কে বাঁচবে, কে জিতবে...

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০১৮

কে বাঁচবে, কে জিতবে...

  জাঁ-নেসার ওসমান

'টুবি অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন?'

১৫শ' শতাব্দীর মহান নাট্যকার-কবি উইলিয়াম শেকসপিয়র তার 'হ্যামলেট' নাটকের তৃতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে ডেনমার্কের যুবরাজ নায়ক 'হ্যামলেট'-এর স্বগতোক্তিতে এই সংলাপ লিখেছিলেন ; 'টু বি অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন?' পিতৃহত্যার প্রতিশোধ হবে কি হবে না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বর্তমানে সেই ১৫শ' শতাব্দীর নায়ক হ্যামলেটের মতো ২০১৮ সালে প্রায় সাড়ে চারশ' বছর পর আমারও মনে একই প্রশ্ন- জাগছে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনসাধারণ যেমনি নির্বাচন চাইছে, তেমনি নির্বাচন হবে কি হবে না!

'টু বি অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন?' যদিও মহান নাট্যকার- কবি উইলিয়াম শেকসপিয়র এখানে বলতে চেয়েছেন, টু লিভ অর নট টু লিভ... বাঁচব কি বাঁচব না, সেটাই প্রশ্ন? আমারও ঠিক তেমনি মনে হয়, এ যেন বাংলাদেশের ঐক্য জোট আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিযোগিতা, টু লিভ অর নট টু লিভ, কে বাঁচবে, কে জিতবে...।

এমনি চিন্তা মাথায় আসত না, যদি না কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা বলতেন, নির্বাচনে যদি জয় না পাও, তাহলে দেশের পাঁচ লাখ লোক মারা যাবে! কেউ কেউ হুঁশিয়ার করেছেন, নিজেরা নিজেরা কোন্দল করো না, এক হও, মিলেমিশে চলো, তা না হলে পিঠের চামড়া থাকবে না! হুঁশিয়ার কর্মী, হুঁশিয়ার। কেন? বাংলাদেশে সবাই বাংলায় কথা বলে। তাহলে এক ভাষাভাষী দেশে এক বাঙালি কেন অন্য বাঙালিকে হত্যা করবে? এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম বুঝি?

ব্রিটিশ লালমুখো বাঁদররা ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্ব করে ধর্মীয় ঢালের আড়ালে-হিন্দু-মুসলমানে বৈষম্য প্রদর্শন করে ভারত ভেঙে দুই টুকরো করল। কত হাজার হাজার ভারতবাসী এই হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গায় নিহত হলো। শত শত ঘরবাড়ি আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছারখার হলো! লাখ লাখ শিশু-কিশোর-কিশোরী ধর্ষিত হলেন, নিহত হলেন রাস্তায়, কুকুরের খাদ্য হয়ে পড়ে রইলেন! যার নোংরা প্রতিধ্বনি আমরা নিজেরা শুনলাম, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বর্বরদের হাতে শত শত মা-বোন ইজ্জত খোয়ালেন, লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ নিরীহ জনগণ প্রাণ হারালেন। তাহলে ১৯৭১-এর পরও কি আমাদের চোখ খুলল না? আমরা আবার লাখ লাখ বাঙালির প্রাণনাশের আশঙ্কা করছি! কেন? কেন? কেন?

বাঙালি হয়ে বাঙালিকে কেন হত্যা করবে? এ কোন বাঙালি, যারা বাঙালি হয়ে বাঙালি হত্যা করে উল্লাস করবে! এখন তো বাংলাদেশে বিজাতীয় কোনো শাসক নেই- বিজাতীয় কোনো ব্যবসায়ী, ইস্পাহানী-বাওয়ানী, ২২ পরিবার নেই! তাহলে কিসের নেশায় বাঙালি এই রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠবে! বাংলার লাখ লাখ বাঙালিকে রক্ষার জন্য অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী রয়েছে, রয়েছে দক্ষ পুলিশ বাহিনী; যারা বিদেশি মিশনে গিয়ে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাহলে আমরা, সৈনিক, পুলিশ, আনসার-ভিডিপি তাদের উপস্থিতিতে কেন বাংলায় এমনি হত্যার ভয় পাচ্ছি! কেন আবার আমাদের পথে পথে লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হবে? এ কোন রাজনীতি!

