প্রবাসে জীবন

ইউরোপের চিঠি

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৮

প্রবাসে জীবন

সুখবর এই, অনেক বাঙালি ছেলেমেয়ে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে

  সালেহা চৌধুরী

ঢাকায় সবাই লিখছেন ইলেকশন বা ভোটের ওপর। আর আমি শোনাই ইউরোপের গল্প। এমন কিছু করতে বলেছিলেন কিনা আমার বন্ধু গোলাম সারওয়ার। তিন বছরের বেশি সময় হলো, আমি সেই কাজ করে চলেছি। এখন কাগজ খুললেই ইলেকশনের বিবিধ খবর। গত সপ্তাহের কাগজে মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। আমি তার সঙ্গে যোগ করতে চাই গরিবের চিকিৎসার সুরাহা হোক। সরকারি হাসপাতালে ওরা যেন বিনা পয়সার ওষুধ পায়। আর রাস্তায় প্রাণ হারানো কমে যাক।

প্রবাসে সবচেয়ে বড় কষ্ট, আমরা সারাজীবন একটি গভীর নস্টালজিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না। বারবার মনে পড়ে দেশ। দেশ টানতে থাকে। দীর্ঘদিন পরে আজও দেশ আমাকে টানে। রাতের বেলা বাড়ির পাশে বেড়ে ওঠা কোনো এক গাছও আমাদের কাঁদায়। এত কিছুর পরও তাকিয়ে দেখি যে দেশে আমরা, তা একেবারে অন্য এক জনপদ। মানুষ, প্রকৃতি, আবহাওয়া সবই আলাদা। ফলে নিজেকে খাপ খাওয়াতে সময় লাগে। কাজ করতে গিয়ে দেখি, যাদের সঙ্গে কাজ করছি, তাদের কাউকে আমি চিনি না। ওরা আমাদেরই মতো, তবু কত আলাদা। এরপর থাকে ভাষাগত সমস্যা। কোনোমতেই আমাদের ইংরেজি ওদের মতো হয় না। যত চেষ্টা করি না কেন, অমন উচ্চারণে কথা বলা যায় না। তারপরও সংযোগের কারণে ঘষামাজা করে ইংরেজি বলা। এরপর কিছু বাগ্‌ধারা আমাদের শিখতে হয়। সব কথায় প্লিজ, থ্যাংকু। শিখতে হয় পোলাইট ইংরেজি। মে আই, কুড আই, উড ইউ প্লিজ- এসব। আমাদের মতো স্পষ্ট করে কথা বলে না ওরা, একটু ঘুরিয়ে বলে। ওয়েল আই থিঙ্ক দিয়ে শুরু করে সবকিছু। এর সঙ্গে থাকে- সাপোজ সো, আই থিঙ্ক, আই বিলিভ সো। এমনি বিবিধ বাগ্‌ধারা। কোনো এক জায়গায় গেলে বসতে না বললে বসা যায় না। ওরা কিন্তু এই বসতে বলাটাও একটু ঘুরিয়ে বলে। প্লিজ বি সিটেড বা উড ইউ প্লিজ সিটডাউনের সঙ্গে এমনও বলতে শুনেছি - ইফ আই ওয়ার ইউ আই উড সিটডাউন। তার মানে- আমি যদি তুমি হতাম, তাহলে আমি বসতাম। এই হলো ওদের কথা বলার ভঙ্গি। সবসময় একটু ঘুরিয়ে, পোলাইটলি। প্রথম দিকে একবার ট্রেনের টিকিট কাটতে গেছি। এক জায়গায় যাব শুক্রবার এবং আসব রোববার রাতে। সেই কথা বলতে আমি অনেক কথা খরচ করেও বোঝাতে পারছি না। তারপর ওরা বুঝতে পারল, আমি কী বলতে চাই। বলে- ইউ মিন এ উইকএন্ড রিটার্ন টিকিট টু বার্মিংহাম? তখন বুঝলাম, এমন টিকিটকে বলে উইকএন্ড রিটার্ন। এমনি করে একটু একটু করে শিখতে শিখতে মনে হয় আজও আমি ওদের মতো শিখিনি। উচ্চারণ তো অবশ্যই নয়।

