তিনি আছেন বলেই

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮

তিনি আছেন বলেই

  আবেদ খান



কিছুদিন আগে রুদ্র সাইফুলকে বলেছিলাম, 'রুদ্র, এই সুদীর্ঘ পেশাগত জীবনে তো অনেক কিছুই দেখলাম, রইলাম অনেক কিছুর সঙ্গেও। এখন একটি কাজ যদি না করা হয়, তাহলে আমার বিবেক ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। তুমি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি আর আমি বটবৃক্ষের মতো বিগত প্রায় সাতটি দশক এই গাঙ্গেয়বঙ্গের রাজনৈতিক স্রোতোধারা অবলোকন করলাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পর এই ভূখণ্ডে যিনি সত্যিকারভাবে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই মানুষটিকে নিয়ে একটা সংকলন করতে হবে। আমাদের বিত্ত নেই বটে; কিন্তু চিত্ত তো আছে আর হাতে আছে কলম। এসো রুদ্র, আমরা কিছু একটা করি।'

রুদ্র তার অসাধারণ কর্মদক্ষতা দিয়ে অতি দ্রুততার সঙ্গে সংকলনের সব আয়োজন সমাপ্ত করল এবং আমি মুগ্ধ হলাম এই বিশ্বাস থেকে যে, কত গভীর শ্রদ্ধাবোধ থাকলে কোনো দিকে না তাকিয়ে, এমনকি ব্যয়ের বিষয়টিও না ভেবে এই অতিশয় শ্রমসাধ্য কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ঠিক এই সময় শুরু হলো একটি অসাধারণ তথ্যচিত্র-'হাসিনা এ ডটার্স টেল'। শুনলাম, প্রেক্ষাগৃহগুলোর প্রতিটি শো জনাকীর্ণ। টিকিট সংগ্রহ করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। সৌভাগ্যবশত টিকিট পেয়ে গেলাম। পরিপূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ। জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হওয়ার পর স্বল্প বিরতিতে শুরু হলো তথ্যচিত্রটি। ৭০ মিনিটের এই তথ্যচিত্র শুরু হওয়ার পর রুদ্ধশ্বাসে প্রতিটি দর্শক যেন আরও কিছু দেখতে চেয়েছে বলে মনে হলো। ছবি শেষ হলেও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিটি দর্শক- হৃদয়তন্ত্রীতে অনুধাবিত হচ্ছে ভিন্নসুরে পান্নালাল ভট্টাচার্যের কালজয়ী মর্মভেদী ওই দুটি চরণ- 'আমার সাধ না মিটিলো, আশা না পুরিল / সকলই ফুরায়ে যায় মা...।'

হল থেকে বেরিয়ে আমরা চারজনই স্তব্ধ হয়ে রইলাম কিছু সময়, কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছিলাম না। পর্দার নিঃশব্দ অশ্রুপাত যে এমন করে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে, সেই সময় আমরা চারজনই যেন অনুভব করলাম। তথ্যচিত্র নিয়ে বিশ্নেষণ করার মতো বোদ্ধা আমি নই। রবীন্দ্রনাথ সবসময় পণ্ডিতদের সেই চিরন্তন বিতর্ক 'তৈলাধার পাত্র না পাত্রাধার তৈল' নিয়ে কটাক্ষ করতেন। আমি অবশ্য শিল্পস্রষ্টা কিংবা শিল্পবিশ্নেষকও নই। নিতান্তই একজন অনুরাগী মাত্র। ভালো সৃষ্টি হলে আনন্দ অনুভব করি। সেই হিসেবে বলতে পারি, ছবিটি দেখে আমি অপার আনন্দ অনুভব করেছি- এটা যেমন সত্য, তেমনই শোকার্ত হয়েছি স্বজন হারানো দুই নারীর যন্ত্রণাবিদ্ধ স্মৃতিচারণে।

