ছোট শরিকদের নীরব কষ্ট

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৮

ছোট শরিকদের নীরব কষ্ট

   আবু সাঈদ খান

নির্বাচন ও রাজনীতিতে জোটবদ্ধতা নতুন কিছু নয়। তবে নতুন ঘটনা- কোনো দলই এখন আর জোটের বাইরে নেই। ছোট-বড় সব দলই স্ব স্ব স্বার্থে জোটবদ্ধ।

এতদিন মূলধারার রাজনীতি ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপির ২০ দলে বিভক্ত। অতি সম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতির হিসাব-নিকাশ খানিকটা বদলে দিয়েছে। বিএনপি এখন একই সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের ছাতার তলে, অন্যদিকে ২০ দলকে ধরে রেখেছে। ১৪ সালের নির্বাচন বর্জন, হিংসাত্মক আন্দোলন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে নেতিবাচক অবস্থানের কারণে বিএনপি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ঐক্যফ্রন্টে শামিল হয়ে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নেতাকর্মীদের মাঝেও প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে।

বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর পর্বে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত দূরে ছিল। ২০ দলের অন্যসব শরিক ঐক্যফ্রন্টের সভা-সমাবেশ-কর্মসূচিতে অংশ নিলেও সেখানে জামায়াত ছিল না। ঐক্যফ্রন্ট নেতাতের ঘোরতর আপত্তিতে তা সম্ভবও ছিল না। তখন ধারণা করা গিয়েছিল, বিএনপি নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের কারণে হয়তো জামায়াত ছাড়বে না। কিছু আসনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করবে। তবে যুদ্ধাপরাধীদের হাতে ধানের শীষ তুলে দেবে, এমনটা ধারণা করা যায়নি। যখন গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য ও কৃষক শ্রমিক লীগ ধানের শীষে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনও জামায়াতের স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা ছিল। এখন দেখছি, বিএনপি জামায়াতকেও ধানের শীষ দিচ্ছে। এর মানে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পতাকাবাহী ড. কামাল-রব-মান্না-কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব আর থাকল না। তারাও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে অভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করবেন। আমার মনে হয়, বিএনপির অভ্যন্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এটি গা-সওয়া হলেও '৭২-এর সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল ও রব-মান্না-কাদের সিদ্দিকীর জন্য এটি মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। এ কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে আসন বণ্টনের জটিলতা। বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের কত আসন ছাড়বে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে জামায়াত কিংবা সদ্য যোগদানকারী গোলাম মাওলা রনির প্রতি বিএনপি যতটা সদয়, ঐক্যফ্রন্টের প্রতি তার সিকি পরিমাণও সদয় নয়। তাই পিঠা ভাগাভাগিতেও টানাটানি হয়- এমন সান্ত্বনা নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের ছোট শরিকরা এখন অপেক্ষা করছেন।

কষ্ট মহাজোটের ছোট শরিকদেরও। ১৯১৪ সালে আওয়ামী লীগ ১৪ দলের কয়েকটি শরিক দলকে ১৫ আসন ছেড়েছিল। এবার ১৪ দলের শরিকদের প্রত্যাশা ছিল আরও কিছু বেশি। গত সংসদে ন্যাপ, সাম্যবাদী দলসহ যাদের প্রতিনিধি ছিল না, তারাও মনোনয়ন চাইছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জেপি, তরিকত ফেডারেশন গত নির্বাচনের চেয়ে বেশি মনোনয়ন দাবি করছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যে আশ্বাস দিয়েছে, তাতে এবার তাদের মনোনয়ন সংখ্যা বাড়বে না, বরং গত নির্বাচন থেকে কমতে পারে। বলা বাহুল্য, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি যতটুকুু দরকষাকষি করতে পারছে, ১৪ দলের শরিকরা তাও পারছে না। কেবলই বড় দলের মুখপানে তাকিয়ে আছে। তাদের মনোবেদনা প্রকাশ পেয়েছে ১৪ দলের শরিক দলের জনৈক নেতার ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে। তার ভাষায়- তারা মহাজোটের 'ইমানদার' শরিক, আদর্শের জন্য লড়ছেন। আর নির্বাচন সামনে রেখে যারা আওয়ামী জোটে বা দলে আসছেন তারা 'বেইমান'। কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সদ্য মহাজোটের বলয়ে আসা যুক্তফ্রন্টকে বোঝানো হচ্ছে। ওই নেতার অভিযোগ- 'বেইমানদের' কিছু আসন ছেড়ে দেওয়ায় 'ইমানদাররা' প্রত্যাশিত আসন পাচ্ছেন না।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় -মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্টের ছোট শরিকদের হৃদয়ে এখন রক্তক্ষরণ। কিন্তু কইতে পারছে না, সইতেও পারছে না।

সাংবাদিক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