বৈরী আবহাওয়ায় মানুষগুলোকে মনে হয়, ওরা সব কাচের ঘরে বাস করছে। চারপাশে ঠাণ্ডায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে নিজের মধ্যে। ট্রেনে পাশাপাশি দুইশ' মাইল চলার পরও কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। কে আগে কথা বলবে? যাকে বলা হয়- ব্রেকিং দ্য আইস। কে আগে বরফ ভাঙবে। প্রায়শ এই কাজটি আমি করি। বলি, হয়তো তোমার হাতে যে বই, সেটা আমার পড়া। বেশ ভালো বই। উত্তর দেয়- ইউ থিঙ্ক সো। মুখে হাসি। তারপর ডুবে যায় আবার বইতে। বেশি দূর এগোনো যায় না। তবে এর ব্যতিক্রম যে থাকে না, তা নয়। কেউ কেউ কথা বলে অনেক সময় ধরে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা সাদা হলেও কেউ ইংরেজ নয়। হয়তো স্পেন বা ইতালির। তবে বুড়োবুড়িরা একবার কথা বললে আর থামতে চায় না। কারণ ওরা সবাই নিঃসঙ্গ। একা জীবন কাটায়। একসময় একা মারা যায়।

এবার বলছি, বিদেশে যারা আছেন অনেক সময় তাদের মনে কী কাজ করে? আমি এখানে এসেছি অল্পদিনের জন্য। সময় পেলেই দেশে চলে যাব। কাজেই শৌখিন জিনিস কেনার আমার দরকার কী? সেকেন্ড হ্যান্ড, থার্ড হ্যান্ড দিয়ে কাজ চালানো। পয়সা জমানো। বাড়িতে পাঠানো। দেশে বাড়ি করার পয়সা, ভালোভাবে থাকার পয়সা। এই করতে করতে একজন বুড়ো হয়ে যায়। তখন দেখে, তিনি দেশে যাননি। ওখানেই আছেন এবং আজ যাব, কাল যাব করতে করতে জীবনই শেষ। বুড়ো বয়সের বাত, ব্যাধি, এটা-সেটা তাদের ছেয়ে ফেলেছে। হাঁটতে পারছেন না কেউ কেউ। কেউ চোখে আগের মতো দেখছেন না। এ ছাড়া অনেকেই দেশের নির্ভরশীল মানুষকে পরিশ্রমের কড়ি পাঠান। সে কড়ি গুনলে রক্ত আর ঘামের গন্ধ পাওয়া যাবে। এরপর দেশে এসে দেখেন, যে বাড়িটা তিনি বানিয়েছেন, সেখানে তার কোনো দখল নেই। বেহাত হয়ে গেছে। আবার ফিরে যান বিদেশে। তখন বুড়ো মানুষটি তাকিয়ে দেখেন, সারাজীবন ধরে তিনি কেবল উপার্জন করে গেছেন, উপভোগ করেননি। এখন টু-লেট। এমনি নানা গল্পে পরিপূর্ণ জীবন।

প্রথমে ওখানে গেলে যে কাজ করেন তিনি, তার নাম অডজব। দোকান, ফ্যাক্টরি বা বাথরুম পরিস্কার সবই হতে পারে। দেখে মানুষ একজনকে জানে বা বিচার করে তার মানুষ পরিচয়ে, চাকরির পরিচয়ে নয়। কখনও কেউ কাউকে প্রশ্ন করেন না, তুমি কী করো? তার পরিচয় জীবনযাপনে, ট্যাক্স দেওয়ায়, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহারে। কাজেই আমাদের দেশের এমএ-বিএরা নতুন করে জানেন 'অডজবের' মানে। শোনা গেছে, ওয়ালস আইসক্রিম ফ্যাক্টরিতে কাজ না করে একজনও ব্যারিস্টার হতে পারেন না। আমিও অমন কিছু করেছিলাম প্রথমে। ফলে বিষণ্ণতায় ভুগতে ভুগতে একদিন জানলাম, আমি একা নই। অনেকেই এমন সাধারণ কাজ করছেন। কলকাতার মিনিও আমার পাশে বসে সামান্য কাজ করতেন। ও ছিল ইংরেজিতে এমএ পাস। তারপর পেলাম অফিসের কাজ, তারপর স্কুল। সবাই তা পায় না। অডজবে কেটে যায় সারাজীবন। অনেকে এমন কাজই দিনরাত করেন। দুই শিফট না হলে তিন শিফট। ভাবখানা এই, টাকা রোজগার ছাড়া আর কিছু করার নেই। এমন এক সাধারণ কাজে দেখেছিলাম অনেক জ্ঞানী ও গুণীকে। এমনি করে সবাই শেখেন নতুন মূল্যবোধ। চাকরিই একজনের পরিচয় নয়, পরিচয় তার জীবনযাপনের নানাবিধ শর্তে।