শেকসপিয়র তার 'হ্যামলেট' নাটকে যুবরাজ নায়ক 'হ্যামলেট'-এর স্বগতোক্তির এক জায়গায় লিখছেন : টু ডাই টু স্লিপ নো মোর... মৃত্যুই আমাদের সব জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে। মৃত্যুর পর মানুষ আর কখনও স্বপ্ন দেখে না। তাহলে আমাদের এই নির্বাচন কি শত শত বাঙালির ইহজাগতিক জ্বালা-যন্ত্রণা দূর করবে!

১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯৬০ সালের এনএসএফ তৎকালীন পাকিস্তানি মোনায়েম সরকারের ছাত্র নামধারী গুণ্ডা বাহিনীর হাতে সাধারণ ছাত্ররা নিগৃহীত হতো। বর্তমানে শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এর প্রত্যক্ষদর্শী। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বরতার সাক্ষী হাজার হাজার বাঙালি এখনও বেঁচে আছেন, তারপরও কি আমাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন হবে না!

১৯৪৭ সালে আপনারা বললেন, ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের তাড়ালে ভারতীয়রা শান্তিতে থাকবে। আমরা ব্রিটিশদের তাড়ালাম। সে সময় বললেন, জি না, মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র দিলে শান্তিতে থাকব। ফলে পাকিস্তানের জন্ম হলো। পরে বললেন, পাকিস্তানি অবাঙালি মুসলমানদের তাড়ালে আমরা বাঙালিরা শান্তিতে থাকব। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক আত্মত্যাগ ও ভারতীয় সৈন্যের সহযোগিতায় পাকিস্তানি অবাঙালি মুসলমানদের তাড়ানো হলো। লাখো শহীদের রক্তে জন্ম নিল গর্বের বাংলাদেশ। কিন্তু শান্তিতে কেন থাকতে পারছি না! এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম বুঝি!

আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি করব! কেন, কেন? কেন এই হত্যা, কেন এই হানাহানি, কার উপকার বয়ে আনবে এই হত্যাযজ্ঞ! শুনলে অবাক লাগে, এবার এক একটি আসনে একেক দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৫৩ জন! কোথাও ৮৭ জন! একেকটি আসনে যদি এত সংখ্যক প্রার্থী প্রতিযোগিতা করে, তাহলে নির্বাচকমণ্ডলীর তো প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের জন্য নির্বাচন বা বাছাই করতে হিমশিম খেতে হবে।

গত দশম জাতীয় নির্বাচনে কোনো এক আসনে এত প্রার্থী কখনও চোখে পড়েনি। এবার কেন এমন হচ্ছে! কী মধু আছে এই নমিনেশনে? বাংলার তাবৎ বাঙালির ইচ্ছা একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের। যেথায় সব বাঙালি মা-বাবা, ভাইবোনরা সুশৃঙ্খলরূপে লাইনে দাঁড়িয়ে যার যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে হাতের অমোচনীয় কালি দ্বারা অঙ্কিত হয়ে পোলিং বুথ থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসবেন। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হবেন না।

অতীতে কোনো কোনো বুথে বোমাবাজি হয়েছে, পোলিং এজেন্টকে পিটিয়ে বুথছাড়া করেছে। এবার আশা করছি, তেমনি কোনো ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই। ইলেকশন কমিশন মুহুর্মুহু ঘোষণা দিচ্ছে, এবার নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, কোনো গণ্ডগোল হবে না। আমরাও চাই এবারের নির্বাচন এমন একটা সময়ে হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পা রেখেছে। নিজ খরচে পদ্মা সেতু গড়ছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দ্রুত সমাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। ফলে আশা করতে পারি, বাংলার জনসাধারণ জাগতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ হয়ে, মানুষে মানুষে আর হানাহানি করবে না। বাঙালি হয়ে বাঙালি নিধনে লালায়িত হবে না। শত উস্কানিতেও হিন্দু- মুসলমানের মতো আর ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গায় জড়াবে না। আশা করি, এবারের নির্বাচন হবে এক আদর্শ নির্বাচন।

পরিশেষে প্রায় সাড়ে চারশ' বছর আগের মহান নাট্যকার-কবি উইলিয়াম শেকসপিয়রের অমর চরিত্র 'হ্যামলেট'-এর স্বগতোক্তির মতো বলতে হয় : 'টু বি অর নট টু বি, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন?'

এমনি এক অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি হবে না, সেটাই এখন আমাদের দেখার বিষয়!

কলাম লেখক


মন্তব্য যোগ করুণ

মুক্তমঞ্চ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