কবি নজরুল তাঁর এক কবিতার শেষাংশে এই দুটি চরণ ব্যবহার করেছিলেন- 'ভগবান তুমি চাহিতে পার কি/ঐ দুটি নারী পানে/জানি না তোমায় বাঁচাবে কে যদি ওরা অভিশাপ হানে।' আমার সুযোগ হয়েছে ওই দু'জনের কাছ থেকেই খণ্ড খণ্ডভাবে এই অভিজ্ঞতার কথা বিচ্ছিন্নভাবে শোনার। তাঁদের হয়তো মনে নাও থাকতে পারে; কিন্তু আমার মনে আছে। মনে আছে বিভিন্ন সময়ে যখন জাতির প্রিয় নেত্রী তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি থেকে কিছু কিছু রক্তময় ছবি তুলে ধরতেন, সুধা সদনের কোনো কক্ষে একবার, টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর বৈঠকখানায় একবার, একবার কানাডায় জামাতার বাসগৃহে। তখন মনে হয়েছে, এত দাবাগ্নি হৃদয়ে বহন করেন কী করে তিনি! অথচ জাহান্নামের সেই আগুনে বসে তিনি কী করে হাসেন পুষ্পের হাসি? এই পরিস্থিতিতে তো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করা।

শেখ রেহানার সঙ্গে কথা হয়েছে কয়েকবার। লন্ডনে তাঁর বাসগৃহে গিয়ে শুনেছি মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা। কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে চেনা মানুষ অচেনা হয়ে যায়, কীভাবে ভালো মানুষের মুখোশ খসে গিয়ে বীভৎস-ক্লেদাক্ত চেহারা বেরিয়ে পড়ে, তার বিবরণ শুনেছি তাঁর মুখে। তিনি বলেছিলেন, 'পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কাহিনী যেদিন শুনি, তারপর থেকে এ পর্যন্ত আমার দুই চোখের পাতা আমি এক করতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই যেন সার বেঁধে সামনে এসে দাঁড়ান বাবা, মা, কামাল ভাই, জামাল ভাই, আদরের রাসেল, দুইটা নতুন বউ তাঁদের হাতে মেহেদির রঙ নিয়ে।' তিনি শুধু বারবার একটি প্রশ্নই করেছিলেন, 'বলুন তো, কী দোষ ছিল আমার বাবার? দেশের স্বাধীনতার জন্য বছরের পর বছর তিনি জেল খেটেছেন, আমরা পিতার সান্নিধ্য-বঞ্চিত থেকেছি বছরের পর বছর, এখানেই কি তাঁর দোষ? এত অকৃতজ্ঞ হবে এই জাতি- ভাবতেও পারি না।'

হ্যাঁ, ওই তথ্যচিত্রটিতে দুই সহোদরার বিপন্নকালের অকপট বর্ণনা ছিল, যা স্পর্শ করেছে তাদের সবাইকেই, যারা একবার তথ্যচিত্রটি দেখেছেন।

দুই.

আমরা জাতি হিসেবে যেমন ভাগ্যবান, তেমনই হয়তোবা অকৃতজ্ঞ। আমরা ভাগ্যবান; কারণ আমাদের এমন একটি প্রতীক আছে, যা আমাদের জাতিগত অস্তিত্বকে সুনিশ্চিত করেছে। যিনি আজীবন প্রাণপাত করেছেন একটি জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের জন্য, যিনি বারবার ফাঁসির দড়ির নিচে এসে দাঁড়িয়েছেন একটি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশের প্রয়োজনে-আমরা ভাগ্যবান না হলে কি তেমন একটি হিমালয়সম প্রতীককে পেতাম! আমরা অকৃতজ্ঞ এই কারণে যে, এমন একজন মানুষকে এভাবে সপরিবারে বিনাশ করতে ঘাতকরা এতটুকু দ্বিধান্বিত হলো না এবং গোটা জাতি প্রতিবাদহীন হিসেবে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ অবলোকন করল। একটি জাতির এমন নির্লজ্জ আত্মসমর্পণের ইতিহাস কি আছে বিশ্বের কোথাও? সাদ্দাম হোসেন কিংবা গাদ্দাফির মতো নির্দয় স্বৈরাচারের পক্ষেও সে সময় তাদের সমর্থকরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল, মাসের পার মাস, বছরের পর বছর জীবনপণ করে লড়াই করেছিল; কিন্তু আমাদের এখানে দেখা গেল বিশ্বাসঘাতকের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নানারূপে নানা পরিচয়ে মুক্তিযুদ্ধের নূ্যনতম চিহ্ন নিঃশেষ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

