা? এত কিছুর পরও শান্তিপ্রিয় মানুষমাত্রই প্রত্যাশা পোষণ করেন যে, সুস্থধারার রাজনীতি চর্চা ও অনুশীলনের পথ মসৃণ হবে এবং রাজনীতিটা রাজনীতিকদের হাতেই থাকবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের বহুবিধ কর্মকাণ্ডের আরও বিস্তার ঘটবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি মানতে সবাইকে বাধ্য করা, সবার জন্য সমতল ভূমি নিশ্চিত করা। তাদের অবস্থান যেমন হতে হবে নির্মোহ কিংবা পক্ষপাতহীন, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও হতে হবে কঠোর। তবে এও সত্য যে, আইন যত কঠোরই হোক না কেন, যদি তা যথাযথভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে সব শুভ প্রত্যাশাই মাঠে মারা যেতে বাধ্য।

সাংবিধানিকভাবে আমাদের নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার ঘাটতি নেই। আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন আইনি সুরক্ষার দিক থেকে শক্ত অবস্থানেই আছে। স্বাধীনতা-উত্তর দৃষ্টান্তযোগ্য কয়েকটি নির্বাচন করতে সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে আমাদের নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এই নির্বাচন কমিশনকে ঘিরেই কেন ও কীভাবে আস্থার সংকট সৃষ্টি হলো, এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। সাম্প্রতিককালে স্থানীয় সরকার কাঠামোর কয়েকটি স্তরে নির্বাচনকালে এই আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশন অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করতে পারেনি- এই অভিযোগ আছে। নির্বাচন-সংক্রান্ত মুখ্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের আদেশ-নির্দেশ নির্বাচনকালীন সরকারের অমান্য করার অবকাশই নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এরই মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন রেখা মোটা হয়েছে। সচেতন মানুষমাত্রই এখন এই আশা পোষণ করেন যে, অতীতের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা আগামী জাতীয় নির্বাচনের সব করণীয় ঠিক করে দৃষ্টান্তযোগ্য নির্বাচন করতে সক্ষম হবেন। আশার ঘরেই তো মানুষের বাসা।

deba_bishnu@yahoo.com

সাংবাদিক


মন্তব্য যোগ করুণ