চারটি ভাড়া বাড়িতে থাকতে থাকতে জেনেছিলাম, আমাদের দেশের কেউ যদি বাড়ি কেনেন সে বাড়ির প্যাসেজ পর্যন্ত ভাড়া দেন। সেসব অভিজ্ঞতা 'লন্ডন রূপকথা নয়' বইটিতে আছে। এখানে বিশদ করে বলার প্রয়োজন নেই। অনেকে খুব কষ্ট করে একটি বাড়িতে আরও তিন-চারটি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান বা জীবনযাপন করেন। অনেকে কাউন্সিলের বাড়ির জন্য দরখাস্ত করেন। ব্রিটেনে কাউন্সিল বাড়ি বানাতে শুরু করেছে ১৯২০ সাল থেকে। কাউন্সিল টাকা পায় বাড়ি বানানোর। সে বাড়ি পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষা করতে করতে একদিন বাড়ি পেয়ে যান। আগে সেসব বাড়িতে নানা অসুবিধা ছিল। যেমন অনেক বাড়িতে গোসলের তেমন কোনো ব্যবস্থা থাকত না। একসময় বাড়ি বাড়ি বাথরুম তৈরি হতে শুরু করে। ফলে বাড়ির মান বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে ভাড়া কম। যাকে বলে 'সোশ্যাল হাউজিং'। এখন এমন নিয়ম হয়েছে, অনেকদিন থাকার ফলে একজন ভাড়াটিয়া বাড়িটা কিনে নিতে পারেন। আমি অবশ্য কাউন্সিলের বাড়িতে কোনোদিন থাকিনি। ওখানে যাওয়ার চার বছর পর একটা বাড়ি কিনেছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত থেকে গেছি। এমনটি হবে কোনোদিন ভাবিনি।

নানা সব ভাতা আছে। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। বিনা পয়সার হাসপাতাল। তবে যে চাকরি করেন তাকে ওষুধ কিনতে কিছু টাকা দিতে হয়। সেটা তেমন কিছু না।

এর মধ্যে সুখবর এই, অনেক বাঙালি ছেলেমেয়ে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং অনেকে বেশ ভালো করছে। বেশ কিছু ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার আছে। এবার আসার সময় আমার পাশে যে মেয়েটি বসেছিল জানলাম, সে লন্ডনের কোনো এক বড় ফার্মে কাজ করে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। অনেকে সলিসিটর, অধ্যাপনা এসবও করছেন। বেশ কিছু ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছেন। আস্তে আস্তে এসব গুণী ও জ্ঞানীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা আইডেনটিটি ক্রাইসিস। আমি কি বাঙালি, না ব্রিটিশ? তবে আজকের প্রজন্ম আর বাঙালি পরিচয় নিয়ে বসে নেই। এদের পরে বাঙালি বলে আর কিছু থাকবে না। সব হয়ে যাবে ব্রিটিশ। এটা ভাবাই ভালো। বাবা-মায়ের অনেক কষ্ট আর সংগ্রামের পর কিছু সুখবর।

অনেক জটিল পথ পার হয় আমাদের লোকজন, যারা বিদেশে থাকেন। দামি সুট আর টাই পরে বা সুন্দর পোশাকে আর সুটকেসে যারা দেশে আসেন, তাদের গল্প অনেক। অনেক কঠিন জীবন পার করেছেন বা করছেন তারা। আমি ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে ভাবি, কখন আবার দেশে যাব। তবে মনে মনে প্রার্থনা করি, আমি যেন কোনোদিন দেশে অসুখে না পড়ি।

ব্রিটেন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