শুধু ওই একবারই নয়, বারবারই ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যখন দৃঢ়প্রত্যয়ে ঘোষণা করলেন যে, তিনি দেশে ফিরবেনই- বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ তিনি অবশ্যই গড়বেন; তারপর থেকে আবার সক্রিয় হয়ে উঠল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্র। পঁচাত্তরে বিদেশেও কি শান্তিতে ছিলেন তাঁরা? শুনেছি অনেকের কাছে- এমনকি দুই বোনের মুখ থেকেও। অদৃশ্য ঘাতক তাড়া করত তাঁদের। নিশ্চিন্তে পথে বেরোতে পারতেন না। এমনকি ভারতের মতো জায়গায়ও তাঁদের পরিচয় গোপন করে চলতে হতো। এই তথ্যটি তো তাঁরা দু'জনই বলেছেন ওই তথ্যচিত্রটিতে।

আরও একটি কারণে এই জাতি ভাগ্যবান যে, শেখ হাসিনা জাতির পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য নির্ভয়ে পথ চলেছেন 'জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য' এই বিশ্বাসকে বুকে বহন করে। যদি তাঁরা ঘাতকের লক্ষ্যবস্তুতে পড়ে যেতেন, তাহলে কক্ষচ্যুত হতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের রক্তদান, তিন লাখ মা-বোনের আর্তনাদ; মিথ্যা জয়যুক্ত হতো, নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত জাতির গর্বের পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত। সাধের এই ভূমিতে দেখা যেত পিশাচ এবং হায়েনার প্রেতনৃত্য। তিনি যে সাহসের আলোকবর্তিকা বহন করে নিয়ে এসেছেন, তার ফলেই একাত্তরের ঘাতকরা একে একে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছে, কলঙ্কমুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান, পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচে গেছে, শূন্য নিঃশেষ হয়ে পূর্ণ হয়েছে বাংলাদেশের অর্জনের ভাণ্ডার। এই ৩৭ বছরে অন্ততপক্ষে ১৯ বার তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু কোনো কিছুই তাঁর অদম্য প্রাণশক্তিকে পরাভূত করতে পারেনি। আর অকৃতজ্ঞতার বিষয়টি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলতে হয় এই কারণে যে, তঁাঁর পর্বত-প্রমাণ সাফল্য যেখানে বাংলাদেশের সবক'টি উন্নতির সূচক বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত করেছে, সেখানে সব অর্জন তির্যকভাবে চিত্রিত করার অবিচল চেষ্টা করতে এতটুকু কুণ্ঠিত কিংবা লজ্জিত হচ্ছে না। একই সঙ্গে চলছে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিকে নষ্ট করার অপচেষ্টা- চলছে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস এবং নির্মূল করার নির্মম ষড়যন্ত্র।

তিন

'হাসিনা এ ডটার্স টেল' তথ্যচিত্রটির ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার ভাষ্যে উঠে এসেছে সেই নির্বাসিত জীবন, সেই দুঃসময়, যখন দু'জনেই প্রত্যক্ষ করেছেন মুখ এবং মুখোশের রূপ। চেতনার রঙে চিনেছেন শত্রু এবং মিত্রের ব্যবধান। বঙ্গবন্ধুর এই দুই কন্যা আছেন বলেই যে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে- এই সত্যটি অনুধাবন করতে দেশবাসীকে বোধহয় আর খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

সাংবাদিক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